kalerkantho


উত্তরের শীতল হাওয়ায় ব্যাকুল ব্যথা

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ১৩:৫৫



উত্তরের শীতল হাওয়ায় ব্যাকুল ব্যথা

উত্তরের সুরে এবারো করুণ শীতল হাওয়া বইছে। শখের নাল পিরান চায় না ওরা। প্রচণ্ড শীতের প্রকোপ থেকে বাঁচতে ওম চায়। কম্বল, গরম পোষাক চায়। উত্তরবঙ্গের পঞ্চগড়, লালমনিরহাটে চা বাগান আছে।  তেঁতুলিয়া, কুড়িগ্রাম থেকে শীতকালে হিমালয়ের চূড়া দেখা যায়। আঙুরপোতা দহগ্রাম, দিনাজপুরের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানসহ আরো কতকিছু দেখতে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ আসে। শীতকালে আসে শীতার্তদের সাহায্য নিয়ে, বন্যায় আসে ত্রাণ নিয়ে। 

আরো পড়ুন: শিক্ষার গুণগত মানবৃদ্ধিতে 'সেকায়েপ'র শিক্ষকদের স্থায়ী করুন

রংপুর বিভাগের বেশ কয়েকটি জেলায় অভাব, দারিদ্র্য নিত্যসঙ্গী হলেও এ অঞ্চলের মানুষের কাছে ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য শিল্প কলকারখানা অথবা অন্য কোনো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা তেমনভাবে নেওয়া হয়নি। তিস্তা ব্যারেজ পেরিয়ে নিজ শহরের পথে যেতে যেতে বিগত দুই দশকে কোনো পরিবর্তন দেখতে পাইনি। 
সারাদেশে এবার তীব্র শীতের প্রকোপ।

শুধু কেন উত্তরবঙ্গের কথা বলি! উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম চারদিকে বিভিন্ন সমস্যা। এসব থাকবে। তবে এলাকাভিত্তিক চিরায়ত সমস্যাগুলো সকলের জানা। আমরা জানি উত্তরে গ্রীষ্মের সময় খরা দেখা দেয়। তিস্তার মতো অনেক নদীর পানি শুকিয়ে যায়, বর্ষায় বন্যার জলে ভাসে শহর গ্রামের লোকালয়। শীতকালে তীব্র শীতের কবলে বিপর্যস্ত জনজীবন। প্রতিবার এই সমস্যাগুলো থেকে বাঁচতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে  দিতে আকুতি জানাতে হয়। দেশের অনেক মানুষ এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নিজেদের উদ্যোগে এগিয়ে আসে। সরকারের একার পক্ষে এই সমস্যাগুলোর সমাধান সম্ভব নয়। এ কথা যেমন সত্য, তেমনি সত্য পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে যথাযথ পদক্ষেপ নিয়ে দারিদ্র বিমোচনসহ টেকসই উন্নয়নে জোর দেওয়া। 

শুরু হওয়া বৈরি হাওয়ার বিপরীতে শুরু হয়েছে বিয়ের মৌসুম। বিয়ের বাজারে আজকাল সৌখিনতার দারুণ আয়োজন। মেহেদী থেকে সংগীত, হলুদ, বিয়ে, রিসিপশনেই শেষ নয়। ব্যাচেলর পার্টি থেকে ডিজে ভিজের আয়োজনে কত লক্ষ  লক্ষ টাকা খরচ করা হয়। তখন এই আয়োজনের একজন অংশীদার হয়ে মনে যতটা পুলক জাগে, ঠিক তখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ সূত্রের খবর 'আগুন পোহাতে গিয়ে এ পর্যন্ত তেইশ জনের মৃত্যু' সংবাদ কতটুকু ব্যথিত করে! উত্তরবঙ্গের বিয়ের আয়োজনে যৌতুকের মাত্রাতিরিক্ত দর অনেকেই জানে। তখন কিভাবে ভাবতে পারি আমাদের শীতে কাঁপায়, আমরা বন্যায় ভাসি।

মজার ব্যাপার হলো, এতসব সমস্যাকবলিত অঞ্চলের রাজনৈতিক নেতাদের ভোটের বাজার কিন্তু মোটেও গরিবী হালের নয়। অন্যান্য অনেক উন্নত এলাকার নেতৃত্বের মতো আমাদের নেতাদের জাতীয় রাজনীতিতে সুবক্তা হিসেবে দেখা যায়। সরকার অথবা বিরোধী দল অথবা ক্ষমতার খুব কাছে থাকা দলগুলোতেও তাদের অবস্থান ওপরের সারিতে। টিভি পর্দায় তাদের দেখে যতটা আশাবাদী হতে চাই, ততটাই হতাশার কারণ খুঁজতে যাই। কতবার ভাবি এতো শক্তিশালী, সাহসী, দেশের উন্নয়ন নিয়ে ভাবা নেতারা যেভাবে নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে পেরেছে, দেশের সমস্যা নিয়ে চিন্তিত এই মানুষগুলো কতটুকু চিন্তা নিজের অভাবি এলাকার জন্য করেন? উন্নয়নের জন্য কতটা দরবার করেন? অথবা তারা কী জাতীয় রাজনীতিতে এতোটাই মনোনিবেশ করেন যে এলাকার বন্যা, শীত, খরা, নদী ভাঙনের মতো ছোটখাটো সমস্যা নিয়ে ভাবার সময় থাকে না! 

আরো পড়ুন: সেই সময় পুর্ণিমার পাশে কেউ দাঁড়ায়নি!

নাগরিক হিসাবে আমাদের দায়িত্ব ও কি আমরা ঠিকভাবে পালন করি? পাঁচ বছরে একদিন ভোট দিয়ে রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করি। সারা বছর টকশো দেখতে দেখতে নিজেদের রাজনীতি, সমাজ নীতি, অর্থনীতির অন্দর বাহির মুখস্থ হয়ে যায়। মুখস্থ বিদ্যা যেমন শুধু ঠোঁটের মাথায় থাকে, মনের গভীরে প্রবেশ করে মাথা ঘামানোর চেষ্টা করে না, আমরাও তেমনি চুপ করে যাই। হয়তোবা বিরক্ত হয়ে দেশ উদ্ধারের বদলে নিজেদের উন্নয়ন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাই। শীতের রাতে নরম লেপের ওম, বিয়ে বাড়ির আতশবাজি, থারটি ফার্স্ট এর হিন্দি গানের টুকুর টুকুর, দিল করে চু চ্যা চু চ্যা করতে করতে পরদিন যে যার কাজে ব্যস্ত হয়ে যাই। 

আমাদের এবং ভোটের হাওয়ায় যারা নাম লিখবেন তাদের এইসব বৈরি হাওয়া নিয়ে করণীয় যদি জানা যেত! আমরা আসলে এসব জানতেও চাই না। শীতে কাঁপি, বন্যায় ভাসি...তারপরও বেঁচে থাকি!

লেখক : নিবেদিতা রায় 
শিক্ষক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।


মন্তব্য