kalerkantho


'ইছামতি'র মৃত্যুর দায়ভার তার প্রত্যেক সন্তানকেই বহন করতে হবে

সাকিব সিকান্দার   

১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১৭:২৩



'ইছামতি'র মৃত্যুর দায়ভার তার প্রত্যেক সন্তানকেই বহন করতে হবে

'ইছামতি' একটি ড্রেনের নাম, ছবিটি তুলতে গিয়ে তাই মনে হয়েছিল

ইচ্ছে ছিল পাবনা থেকে ফিরে ছোটখাটো ভ্রমণ কাহিনী লিখবো। কিন্তু এক নিদারুণ করুণ কাহিনী নিজ চোখে দেখে এলাম।

এটার কথা না বললেই নয়। অবশ্য ব্যাপক রহস্যময় অজানা কোনো গল্প বলছি না। সবাই জানেন, করণীয় সম্পর্কেও বোঝেন। কিন্তু 'গোপন রহস্যময়' কারণের দোহাই দিয়ে সবাই যেন চুপ। দুটি ঘটনা তুলে ধরছি। লেখার হেতু পরিষ্কার হয়ে যাবে।  

ঘটনা ১ : ঈদের দু'দিন বাদে পাবনার রাঁধানগরে আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে গেছি। সেখানকার অতি প্রিয় এক মামাকে নিয়ে সারাদিন ঘুরে বেড়াচ্ছি। কাঠফাটা দুপুরে হাঁটছি তার সঙ্গে।

এডওয়ার্ড কলেজের আশপাশের কোনো এক জায়গায় আছি দু'জন। একটা ফুটওভার ব্রিজ পার হচ্ছি। নিচে দিয়ে চলে গেছে দীর্ঘ এক ড্রেন। ময়লা পানি আর থকথকে কাদা। তাকালেই ঘেন্না লাগে। কেন যেন মনে হলো, ময়লার ড্রেন হিসাবে একটু বেশি চওড়া লাগছে ওটাকে। ব্রিজের দুই পাশেই যতদূর চোখ যায়, ড্রেনের কোনো শেষ নেই। আগ্রহ নিয়েই জিজ্ঞেস করলাম, 'মামা, এইটা কিসের ড্রেন?' কিছু একটা জিজ্ঞাসা করছি বুঝে হাসিমুখে মামা তাকালেন আমার দিকে। প্রশ্ন শুনে মুহূর্তেই বিষণ্ন হয়ে গেল তার চেহারা। কালো মুখে অস্ফূট স্বরে বললেন, 'মামা, এটা আমাদের ইছামতি নদী'। তখন আমরা ব্রিজের মাঝখানে, আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম। সবার মতো আমিও শুনেছি যে ইছামতির আগের জৌলুস নেই। তাই বলে এই অবস্থা! কয়েকটি ছবি তুলে নিলাম বিরস বদনে। মনটাই খারাপ হয়ে গেল।

ঘটনা ২ : মামার বন্ধুমহলের সঙ্গে একটা বাড়িতে বসে আড্ডা দিচ্ছি। রাঁধানগরের পাশের পাড়ায়। বাড়িটার পেছনে গ্রিলের বারান্দা। সামনে উঠান আর গাছপালা। উঠান ফুরালেই বিশাল এক পুকুর, দীঘি বলেই মনে হলো। ডানপাশে উঠান যেখানে শেষ হয়েছে যেখানেই পুকুরের একটা পাড়। লম্বাটে পুকুরে বিপরীত পাড়টা চোখের আড়ালে, দেখা যাচ্ছে না। ওই বাড়ির মামাকে প্রশংসার সুরে বললাম, পুকুরটা মনে হচ্ছে অনেক বড়! আপনাদের নাকি? কষ্টবোধের সঙ্গে কিছুটা ক্ষোভ মিশে একটু বিদঘুটে হয়ে উঠলো তার চেহারা। তিনিও পরাজিতের কণ্ঠে বললেন, 'এইটা পুকুর না মামা, এইটা ইছামতি নদী। ' ধাক্কাটা জোরেশোরেই লাগলো। হায়! কারো বাড়ির উঠানে সরু হয়ে ফুরিয়ে গেছে এক নদীর প্রবাহ! বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, একটা স্রোতস্বিনী এভাবে মরে যায়! একটা স্রোতস্বিনীকে এভাবে মেরে ফেলা যায়! 

বড়জোড় ১৫-২০ কদমের একটি ফুটওভার ব্রিজ। ওটা পেরোলেই কঙ্কালসার ইছামতি পেরোনো হবে! 

হায়রে ইছামতি!


