kalerkantho


এই ছবিতেই সুস্থ হোক ‘অসুস্থ’ রাজনীতি

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১৩:২৮



এই ছবিতেই সুস্থ হোক ‘অসুস্থ’ রাজনীতি

পবিত্র ঈদুল আজহায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় করেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা

ছবিটি দেখে অধিকাংশ পাঠকই হয়তো মনে করবেন লেখাটি সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় প্রসঙ্গে। যারা এমনটি মনে করছেন তাদের জন্য এটুকু বলতেই হচ্ছে, লেখাটি পুরোপুরি সে বিষয়ে নয়।

একটি রায়কে কেন্দ্র করে দেশের রাজনীতিবিদরা ‘অসুস্থ’ রাজনীতির যে নোংরা খেলায় মেতেছেন, সেই নজীরবিহীন রাজনীতি এবং প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতির ঈদ শুভেচ্ছার ‘দুর্লভ’ ছবিই লেখাটির মূল বিষয়বস্তু।

গেল শনিবার অর্থাৎ পবিত্র ঈদুল আজহার দিন বিকেলে গণভবনে সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা এই অনুষ্ঠানে সমাজের প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষ যোগ দিয়েছিলেন। অনেকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তোলা ছবি ফেসবুকে পোষ্টও করেছেন। ওই অনুষ্ঠানে টেস্ট ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়াকে প্রথমবারের মতো হারানোর কারণে ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানকে নিজ হাতে মিষ্টি খাইয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। অথচ গণভবনে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে আসা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মানুষের শত শত ছবি কিংবা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাকিব আল হাসানের ছবিটিও তেমন একটা আলোচনায় আসেনি, যতটা না আলোচনায় এসেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার শুভেচ্ছা বিনিময়ের ছবি।  

অন্য দশটি ছবির মতো এই ছবিটিতেও দেখা যাচ্ছে প্রধান বিচারপতি হাত তুলে প্রধানমন্ত্রীকে সালাম জানাচ্ছেন এবং প্রধানমন্ত্রীও সেই সালামের জবাব দিচ্ছেন। এমনটাই তো হওয়া উচিত এবং এটাই স্বাভাবিক। টানাপড়েন চলছে বলে মুখ দেখা-দেখি হবে না, কথা বলাও বন্ধ থাকবে- তা কারোরই কাম্য নয়।

অধিকাংশ মানুষের মতো আমিও ছবিটি গেল শনিবার সন্ধ্যায় ফেসবুকে দেখেছি। সেদিন ফেসবুকে আমার বন্ধু তালিকার অধিকাংশের ওয়ালেই এই ছবি দেখেছি। শুধু আমার বন্ধু তালিকায় নয়, সময় যত গড়িয়েছে ততই ছবিটি ভাইরাল হয়েছে। ‘দুর্লভ’ এই ছবিটি নিয়ে ইতিমধ্যেই অনেক আলোচনা সমালোচনাও হয়েছে। মূলত এর পরই আমার কাছে মনে হয়েছে এটা সাধারণ কোনো ছবি নয়। অবশ্য এই সাধারণ ছবিটি ‘অসাধারণ’ কিংবা ‘দুর্লভ’ হওয়ার কারণও রয়েছে যথেষ্ট।  

ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে গেল আড়াই মাস ধরে সরকারের জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীরা ও সংসদ সদস্যবৃন্দ কিংবা আওয়ামী লীগের উঁচু গলার নেতারা যেভাবে বক্তব্য দিচ্ছেন, তাই মূলত এই ছবিকে আলোচনায় নিয়ে আসার মূল কারণ।

শুধু সরকার দলীয় রাজনীতিবিদরাই নয়, বিএনপির পক্ষ থেকেও এই রায়কে কেন্দ্র করে প্রতিক্রিয়া দেওয়া হয়েছে। বিএনপি কি প্রতিক্রিয়া দিয়েছে সে বিষয়ে আমি যাচ্ছি না। তবে পর্যবেক্ষণের যে বিষয়গুলো ক্ষমতাসীনদের ‘বিপক্ষে’ গেছে বিএনপি মূলত সেই বিষয়গুলো নিয়েই রাজনীতির মাঠ গরম রেখে চলেছে।  

শুধু রাজনীতিবিদরাই নয়, ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় লেখা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন খোদ সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী। তিনি বলেছেন, ‘এতো কম সময়ে ৪০০ পৃষ্ঠার পর্যবেড়্গণ লেখা সম্ভব নয় এবং এ রায় লিখেছে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। ’ যদিও এই তথ্য তিনি কোথায় পেয়েছেন বা কোন প্রমাণ আছে কিনা তা আমরা জানি না। প্রধান বিচারপতির ওপর সাবেক এই বিচারপতির ব্যক্তিগত কোন রাগ আছে কিনা তাও আমার জানা নেই। তবে বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরির এই বক্তব্য যে আজগুবি তা প্রমান করে দিয়েছে ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার।  পত্রিকাটি গেল ১ সেপ্টেম্বর দিন তারিখ উল্লেখ করে দেখিয়েছে যে, প্রধান বিচারপতি কত দ্রুততার সঙ্গে যুদ্ধাপরাধ সংক্রান্ত মামলাগুলোর রায় লিখেছেন।  

এমন বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রধান বিচারপতির এই শুভেচ্ছা বিনিময় খুবই তাৎর্যপূর্ণ। কেননা সরকারের যে মন্ত্রী, সাংসদ কিংবা নেতারা প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে বিষেদাগার করেছেন, সেই মন্ত্রী, সাংসদ ও নেতাদের মধ্যে অনেকেই তখন গণভবনে উপস্থিত ছিলেন।  

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রধান বিচারপতির হাস্যোজ্জ্বল ছবিটি দেখার পর ওই রাজনীতিবিদের প্রতিক্রিয়া খুব জানতে ইচ্ছে করছে।  

শুধু এ রায়ই নয়, এ ছাড়াও আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা অনেক সময় সাধারণ বিষয় নিয়েও কাদা ছোড়াছুড়ি করেন। যা দেশের জন্য কোনো মঙ্গল বয়ে আনে না। বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা ‘সুস্থ’ না ‘অসুস্থ’ রাজনীতি করছেন তা নির্ণয়ের ভার পাঠকদের ওপরই ছেড়ে দিলাম। তবে আমার প্রত্যশা প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে বিরোধীদলীয় নেতা বা নেত্রী কিংবা বিরোধীদলীয় নেতা বা নেত্রীর পক্ষে থেকে প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া দাওয়াতপত্রের সংবাদ যেন কোনো দিন না ছাপতে হয়! কারণ তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলবেন, দাওয়াত করবেন এটাই তো স্বাভাবিক।  

শেষ কথা, ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে রাজনীতিবিদরা এখন পর্যন্ত যা বলেছেন তা যেন এখানেই শেষ হয়। রায় সংক্রান্ত সকল বিষয় যেন আইনিভাবেই সমধান করা হয় এটাই প্রত্যাশা সবার। আর তা না হলে সাধারণ মানুষ বিচারবিভাগের প্রতি আস্থা হারাবে। রাজনীতি সবসময়ই ‘নীতির রাজা’, রাজনীতি যেন ‘রাজার নীতি’তে পরিণত না হয়-এটাই সবার প্রত্যাশা।  

লেখক : জুবায়ের আল মাহমুদ
সাংবাদিক : নিউজ টোয়েন্টিফোর টেলিভিশন


মন্তব্য