kalerkantho


এক স্বপ্ন ভাঙার অরাজনৈতিক গল্প

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৮ নভেম্বর, ২০১৭ ১৫:৪১



এক স্বপ্ন ভাঙার অরাজনৈতিক গল্প

গল্পটা কাল্পনিক নয়। চরিত্র ও ইতিহাস নিজ জীবনের।

স্থান আমার মফস্বল শহর। সময়কাল ছেলেবেলা। তখন প্রথম শ্রেণিতে পড়ি। আমাদের স্কুলে যাবার পথে মেথরপট্টি ছিল। একদিন দেখলাম ওই পট্টিটা উঠিয়ে দিয়ে নতুন কিছু করার আয়োজন চলছে। সমাজের নিচু শ্রেণির ওই আবাস কোথায় স্থানান্তরিত হয়েছিল জানি না। কারণ নতুনভাবে ওই জায়গাটায় কী হবে সেটাই ছিল আমার কৌতূহল।  

মাটি ফেলে জায়গাটা সমান করা হবে। ইঁট আসছে, বালু ফেলবে।

বাবাকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, ওই জায়গাটা শিশুপার্কের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কি ভীষন খুশি হয়েছিলাম! আমাদের শহরের এক প্রান্তে সরকারি স্টাফ কোয়াটারে একটা শিশুপার্ক ছিল বটে। তবে, তা বোধকরি সরকারি অফিসার আর কর্মকর্তাদের শিশুদের জন্য করা হয়েছিল। কারণ, ওই এলাকায় অন্যদের যাতায়াত খুব কম ছিল। যাইহোক, আমার বন্ধুরাও খুব খুশি হয়েছিল। শিশু পার্কের রাইডগুলো কল্পনা ভাসত। আমরা প্রতিদিন স্কুল যাবার পথে চেয়ে চেয়ে দেখতাম আর অপেক্ষা করতাম…কবে শেষ হবে কাজ? আর কত বাকি? দ্বিতীয় শ্রেণিতে উঠে দেখলাম সবেমাত্র বালু এসেছে, আরো পরে ইট। এভাবে তৃতীয়, চতুর্থ শ্রেণি, একদিন স্লিপার, ঢেঁকি, দোলনাও দেখতে পেলাম। আমাদের মনে তখন আনন্দের ফোয়ারা, এইবার বোধহয় শিশুপার্কের দোলনায় দোল খাওয়া হবে। তারপর একদিন হঠাৎ কাজ বন্ধ হয়ে গেলো! 

কী হয়েছিল জানি না, কার কাছে জানতে চাইব তাও জানি না। আমাদের মন খারাপ অভ্যাসে পরিণত হতে হতে আশাটাই মরে গেলো। এবার অষ্টম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি, একদিন দেখা গেল আবারো কাজ শুরু হয়েছে। আগাছা পরিষ্কার, গাছ লাগানো ইত্যাদি ইত্যাদি। অবোকাঠামোগত কাজের শেষ হতে হতে আমরা তখন কলেজে। আমরা তখন আঠারো, আমরা তখন শিশু বয়সটা মাত্র পেরিয়েছি কিংবা বলা ভালো, স্লিপারে উঠে হাত-পা ছুড়ে আনন্দ করাটা তখন বড় লজ্জার। কলেজে যেতে যেতে আমরা দেখতাম কল্পনার ঢেঁকিতে আমাদের শৈশব বসে আছে, ছুটোছুটি করে লুটোপুটি খাওয়া বাচ্চারা আমাদের ছোট ভাইবোন। অবশেষে আমরাও ওই স্বপ্নের শিশুপার্কে গিয়েছিলাম। দোলনায় দোল খেতে নয়, মাঠে বসে বাদাম খেতে খেতে শিশুদের আনন্দ-মেলার সাক্ষী হয়েছিলাম। এভাবে শিশুপার্কটা শুরু হলো, বেশ কিছুদিন বাচ্চাদের হউহুল্লোড় মুখরিত ছিল। ঈদ, পূজা উৎসবে বিনোদনের অন্যতম আশ্রয় ছিল। কিন্তু সেখানে আরো একদল মানুষের যাতায়াত আরম্ভ হলো। যারা শিশু নয়, তাই অবুঝ নয়। আর তাই জেনে বুঝেই ফেন্সিডিল, মাদকের আসর বসাতে ওই শিশু উদ্যানটাই বেছে নিল।  

আমরা যারা কলেজ শেষে বাদাম খেতে অথবা একটু গায়ে হাওয়া লাগাতে ঘুরতে যেতাম, তাদের জন্যই শুধু জায়গাটা নিষিদ্ধ হলো না, ধীরে ধীরে শিশুদের আসাও কমতে শুরু হলো। এখনও ওই শিশুপার্কটি রয়েছে। তবে শিশুরা নেই, আগাছা আর অযত্নে সবকিছু কেমন ভুতূড়ে একটা পরিবেশে পরিণত হয়েছে। যে উদ্যানটি পরিণতরূপে সাজতে এতোটা লম্বা সময় পারি দিল, সেটার পরিণতি আরো খারাপ হলো। তবে অদ্ভুতুড়ে ওই মানুষগুলোর জন্য এই পরিবেশটাই বেশি মানানসই। তাই হয়তো এসব নিয়ে ফালতু চিন্তা করে সময় নষ্ট করার সময় কারো নেই!

অনেক পুরোনো এই গল্পটা কী শুধু আমার শহরেই ঘটে যাওয়া একটা শিশুর মনোকষ্টের ইতিহাস! আজ তবে, এত কথার কারণ কী! এ কারণেই জাবর কাটা যে, মাত্র এক বছর পরে আর একটি নির্বাচন। অনেকেই ভোটযুদ্ধে অবতীর্ণ হবেন, ভোট চাইবার সময় মধুর মধুর কথা বলবেন, স্বপ্ন দেখাবেন, সরকারি প্রশাসনে দায়িত্বে থাকা বিরাট বিরাট মেধাবী ক্যাডাররা বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবেন। আমরা ট্যাক্স দেবো। এভাবেই চলতে থাকবে।

আমাদের ভেঙে যাওয়া স্বপ্নতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দেখতে চাই না। উন্নয়নের গতি আর পরিণতি যদি এই গল্পের মতো হয় তবে, ভাবনা তো আসবেই। যেখানে সময় অসময়ের হাত ধরে চলে, তাতে মরিচীকার খোঁজে শুধুই ছুটে বেড়ানো। একটা সময় মরিচীকা সত্য হলেও তাতে আর কৌতুহল থাকে না। তখন আমি এক নির্বাক দর্শক।
লেখক : নিবেদিতা রায় 

 


মন্তব্য