kalerkantho


শতবর্ষী গাছগুলো না কেটে বিভাজক হিসেবে ব্যবহার করুন

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১২ জানুয়ারি, ২০১৮ ১৫:৫৭



শতবর্ষী গাছগুলো না কেটে বিভাজক হিসেবে ব্যবহার করুন

এমনই শতবর্ষী গাছ কাটার সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে আত্মঘাতী

গাছ! প্রত্যেক মানুষের সবচেয়ে কাছের এবং ‘একমাত্র’ বন্ধু।  একমাত্র বন্ধু বলার কারণ গাছ আমাদের অক্সিজেন দিয়ে বাঁচিয়ে রাখে। সুতরাং যা আমাদের সবাইকে বাঁচিয়ে রাখে তা অবশ্যই আমাদের সবার প্রিয় বন্ধু। অবশ্য স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু অনেক আগেই তা প্রমাণ করে দিয়েছেন। তবে গাছের যে জীবন আছে তা আমরা প্রায়শ ভুলে যায়। অবশ্য মাঝে মাঝে গাছের প্রয়োজনীয়তা যে আমরা অনুভব করি না তা কিন্তু নয়। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড তাপদাহ আমরা যখন ক্লান্ত-শান্ত হয়ে পড়ি, যখন একটু শীতলতার আশ্রয় চারিদিকে কোথাও খুঁজে না পাই, ঠিক তখন গাছ একবুক মায়াভরা শীতল ছায়া হয়ে আমাদের প্রাণটা জুড়িয়ে দেয়। এমন বন্ধু জগতে আর অন্যটি আছে কি? অথচ এই বন্ধুকে আমরা প্রতিনিয়ত প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে নিধন করেই চলেছি। আর এবার সেই নিধনের তালিকায় যুক্ত হতে চলেছে যশোরের দড়াটানা মোড় থেকে বেনাপোল পর্যন্ত সড়কের দুই পাশের প্রায় আড়াই হাজার গাছ। যার মধ্যে অধিকাংশই শতবর্ষী।

আরো পড়ুন: বন্দুক হাতে ওই ঘোমটা পরা মা কি বেঁচে আছেন?

ক'দিন আগে সংবাদপত্রের পাতায় খবরটি পড়ে চমকে উঠেছি। অবাক হয়েছি। আমি গেল কয়েক বছর ধরে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় শিক্ষার্থীদের নিয়ে বৃক্ষরোপণের আন্দোলন করে আসছি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় পুরো বিশ্ব যেখানে গাছ রোপণের কথা বলছে, সেখানে উন্নয়নের নামে গাছ কাটার জঘন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছে যশোর জেলা প্রশাসন। ব্যক্তিগতভাবে বৃক্ষরোপণ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণেই হয়তো এই অপ্রিয় খবরে আমার কষ্টের মাত্রাটাও অন্যদের চেয়ে একটু বেশি। হঠাৎ প্রিয় মানুষের মৃত্যুর খবর শুনলে বুকের মধ্যে যেমন নেই নেই মনে হয়, যশোর-বেনাপোল সড়কের এই শতবর্ষী গাছগুলো কাটার খবর শুনেও আমার তেমনটাই মনে হয়েছে। 

যশোর শহরের দড়াটানা থেকে বেনাপোল পর্যন্ত প্রায় ৩৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কের উভয় পাশে অন্তত ২ হাজার ৩ শ ১২টি বিশাল আকারের গাছ রয়েছে। যার মধ্যে অধিকাংশই শতবর্ষী। এর মধ্যে পৌনে দুই শ বছরের পুরোনো গাছও রয়েছে। রয়েছে যশোরের তৎকালীন জমিদার কালী পোদ্দারের লাগানো তিন শতাধিক গাছ। এক কথায় যশোর রোড মানেই প্রাচীন বৃক্ষরাজিতে সমৃদ্ধ এক মহাসড়ক। 

আরো পড়ুন: সিএনজির এই ভৌতিক ভাড়ার আদৌ কি কোনো সুরাহা আছে?

যে গাছগুলো কালের সাক্ষী হয়ে বছরের পর বছর কোটি পথিকের প্রাণ জুড়িয়ে আসছে, রাস্তা সম্প্রসারণের অযুহাতে তা কেটে ফেলার সিদ্ধান্তের খবর আমাকে যে কতটা অবাক করেছে তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম বেনাপোল সীমান্তের ওপারে ভারতও রাস্তা সম্প্রসারণ করেছে কিন্তু একটি গাছও সেখানে কাটা হয়নি। পেট্রাপোল থেকে কলকাতা পর্যন্ত সড়কটির বেশ কিছু রাস্তা চার লেনের। কিন্তু ওখানে একটি গাছও কাটা হয়নি বরং তারা গাছগুলোকে সড়কের মাঝখানে রেখে বিভাজক হিসেবে ব্যবহার করছে। ভারত যদি শতবর্ষী গাছ না কেটে সেগুলো বিভাজক হিসেবে ব্যবহার করেতে পারে, তাহলে যশোর জেলা প্রশাসন তা কেন করতে পারবে না? ভারতের এই সিদ্ধান্তের ফলে পেট্রাপোল-কলকাতার রাস্তার সৌন্দর্য যেমন বেড়েছে, তেমনিই রক্ষা পেয়েছে সড়কের দুই ধারের কয়েক হাজার গাছ।

