kalerkantho


দারুল উলুম দেওবন্দ এবং দুজন মুসলিম বিশ্ব পর্যটক

মাহফুয আহমদ   

২২ আগস্ট, ২০১৭ ১৬:০৯



দারুল উলুম দেওবন্দ এবং দুজন মুসলিম বিশ্ব পর্যটক

এক. আল্লামা আবুল হাসান আলি নদভী (রাহ.) (মৃ. ১৪২০ হি./১৯৯৯ ই.)'র ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার প্রয়োজনবোধ করছি না। আমরা মনে করি, আল্লাহ তা'আলা তাঁকে মুসলিম উম্মাহর একজন দরদী রাহবার হিসেবে কবুল করেছিলেন।

দুনিয়ার বহু দেশে তিনি সফর করেছেন। সেসব দেশের ধর্ম, শিক্ষা ও সংস্কৃতির ব্যাপারে তিনি গভীর পর্যবেক্ষণও করেছেন। আরবের জামেয়া আযহার ও মদিনা ইউনিভার্সিটি যেমন দেখেছেন, তেমনি ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড ও আমেরিকার শিকাগো ইউনিভার্সিটি ভ্রমণ করেছেন। সেই তিনি হিন্দুস্তানের দারুল উলুম দেওবন্দ সম্পর্কে তাঁর অভিব্যক্তি পেশ করেছেন।

দারুল উলুম দেওবন্দের শতবার্ষিকী আন্তর্জাতিক সম্মেলন প্রসঙ্গে স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, 'দারুল উলুম দেওবন্দ শুধু একটি দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটাকে "হিন্দুস্তানের জামেয়া আযহার" বলা সম্পূর্ণ যথার্থ, বরং কিছু কিছু দিক বিবেচনায় এটি মিসরের "জামেয়া আযহার" থেকেও অগ্রগামী- আকিদার পরিশুদ্ধি এবং কুরআন-সুন্নাহ প্রচারের ঐতিহ্যবাহী একটি মিশন হচ্ছে দারুল উলুম দেওবন্দ। প্রকৃত অর্থে এটি ওয়ালিউল্লাহি বংশের সংস্কারমূলক কর্মকাণ্ডের একটি বর্ধিত ও ধারাবাহিক অংশ। বস্তুত এর মাধ্যমে সময় ও অবস্থার পরিবর্তন এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের পালাবদল ইত্যাদির পরও মুসলিম জাতির যেটুকু ধর্মীয় পুঁজি অবশিষ্ট- সেগুলোর সংরক্ষণ, এ জন্য বড় একটি মারকাজ প্রতিষ্ঠা ও প্রবৃদ্ধির কর্মকৌশল আর সৃষ্টিশীল ও সৃজনধর্মী কর্মপন্থার ময়দান সংকীর্ণ হয়ে যাওয়ায় (সাময়িকভাবে) আত্মরক্ষামূলক অবস্থান গ্রহণ করা হয়। ১৮৫৭ সনের ভয়াবহ পরিস্থিতি, কঠিন আন্দোলন এবং এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব- এসব পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা না করে এ মিশনের মূল উপকরণ ও প্রতিপাদ্য বুঝা সম্ভব নয়। " (কারওয়ানে জিন্দেগি; আবুল হাসান আলি নদভী, ২/৩০০, মাকতাবায়ে ইসলাম, লাক্ষ্মৌ, তৃতীয় সংস্করণ ১৪২৬ হি./২০০৫ ই.)

