kalerkantho


'আমার সমস্যা না মিটলে আমি ঠিকই আত্মহত্যা করবো!'

সাকিব সিকান্দার   

৪ জুলাই, ২০১৭ ১৯:৪৬



'আমার সমস্যা না মিটলে আমি ঠিকই আত্মহত্যা করবো!'

জন্মতারিখ দিয়ে নিজের মৃত্যুর তারিখটাও লিখে ছিল ছেলেটি

'এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জন্য নিজেকে নিয়ে আর কোনো আশা নেই। কেউ আমাকে ভালোবাসে না। আমি এখন নিজেকে শেষ করে দিতে চলেছি। গুড বাই, আমার প্রিয় বন্ধুরা', বুকে জমে থাকা কষ্টগুলোকে এভাবেই গুছিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিল ছেলেটি।  

নাম-পরিচয়-ঠিকানা বলছি না। ঘটনা সত্যি। বন্ধুর এমন পোস্ট দেখে রাত আড়াইটার দিকে বোকা বনে গেলো আমার ভাগ্নে। বাসায় আমরা সবাই অবাক!

আরেকটা পোস্টে ওর জন্ম তারিখ আর নিচে মৃত্যুর তারিখ লেখা ছিল!

'ও কি মজা করে এটা লিখতে পারে, এমন একটা পোস্ট?', চোখ কপালে তুলে প্রশ্ন করলাম।

'মনে হয় না মামা, ও সিরিয়াসলিই লিখেছে। আর ও এমন টাইপের ছেলে যে ঘটনা ঘটায়েও দিতে পারে। '

'তাহলে কি করা এখন, তোরা বন্ধুরা কি করবি?'

ভাইগ্নার চোখে কিছুই বুঝতে না পারার ছাপ স্পষ্ট। ঘটনাক্রমে ছেলেটা একই এলাকায় থাকে। এমনকি ও যে বাড়িতে থাকে, সেখানে ভাগ্নের আরকটা ফ্রেন্ড ভাড়া থাকে। এরা তিন জনই বন্ধু। দুই বন্ধুর মাঝে থাকা একটা বন্ধু আত্মহত্যার স্পষ্ট ঘোষণা দিয়ে দিয়েছে। ওরা বুঝতেই পারছে না ওদের করণীয় কি??!!

রাত তখন সাড়ে তিনটার মতো। মনে হলো, এটা জানার পর বসে থাকা তো যায় না। বৃষ্টি হচ্ছে। দুটো ছাতা নিয়ে বের হলাম মামা-ভাগিনা। যে বন্ধুটা ওই বাড়িতে ভাড়া থাকে তাকে বলা হলো নিচে এসে গেট খুলে দিতে।

গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছি দুজন, ভেতর থেকে স্রেফ তালায় চাবি ঢুকিয়ে গেটটা খুলবে আর অপারেশন শুরু হবে। গেটটাই খুলতে পারছে না ছেলেটা! কি আজীব! ও নিশ্চয়ই চরম নার্ভাস হয়ে পড়েছে। শেষ পর্যন্ত গেট খুলতেই পারলো না সে! গেট টপকে চোরের মতো দুজন ঢুকে পরলাম দেয়ালের ওপাশে। কেচি গেট গলে তর তর করে উঠে গেলাম।

ধুপ ধাপ ধুপ ধাপ দরজার নক করছি। কিছুক্ষণ পর ভেতর থেকে আওয়াজ দিলেন ছেলেটির বাবা, 'কে?' শুধু বললাম, 'সব কথা পরে বলছি, আপনি আগে দেখেন আপনার ছেলেটা ঠিক আছে নাকি। তারপর একটু দরজাটা খোলেন প্লিজ, কথা বলবো। '

বাকি ঘটনা বিস্তর। এর ফ্ল্যাশগুলো বলি- ছেলের বাবা দরজা খুললেন। ছেলেটাকে তুলে আনতে বললাম। ছেলেটাকে তুলে আনা হলো। প্রাথমিক ছবক দিয়ে তাকে নিয়ে তার ঘরেই ঢুকে পুলিশি তল্লাসি চালালাম। হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন ছেলের বাবা-মা আর ছোট ভাই। কিছু নেই। আত্মহত্যার জন্য ওর কাছে বিষ, চাকু, রশি বা ঘুমের ওষুধ নেই। ছোট ভাইটাকেও খুঁজতে বললাম।

কিন্তু মোটেও মজা ছিল না বিষয়টা! ছেলেটা সত্যি সত্যিই আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো। স্পষ্টভাবে আমাকে বললো, 'এ কাজ করতে শুধু একটা কাপড়ই যথেষ্ট। ' ফ্যানে ফাঁস দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল সে, আজ রাতেই।

ওর পরিকল্পনা বানচাল করলাম কড়া ভাষায়। আপাতত বুঝ দিয়ে বাকি দায়িত্ব ওর পরিবার ও দুই বন্ধুর কাঁধে চাপিয়ে বের হলাম। ছাতা ফুটিয়ে মামা-ভাইগ্না বাসার পথ ধরেছি, রাত তখন চার বা সাড়ে চারটা হবে। তিনটা কুকুর ঘেউ ঘেউ করছে। বাসায় সবাই এক দুনিয়া প্রশ্ন নিয়ে বসে আছে। 'ও ঠিক আছে তো? কি হলো বল তো'। প্রথমেই বললাম, না ছেলেটা আত্মহত্যা করতে পারেনি। এ কথায় সবার চোখে প্রাণের ঝিলিক দেখলাম। তারপর বললাম গোটা ঘটনাটা।

ওরা কেন এমন করে? জবাবে অনেক ব্যাখ্যা বেরিয়ে আসবে। তাতে না যাই। শুধু বলে এসেছি, 'ও যে ঘটনাই ঘটাক না কেন, আত্মহত্যার দ্বিতীয় পরিকল্পনার স্পর্ধাও যেন না করে। ' বাবা-মা আর বন্ধুরা আশাবাদী কথা দিয়েছে আমাকে। কিন্তু ছেলেটা বলে রেখেছে, 'আমার সমস্যা না মিটলে আমি ঠিকই আত্মহত্যা করবো.......'

লেখক : সহসম্পাদক, কালের কণ্ঠ


মন্তব্য