kalerkantho


এতো ডাকি তবুও কেন কও না কথা ‘বোন’?

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১৪:২৭



এতো ডাকি তবুও কেন কও না কথা ‘বোন’?

শিরোনাম দেখে সবার নিশ্চয় সবাই ছোট বেলায় পড়া ‘তোতা পাখি’ কবিতার কথা মনে পড়েছে। প্রখ্যাত শিশু সাহিত্যিক রণদীপম বসু যোগীন্দ্রনাথ সরকারের লেখা এই কবিতাটি এতোটাই জনপ্রিয় যে, এখনো অনেক শিশুকে এর আবৃত্তি না শোনালে ঘুমই আসে না।

তবে লেখার বিষয়বস্তুও ওই কবিতাখানি নয়। লেখায় শুধুমাত্র মিয়ানমারের রাখাইনে দেশটির সেনাবাহিনীর দ্বারা সৃষ্ট সহিংস পরিস্থিতিতে শান্তিতে নোবেল জয়ী সু চি’র নিরবতার সম্ভাব্য কারণ ব্যাখ্যা এবং লেখার শেষ দিকে শিরোনামে ‘বোন’ শব্দটি ব্যবহারের কারণ ব্যাখ্যা করবো।

মিয়ানমারের রাখাইনে দেশটির সেনাবাহিনী কতটা ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। দেশি-বিদেশি গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্য এবং হৃদয়বিদারক ছবিগুলোই বলে দিচ্ছে সহিংসতার মাত্রা কতটা ভয়াবহ। এ কারণে নিষ্ঠুর ওই ঘটনার বর্ণনা দেয়ার প্রয়োজন আছে বলে প্রয়োজন মনে করছি না। বিবিসির দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতিনিধি জনাথন হেড সম্প্রতি যে সরেজমিন প্রতিবেদন করেছেন সেখানেও ধ্বংসের ভয়াবহতা স্পষ্ট। চারিদিকে শুধু আগুন আর আগুন। আমি জনাথন হেডের ওই প্রতিবেদনটি দেখেছি। ভালো করে দেখেছি, কয়েকবার দেখেছি।

প্রতিবেদনের ছবিগুলো আমার চোখের সামনে এখনো ভাসছে। চারিদিকে ভয়-আতংক। অথচ রাখাইন রাজ্যের সীমান্ত রক্ষামন্ত্রী ফোন টিন্টি জনাথন হেডের কাছে পুরো ঘটনা অস্বীকার করে বলেছেন, শত শত নয় সেখানে একটি অথবা দু’টি বাড়ি পুড়ে গেছে। জ্বালিয়ে দেওয়া আর পুড়ে যাওয়া যে এক নয়, তা হয়তো সবাই বোঝে।  

তবুও নিরব মিয়ানমারের শান্তিতে নোবেল জয়ী নেত্রী অং সান সু চি।  আর সু চি’র সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে নিরব বিশ্ব বিবেক। মুসলিম বিশ্বের কয়েকটি দেশ রাখাইনের হত্যাযজ্ঞকে গণহত্যা হিসেবে আখ্যায়িত করলেও ক্ষমতাধররা মুখ বন্ধই রেখেছে। এতোগুলো নিরীহ মানুষ বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে, অথচ তারা কি খাবে, কোথায় থাকবে, চিকিৎসার কি হবে-এসব মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণের দায় যেন শুধুই বাংলাদেশের। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে এভাবে বছরের পর বছর বোঝা হয়ে থাকলেও এদের ফেরত নে্য়ওর কোনো তত্পরতা মিয়ানমারের পক্ষ থেকে লক্ষ্য করা যায়নি। একইভাবে সবসময় নিবর থেকেছে আন্তর্জাতিক মহলও।  লেখার এ পর্যায়ে খোঁজার চেষ্টা করবো রোহিঙ্গা ইস্যুতে সু চি এবং ক্ষমতাধর বিশ্বের নিরবতার কারণ।