দুই. শায়খুল ইসলাম আল্লামা তাকি উসমানি হাফিযাহুল্লাহ সর্বমহলে সমাদৃত একজন মুসলিম স্কলার।

ইসলামী অর্থনীতির আধুনিক রূপায়নের অন্যতম রূপকার। সুদমুক্ত ইসলামী ব্যাংকিংয়ের স্বপ্নদ্রষ্টা। ফিকহ ও ফাতাওয়া ছাড়াও বহু ক্ষেত্রে তিনি যে অবদান রেখে যাচ্ছেন তা কখনো ভোলার নয়। সফরের বিবেচনায় তিনি তো বর্তমান সময়ের একজন 'ইবনে বতুতা'। বরং কিছুদিক বিবেচনায় তাঁর থেকেও অগ্রগামী। দুনিয়ার বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের সঙ্গে মিলিত হওয়ার কারণে এখন তাঁর অভিজ্ঞতার পরিধি অনেক বিশাল। সেই তিনি দারুল উলুম দেওবন্দের শতবার্ষিকী আন্তর্জাতিক সম্মেলনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে দারুল উলুম সম্পর্কে তাঁর অভিব্যক্তি পেশ করেছেন।

তিনি বলেন, 'দারুল উলুম দেওবন্দ প্রান্তিক কোনো দলের নাম নয়, না এটি কোনো রাজনৈতিক পার্টি, না এটি এমন কোনো গোষ্ঠীর নাম যা সত্য ও অসত্য সবক্ষেত্রে অন্যের সঙ্গে আপোষ করার জন্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আর না এটি তর্কবিতর্ক করার এমন কোনো টিম যা বিশেষ কোনো দল ও মতের খণ্ডনের জন্যে অস্তিত্বে এসেছে- বরং প্রকৃত অর্থে দারুল উলুম দেওবন্দ হচ্ছে কুরআন-সুন্নাহর ওই বাস্তব ব্যাখ্যার নাম; যা সাহাবায়ে কেরাম, তাবিয়িন ও পূর্বসূরি মনীষীদের মধ্যস্থতায় আমাদের পর্যন্ত পৌঁছেছে। এটা ওই বিশুদ্ধ দ্বীনি ইলমের নাম; যা আকাবিরে উম্মত পেটে পাথর বেঁধে আমাদের পর্যন্ত পৌঁছিয়েছেন। এটা ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এমন সুঘ্রাণের নাম; যা সাহাবা-তাবিয়িনের জীবনচরিত থেকে প্রস্ফুটিত। এটা ওই কীর্তি ও অঙ্গীকারের নাম; যার সূত্রধারা বদর ও উহুদের ময়দান পর্যন্ত নিয়ে পৌঁছায়। এটা ওই ইখলাস ও লিল্লাহিয়াত, তাকওয়া ও তাহারাত, বিনয় ও সরলতা, সত্যকথন ও নির্ভয়তার নাম; যা ইসলামী  ইতিহাসের সকল ধাপে উলামায়ে হকের বৈশিষ্ট্য ছিল। বিগত শতাব্দীতে দারুল উলুম দেওবন্দের সংস্কারমূলক কাজ হচ্ছে এই যে, এটি মুসলমানদের অধঃপতনের যুগে এমন ইলমি ও আমলি গুণাগুণ পুনর্জীবিত করেছে এবং এমন লোক গড়ে তুলেছে যারা ছিলেন ওইসব গুণের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। সুতরাং যে ব্যক্তিই এসব বৈশিষ্ট্য অর্জন করবে, যিনি ওই পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথমে নিজের এবং পরে গোটা মুসলিম জাতির সংশোধনের জন্যে চিন্তাশীল হবেন তিনিই দারুল উলুম দেওবন্দের সঙ্গে সম্পৃক্ত; যদিও বাহ্যিকভাবে তিনি দারুল উলুম দেওবন্দ না দেখেই থাকেন। পক্ষান্তরে যিনি ওই গুণাবলীর ব্যাপারে বেখবর এবং এই মিশন সম্পর্কে বেপরোয়া- দারুল উলুম দেওবন্দের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই; যদিও তার নিকট দারুল উলুমের সনদ ও দস্তার বিদ্যমান থাকে। !' (জাহানে দিদাহ; তাকি উসমানি, পৃ. ৫১১, মাকতাবায়ে মাআরিফুল কুরআন, করাচি, নতুন সংস্করণ ১৪৩১ হি./২০১০ ঈ.)

লেখক : আলোচক, ইকরা টিভি, লন্ডন


মন্তব্য