এ দুটি ঘটনার পর পরিচিত বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বললাম। সবাই নিজের মনের কোনো এক কোণে ইছামতি বিষয়ে তীব্র যন্ত্রণা আগলে রেখেছেন। কিন্তু এর প্রকাশে কোনো ফল নেই বলে যন্ত্রণাটাও ইছামতির মতো মরে গেছে প্রায়। আমি ইছামতির এ অবস্থা নিয়ে কোনো অনুসন্ধান শুরু করিনি। তবে প্রিয় নদীকে নিয়ে অনেকের মনের ভালোবাসা আর কষ্টের কথা সামান্য শুনে এসেছি। পাবনার কালের স্বাক্ষী ঐতিহ্যবাহী এই নদীর পূর্বের রূপ ফিরিয়ে দিতে নাকি সরকারের বরাদ্দ আসে যথেষ্ট। কিন্তু এদেশে যুগে যুগে বরাবারের মতো যা ঘটে চলেছে, তাই ঘটেছে এ নদীর ভাগ্যে। স্থানীয় প্রশাসন ও নেতাকর্মীদের লুটপাটে সব শেষ! 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইছামতি নদীতে ঘুরতেন, তার জমিদারী দেখতে আসতেন। কবিগুরু এ নদীর ঢেউয়ে ঢেউয়ে পরীর নাচন দেখেছিলেন। ইছামতিকে নিয়েই তিনি লিখেছিলেন, 'গায়ের মানুষ চিনি যারা নাইতে আসে জলে/গরু মহিষ নিয়ে তারা সাঁতরে ওপার চলে/ঢেউয়ে ঢেউয়ে পরীর নাচন'।  

বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন থেকে জানা গেল, পাবনা জেলার অন্যতম প্রধান নদীটি ইচ্ছেমতি নামেও পরিচিত। কয়েক শতাব্দী ধরে এ অঞ্চলের জনমানুষের জীবনের সঙ্গে মিশে রয়েছে মায়ের মতো। সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে ইসলাম খাঁ (শাসনকাল ১৬০৮-১৬১৬) সৈন্য পরিচালনার সুবিধার কথা বিবেচনা করে ইশা খাঁকে দিয়ে একটি খাল খনন করান। যমুনার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য খননকৃত ওই খালই পরবর্তীতে ইছামতি নদী নামে পরিচিত হয়। ইশা খাঁ'র নামানুসারে নামকরণ হয়েছে ইছামতি।

একটা নদী তার দুই তীরের বসতিকে সৌভাগ্যে ভাসায়। এর পলিতেই গড়ে ওঠে সভ্যতা। উন্নয়নের জোয়ারে নদী কখনো ভাটা আনে না। অথচ বাংলাদেশের অনেক নদী আমাদের অত্যাচারে শেষ হয়ে যাচ্ছে। ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হওয়া ইছামতি কিন্তু পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যর জন্যেও হুমকি হয়ে উঠেছে। জীববৈচিত্র্যের কথা নাই বা বললাম।  
 
কিছু কাজ হয়েছে বৈকি। যা কিনা নদীকে তার পুরনো চেহারা ফিরিয়ে দেয়ার জন্য কিছুই না। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ডিএস মৌজা ও মানচিত্র অনুযায়ী, ২০০৫ সালে সর্বশেষ জরিপ কাজ চালায় জেলা প্রশাসন। সেই জরিপের তথ্য হিসেবে, নদীর উৎসমুখ সদরের চর শিবরামপুর থেকে পাবনা পৌর এলাকার শালগাড়িয়া শ্মশানঘাট পর্যন্ত দীর্ঘ ৫ কিলোমিটারব্যাপী ৭টি মৌজায় নদীর ৫ হাজার বর্গফুট এলাকা বেদখল হয়ে গেছে। বিভিন্ন স্থানে ১২০ থেকে ২০০ ফুট চওড়া ইছামতি সঙ্কুচিত হয়ে মাত্র ৭০ থেকে ৮০ ফুটে পরিণত হয়েছে। ২০০৫ সালে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা নদী খনন ও পরিষ্কারের কাজ করে। এ ছাড়া ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় নদী খননের জন্য প্রায় ২৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ২ কোটি টাকা বরাদ্দে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু বর্জ্য অপসারণ ও অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করা হলেও গোটা প্রক্রিয়া আর শেষ হয়নি। এ তথ্যগুলো একটি দৈনিকের প্রতিবেদন থেকে নেয়া হয়েছে।  

একটা ফুটওভার ব্রিজ থেকে ঈশা খাঁয়ের বিখ্যাত সেই নদীর এমন জরাজীর্ণ অবস্থা যিনি দেখবেন, তার মনটা হু হু করে কেঁদে উঠবে। এখানেই যে কবির 'পরীর নাচন' চলতো, তা যেন রূপকথার গল্প ছাড়া কিছুই নয়। নদী দখল আর দুর্নীতি- সব বাস্তবতাই না হয় মেনে নিলাম। তবুও যে নদীর পলি, পানি আর বাতাসে পুষ্ট হয়ে যারা এতদূর এগিয়েছেন, তারা কিভাবে সেই নদীকে গলা টিপে মেরে ফেলতে পারেন, তা বোধগম্য নয়।  

পাবনাকে মায়ের মতো আগলে রেখেছিল ইছামতি, এখনো আছে। তবে বর্তমানে সন্তানদের শেষ ভালোবাসাটুকু বিলিয়ে দেয়ার সাধ্যও নেই সেই মায়ের। সময় থাকতে সবার কেবল সচেতন হওয়াই নয়, মাকে বাঁচাতে এখনই মাঠে নামা জরুরি। নয়তো এই মায়ের মৃত্যুর দায়ভার তার প্রত্যেক সন্তানকেই বহন করতে হবে।


মন্তব্য