এখানে কূটনৈতিক বিশ্লেষণের সাহস দেখাতেই হচ্ছে। সু চি’র নিরবতার কারণ ব্যাখ্যা করতে হলে একটু পেছন ফিরে দেখতে হবে। মিয়ানমার অধিকাংশ সময়ই সেনাবাহিনী শাসন করেছে। দেশটিতে যারাই গণতন্ত্রের কথা বলেছে তাদেরকেই লাশ হয়ে ফিরতে হয়েছে। অং সান সু চি’কে লাশ হতে না হলেও বন্দী জীবন কাটাতে হয়েছে অনেক বছর। বহু আন্তর্জাতিক তৎপরতার কারণে দেশটিতে দীর্ঘ সময় পর নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করে শান্তিতে নোবেল জয়ী অং সান সুচি’র ন্যাশনাল ফর ডেমোক্রেসি পার্টি। সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সু চি’র দলের সরকার গঠনের পরও রোহিঙ্গাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন আজও হয়নি-এমনকি সু চি’কে এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ তো দূরের কথা, কথা পর্যন্ত বলতে শোনা যায়নি। সু চির কথা শোনা যায়নি বললে অনেকে ভুল ভাবতে পারেন। কারণ গেল বুধবার সু চি কথা বলেছেন। তবে তা রোহিঙ্গাদের পক্ষে নয়। তিনি দাবি করেছেন রাখাইনে যা কিছু ঘটছে তা গণমাধ্যমে মিথ্যা ছবি এবং তথ্য দিয়ে প্রচার করা হচ্ছে।

সু চি’র এই দাবি যে সম্পন্ন ভিত্তিহীন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। মিথ্যায় যদি হবে তাহলে সেখানে সাংবাদিক প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে কেন? মিথ্যায় যদি হবে তবে রাখাইন থেকে লাখো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসছে কেন? মিথ্যায় যদি হবে তাহলে কক্সবাজারের বিভিন্ন সীমান্ত থেকে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত রাজ্যে আগুনের লেলিহান শিখা দেখা যাচ্ছে কেন? 

তবে সু চি’র নিরবতার কয়েকটি কারণের মধ্যে অন্যমত ভূ-রাজনীতি। বাংলাদেশ যেহেতু একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে সম্ভাবনাময় দেশ। তাই এই দেশকে ধ্বংসের একটা আন্তর্জাতিক পরিকল্পনা থাকতে পারে। আবার ভিন্ন যুক্তিও দাঁড় করানো যায়। দক্ষিণ এশিয়ায় রাজত্ব করতে হলে যে কোনভাবে বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহার করতে হবে-পশ্চিমারা এমন একটা হিসাব অনেক দিন আগেই কষে রেখেছে। রাখাইনদের ওপর নির্যাতনের অযুহাতে আন্তর্জাতিক মহল মূলত বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একটা সামরিক যুদ্ধ কামনা করতে পারে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বহুদিনের ইচ্ছে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরে ঘাঁটি গড়া। দক্ষিণ এশিয়ায় রাজত্ব করতে হলে চট্টগ্রাম বন্দরকে ব্যবহার করতেই হবে। বাংলাদেশের সর্বভৌমত্বের প্রশ্নের কারণে বাংলাদেশের কোনো সরকারই শুধু পশ্চিমা নয়, পৃথিবীর কোন দেশের হাতেই চট্টগ্রাম বন্দর ছেড়ে দেবে না।  