পাঠক, একটু ভাবুন তো, আমরা কি ইচ্ছে করলেই এই শতবর্ষী গাছ তৈরি করতে পারবো? আপনি যদি জীবনে কোনো গাছ রোপণ করে থাকেন, তাহলে চোখ বন্ধ করে ভাবুন তো সেই গাছ আজ কতটা বড় হয়েছে, না মারা গেছে। আপনি একদিন একটি ছোট্ট চারা রোপণ করেছিলেন, তারপর যত্ন করেছেন, সার দিয়েছেন, আগাছা পরিষ্কার করেছেন। ঝড়ে হয়তো কোনটি ভেঙে গিয়েছে, কোনটি গরু-ছাগলে খেয়ে কিংবা ভেঙে ফেলেছে। ভাবুন তো আজ আপনার যে গাছটির বয়স কুড়ি কিংবা পঁচিশ সেই গাছটি বড় করতে আপনাকে কতটা কষ্ট আর অপেক্ষা করতে হয়েছে। 

এবার ভেবে দেখুন তো যশোর রোডের এই গাছগুলো লাগানো হয়েছিল আজ থেকে প্রায় পৌনে দুই শ বছর আগে।  এই গাছগুলোর ওপর দিয়ে তাহলে কতগুলো ঝড় বয়ে গেছে ভেবেছেন? বলা হচ্ছে  গাছগুলো কেটে সড়ক উন্নয়ন করে আবার সেখানে গাছ রোপণ করা হবে। যদি রোপণ করাও হয়, তাহলে এই পৌনে দুইশ বছরের গাছের মতো গাছ হতে কতটা অপেক্ষা করতে হবে ভেবেছেন? যে গাছ তৈরি হয়ে গেছে সেই গাছ আমরা জেনে বুঝে কেন হত্যা করবো? তাছাড়া এখন রাস্তার ধারে গাছ রোপণ করলে সেসব গাছ মারা যাওয়ার চিত্রই আমরা বেশি দেখি।  সুতরাং গাছ কেটে গাছ রোপণের যে কথা বলা হচ্ছে, তা কেবলই আত্মঘাতি।

যশোর-বেনাপোল মহাসড়কটির ঐতিহাসিক গুরুত্বও কম নয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় এই সড়ক দিয়েই আমাদের দেশের লাখ লাখ শরণার্থী ভারতে গেছেন। বিখ্যাত মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতাটি এই শতবর্ষী বৃক্ষে সমৃদ্ধ যশোর-বেনাপোল সড়কটির স্মৃতিগাঁথারই বাস্তব রূপ। মুক্তিযুদ্ধের সময় গিন্সবার্গ কলকাতা হয়ে যশোর সীমান্তে শরণার্থী শিবিরে এসেছিলেন। সে সময় বন্যার কারণে যশোর রোড প্রায় পুরোটাই ডুবে ছিল। গিন্সবার্গ নৌকা নিয়ে শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করে মানুষের দুঃখ-দুর্দশা অনুভবের চেষ্টা করেন। পরে তিনি তার এই অভিজ্ঞতা নিয়েই বিখ্যাত ওই কবিতাটি রচনা করেন। পরে যা মার্কিন গায়ক বব ডিলান গানে পরিণত করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিভিন্ন কনসার্টে গেয়ে শুনিয়েছিলেন। গিন্সবার্গের এই কবিতাটি যশোর রোডের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। 

হাজারো স্মৃতিবিজড়িত এই সড়কটি সম্প্রতি চার লেনে উন্নীত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তা বাস্তবসম্মত এবং প্রয়োজনীয়ও বটে। কারণ বেনাপোল বন্দরে যাওয়ার একমাত্র ব্যস্ত এই রাস্তাটি চার লেনে উন্নীত করলে আমাদের অর্থনীতি আরও এগিয়ে যাবে। কিন্তু  সেটা কি গাছ কেটে করতে হবে?  বিকল্প হাজারটা উপায় রয়েছে।

উন্নয়নের দোহাই দিয়ে শতবর্ষী গাছগুলো কাটার মতো আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের জন্য কোনো মঙ্গল বয়ে নিয়ে আসবে না। রাস্তাটির দুই পাশ চওড়া না করে এক পাশ চওড়া করুন। তাহলে একপাশের গাছগুলো রাস্তার বিভাজক হিসেবে ব্যবহার যাবে এবং আমার কাছে মনে হয় গাছগুলো রক্ষার এটাই শ্রেষ্ঠ উপায়।

লেখক: জুবায়ের আল মাহমুদ
সাংবাদিক, পরিবেশ ও সমাজ উন্নয়নকর্মী


মন্তব্য