kalerkantho


বাবার অপকর্ম দেখে ফেলায় মেয়েকে হত্যা : সিআইডি কর্মকর্তার ডায়েরি থেকে

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২২ নভেম্বর, ২০১৭ ১৪:৩১



বাবার অপকর্ম দেখে ফেলায় মেয়েকে হত্যা : সিআইডি কর্মকর্তার ডায়েরি থেকে

মামলাটি সম্পুর্ণ ক্লু লেস অবস্থায় ছিল। থানা পুলিশের তদন্তের পর জটিল এই মামলাটি পুলিশ হেডকোয়ার্টারস এর মাধ্যমে সিআইডিতে আসে।

সকলের ধারণা ছিল প্রেমে ব্যর্থ হয়ে মেয়েটি আত্মহত্যা করেছে। এবং থানায় অপমৃত্যু মামলা হয়। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ায় ডাক্তারের ময়নাতদন্ত রিপোর্ট। ঘটনার পাঁচ মাস পর ময়নাতদন্তের রিপোর্টের ভিত্তিতে বাদী কর্তৃক হত্যা মামলা দায়ের হয়। কেউ কেউ তো বলেই দিল ডাক্তার ভুল রিপোর্ট দিছে। ফাঁকা বাড়িতে গভীর রাতে গোচালা ঘরে ফাঁসিতে ঝুলানো লাশ। থানা পুলিশ মোবাইল কল লিস্ট ও মেয়েটির প্রেমিক, এলাকার বখাটেদের গ্রেপ্তার/রিমান্ড নেওয়াসহ অন্যান্য তথ্য নিয়ে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে।


আরো পড়ুন : খাদিজার ওপর হামলাকারী শাস্তি পাবেই


মামলাটি সিআইডিতে আসার পর আমার (Pritesh Talukder, SI, Netrokona) নামে হাওলা হয়। বিশেষ পুলিশ সুপার (অপ.) ময়মনসিংহ মতিউর রহমানের আদেশে মামলাটির তদন্তের জন্য আদা-জল খেয়ে মাঠে নামি।

এই কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সিআইডি) শংকর কুমার দাসের দিক-নির্দেশনায় পরিশেষে রহস্য উদঘাটন করতে সফল হই। বাদী সবুজ মিয়া পিতা মৃত আনফর, সাং বিরিয়ালী থানা নেত্রকোনা সদর। সবুজ স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে চট্টগ্রামে বসবাস করত। দুই মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে ফরিদা বেগম (১৬) ছাড়া বাকি দুই সন্তান ছোট ছোট। স্ত্রী বেদানা বেগমসহ সন্তানদের নিয়ে একই বাসায় বসবাস করাকালীন সোহেল নামের সবুজ মিয়ার ভাগ্নের সাথে ফরিদার প্রেম হয়। এবং পারিবারিক ভাবেই সোহেলের সাথে ফরিদার বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।


আরো পড়ুন : বিরলে চালককে হত্যা করে অটোরিকশা


একসময় ফরিদাকে বিবাহ দেওয়ার উদ্দেশ্যে সপরিবারে গ্রামের বাড়িতে চলে আসে। কিন্তু সোহেলের মায়ের পাত্রী পছন্দ হয়নি, বিয়ে ভেঙে যায়। এই নিয়ে ফরিদার মন খারাপ থাকে। কিন্তু ঘটনার দিন ২৪/১০/২০১৬ তারিখ সবুজ মিয়ার বাড়ির পাশে জনতা বাজারে যাত্রাগানের রিহার্সাল চলছিল। সবুজ মিয়ার বাড়িতে সবুজ মিয়া/ খোকন/ বকুল/ চান মিয়ার বসতঘর পাশাপাশি। রাত অনুমান ১০টার দিকে বাড়ির নারী-পুরুষ সবাই যাত্রা দেখতে জনতা বাজারে চলে যায়। বাড়িতে থাকে সবুজ মিয়ার মেয়ে ফরিদা (১৫) ও তার ছোট দুটি ভাই-বোন। পাশের ঘরে চান মিয়ার স্ত্রী ঘরেই থাকে। ওই দিন চান মিয়া কুমিল্লা ছিল। চান মিয়া হচ্ছে সবুজ মিয়ার আপন ছোট ভাই। রাত অনুমান ১১টার দিকে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সবুজ মিয়া যাত্রা নাটক হইতে চুপিসারে বাড়িতে চলে আসে।

আপন ছোট ভাইয়ের বউ মিনা বেগমকে গোচালা ঘরে নিয়ে যায় এবং দুজন  শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়। শব্দ পেয়ে সবুজের মেয়ে গোচালা ঘরে ঢুকে তার পিতা সবুজ মিয়া ও মিনা বেগমকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলে এবং ঘটনাটি প্রকাশ করে দিবে বলে জানায়। সাথে সাথে সবুজ মিয়া তার মেয়েকে ধরে ফেলে গলায় রশি দিয়ে শ্বাস রুদ্ধ করে হত্যা করে। মৃত্যু নিশ্চিত করে ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য ফরিদার লাশ রশি দিয়ে গোচালার মারইলের সাথে ঝুলিয়ে পাশে একটা কাঠের চেয়ার রেখে বাড়ি থেকে আবার যাত্রাগানে চলে যায়। রাত অনুমান ২টার দিকে অন্যান্য লোকজনসহ ফরিদার মা বাড়িতে ফিরে ফরিদাকে না পেয়ে খোঁজাখোঁজি করে গোচালা ঘরে ঝুলন্ত অবস্থায় পায়।

এদিকে খুনি সবুজ মিয়া খবর পাওয়া মাত্র জ্ঞান হারানোর নিখুঁত অভিনয় করে। পরের দিন থানা পুলিশ এসে সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করে অপমৃত্যু মামলা দায়ের করে। এই কথা গুলো খুনি সবুজ মিয়ার আপন ছোট ভাইয়ের স্ত্রী মিনা বেগম ফৌ. কা. বি. ১৬৪ ধারায় বিজ্ঞ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর পাঁচ মাস পরে ২২/০৩/২০১৭ খুনি সবুজ মিয়া নিজে বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামি করে নেত্রকোনা মডেল থানা মামলা নম্বর ২৫ তারিখ ২২/০৩/২০১৭ ধারা ৩০২/৩৪ দায়ের করে। এই ক্লু বের করতে সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে আমাকে চার রাত সবুজ মিয়ার বাড়ির পেছনে অবস্থান করতে হয়েছে সবুজ মিয়ার পরকীয়া সম্পর্কে নিশ্চিত হতে। তারপর মিনা বেগমকে গ্রেপ্তার করে মূল রহস্য উদঘাটন করি। তাতে যে কত অক্লান্ত পরিশ্রম কত কৌশল অবলম্বন করতে হয়েছে.....সে এক বিরাট গল্প।

 


মন্তব্য