kalerkantho


'ব্যাম্বু' বৃত্তান্ত...

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ১২:৪৪



'ব্যাম্বু' বৃত্তান্ত...

প্রায়শই বাঁশ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চারিদিকে। তা দেখে আমারও বাঁশ নিয়ে কিছু বয়ান চালাতে ইচ্ছা করলো। কটাস কটাস করে কথা শোনানোর মতো বাঁশও সাধারণত ফটাস ফটাস শব্দে ও ছন্দে অন্যকে মারতে ওস্তাদ। সম্ভবত এখান থেকে 'ব্যাম্বু ফটাস' শব্দটির আগমন। 

আবার অন্য দৃশ্যপটও রয়েছে। বাঁশ বাগানের মাথার ওপরে যেদিন চাঁদ উঠেছিল সেইদিন কাজলা দিদি আর বাঁশের সম্পর্কে একটা করুণ দৃশ্যপট চোখের সামনে উদ্ভাসিত হয়েছিল। তার পর থেকে চাঁদের মধ্যে কালো কালো ধোঁয়াশা দেখলে কেন জানি আমার কাজলা দিদির কথা মনে পড়ে যায়। বাঁশের তৈরি রণ পা দিয়ে লম্বা পায়ের হাঁটা, স্কুলের পণ্ডিত মশাইদের হাতে বাঁশ দিয়ে তৈরি ছড়ি অথবা বাঁশের মণ্ড দিয়ে বানানো কাগজ যেমন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, তেমনি আবার কোথাও কোথাও বাঁশের ব্যবহার বেড়ে যাচ্ছে। আজকাল বাঁশ বাড়ন্ত পথে পথে যে প্যাঁচাল পরিচালিত হচ্ছে তাতে ঘরের খুঁটি, ক্ষমতার জুটি, নিরাপত্তার লাঠি, কবরের মাচা, আদিবাসি নাচা, কাগজের কাঁচামাল, গরুর গলার হাল, কনস্ট্রাকশনের পিলার, মুড়ির ঝুড়ি, কচি বাঁশের তরকারি, পুলিশের ব্যাম্বু ছড়ি, বুড়ির হাতের লাঠি, সভা সমাবেশ ঠাণ্ডা অথবা পণ্ড করতে বাঁশ হয়ে ওঠে সকলের যন্ত্র-মন্ত্র। 

অথচ এই বাঁশ কি-না ঘাসের জাত ভাই! তাই দুর্বা ঘাসের কথা মনে পড়ে যায়। আহারে শরৎকালে কোমল দুর্বার ওপর যখন শিশির পড়ত! দুর্বা কোমললতা আমাদের খালি পা দু’খানিকে আলিঙ্গন করে শিশিরের চুমু এঁকে দিত। কত বছর শিশির দেখি না। শিশিরের নরম আভায় সিক্ত হই না। ছোটবেলায় আর্শিন-কার্তিক মাসে ভাইফোঁটা দেবার সময় আগের রাতের জমানো শিশির দিয়ে ভাইয়ের কপাল ধুয়ে দিতাম। সেই শিশির সিক্ত কপালে আঁকতাম কাজলের টিপ। শিশিরের অভাবে সেই কাজলের টিপ আজকাল আর নজর কাটে না। প্রকৃতি আর বাঁশ বাগানের মাথায়, পাতায় শিশিরের স্নান করায় না। বাঁশের তনুখানি আর পিচ্ছিল হয় না। বাঁশঝাড় এখন লম্পট মনুষ্যদের-তনুদের তনুশ্রী ছিঁবড়ে করার আড়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে। অংক বইয়ের বানরগুলো মনুষ্য তনু আর বাঁশ বেয়ে মাথায় উঠে তাণ্ডবনৃত্য করতে পারে। তাদের নৃত্য দেখলে মনে পড়ে বাঁশবাগানে ছেলেবেলায় শোনা যে ভূত/পেত্নিরা নৃত্য করতো তারা আর কেউ নয়। আমার-তোমার অতি নিকটজন, কখনো বা তুমি-আমি-আমরাই! 

আজকাল কী সেই ‘তাঁহাদের’ আগমন বেড়ে গিয়েছে! অথচ শুনেছি বাঁশের ঝাড় উজাড় হয়েছে। সেই সমস্ত ঝাড়ের জোনাকীরা আশ্রয় হারিয়ে কোথায় চলে গেছে? সেই সাথে জোনাকীর আলো, কাজলা দিদির গল্প, বাঁশের ডগায়-পাতায় শিশির কোথায় হারিয়ে গেলো! তবু আজ ফাঁকা বাঁশঝাড়ে যেতে বড় ভয় করে। জোনাকীরা তো আর আলো দেখায় না। কানাইয়ের বাঁশিও বাজে না। রাধাদের বালিশচাপা কান্নায় দাদাদের মন গলে না। পাহাড়ের উজার করা বাঁশবনে ওরা কারা শক্ত হাতে বাঁশের খুঁটির ঘর বানায়! সেই ঘরে স্থায়ী বসত গড়ে। পাহাড়ের পাদদেশে ক্ষয়ে যায় লাল মাটি। প্রকৃতিও ভারসাম্য খোঁজে। একদিন বৃষ্টি নামে, ধসে পড়ে ভারসাম্য। আমরা বলি, পাহাড় ধস। পাহাড়, গ্রাম কিংবা জোনাকী আর কাজলা দিদি নতুন কোনো আবাস খোঁজে। 

ক্ষমতার খুঁটি হাতে ওই সকল বাঁশঝাড়ে নতুন করে বাঁশ রোপিত হয়। সেই সকল বাঁশ বাড়ন্ত হয়ে সকলের হাতে বন বন করে ঘুরছে। অতএব, বেশি বক বক করলে তা পশ্চাতে অঝড়া ব্যাম্বু হয়ে প্রবেশ করবে। অথবা ঠ্যাং ভেঙে হাতে বাঁশের লাঠি ধরিয়ে দিয়ে বলবে, “লও তোমারে বহিবে এই তিন পেয়ে জীবন”। আহা! ব্যাম্বু... তুমি 'ফটাস' শব্দে ফেটে ওঠো।

লেখক : নিবেদিতা রায়
শিক্ষক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।



মন্তব্য