অন্যদিকে, মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে চলে গেছে চীনের তেল পাইপ লাইন। তা ছাড়া মিয়ানমার এবং চীনের সংখ্যা গরিষ্ঠ মানুষ একই ধর্মাবলম্বী। এ কারণে রোহিঙ্গাদের ওপর হাজারো নির্যাতন চললেও চীন নিরব রয়েছে। কক্সবাজারের বিভিন্ন সীমান্তে এরই মধ্যে মিয়ানমার সেনাবহিনীর হেলিকপ্টার একাধিকবার বাংলাদেশের আকাশসীমায় প্রবেশ করেছে। এগুলো কি যুদ্ধের নীল সংকেত নয়? যুদ্ধ বাধিয়ে দিতে পারলেই তো চীন অথবা পশ্চিমা শক্তি দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় ‘শান্তি’ ফেরানোর অযুহাতে বঙ্গোপসাগরে যুদ্ধজাহাজ নিয়ে আসার পাশাপাশি ঘাঁটি গড়বে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরে। এই ক্ষেত্রে পশ্চিমাদেরর পূর্বে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে চাইবে চীন। কারণ বাংলাদেশের মাটি ব্যবহারের মধ্যদিয়ে চীন ভারতের ওপর যেমন আধিপত্য বিরাজ করবে, একইভাবে আধিপত্য বিরাজ ছড়াবে পুরো দক্ষিণ এশিয়ার ওপর। আমার কাছে মনে হয় চীন ও পশ্চিমাদের এই শীতল যুদ্ধের চাপের কারণেই মূলত অং সান সু চি নিরব।  এ কারণে সমস্যা সমাধানে রোহিঙ্গাদের পক্ষে বাংলাদেশকেই আন্ত্মর্জাতিক জনমত তৈরি করতে হবে।  

সু চি’র নিরবতার সর্বশেষ যুক্তি হচ্ছে, মিয়ানমার হয়তো চাচ্ছেই না যে রোহিঙ্গারা তাদের দেশে বসবাস করুক। তারা হয়তো রোহিঙ্গাদের দেশ ছাড়া করতেই এমন নির্যাতনের পলিসি বেছে নিয়েছে। মিয়ানমার সরকারের সর্বশেষ ঘোষণায় বলে দিচ্ছে তারা রোহিঙ্গাদের দেশ থেকে বের করতে চায়। গেল বৃহস্পতিবার দেশটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে তারা যদি রোহিঙ্গা হিসেবে নিজেদের পরিচয়পত্র দেখাতে না পারে তবে তাদের মিয়ানমারে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। নির্যাতনের শিকার হয়ে যখন কোন মানুষ দেশ ছাড়তে বাধ্যহয় তখন কি কেউ জাতীয় পরিচয়পত্র সঙ্গে নিয়ে শরণার্থী শিবিরে আসে? বাংলাদেশে যারা ইতিমধ্যে চলে এসেছে তাদের অধিকাংশের কাছেই পরিচয়পত্র নেই, কারণ তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাহলে কি তারা মিয়ানমারে প্রবেশ করতে পারবে না? মিয়ানমার যদি তাদের প্রবেশে বাধা দেয় তাহলে লাখ লাখ রোহিঙ্গা কোথায় যাবে? এমন শত শত অমানবিক কাজ সুচির চোখের সামনেই ঘটে চলেছে।  

দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী ধর্মযাজক নোবেল জয়ী ডেসমন্ড টুটুও সু চি’র নিরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। মালালাও চুপ থাকেননি।  টুটু অং সান সু চিকে ‘বোন’ সম্বোধন করে তার উদ্দেশে লিখেছেন, ‘বোন তোমার নিরবতার দাম তোমার দেশের নিরীহ নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের অশ্রু আর রক্তের বিনিময়ে দিতে হচ্ছে। তুমি কি সর্বোচ্চ ক্ষমতায় যেতে চাও, নাকি চিরদিন ক্ষমতায় থাকতে চাও, কেন তুমি নিরব?’ আর মালালা ইউসুফ বলেছেন, সু চি আপনি কখন এই অত্যাচারের নিন্দা জানাবেন, আমি আপনার সেই ঘোষণার অপেক্ষায় আছি। ’ টুটু কিংবা মালালার মতো বিশ্ব বিবেক সু চিকে সাড়া দিতে বললেও তিনি যোগিন্দ্রনাথ সরকারের 'তোতা পাখি'র মতোই নিরবই রয়েছেন।  

লেখক: জুবায়ের আল মাহমুদ   
সাংবাদিক, নিউজ টোয়েন্টিফোর টেলিভিশন


মন্তব্য