kalerkantho


সুযোগের অভাবে এখনও সৎ রয়েছি, এটাই আমার পুঁজি

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১ মার্চ, ২০১৭ ১২:৪২



সুযোগের অভাবে এখনও সৎ রয়েছি, এটাই আমার পুঁজি

২০১০ এর শেষের দিকের ঘটনা। সাংবাদিকতায় পড়ালেখা শেষ করে চাকরি খুঁজছি। চাচা নেই, মামা নেই, বড় ভাই নেই। তাই জানি না কোথায় মিলবে চাকরি! ২০১১র শুরুর দিকে তারপরও চাকরি নামের সোনার হরিণের দেখা মিলল। একটা অনলাইন পোর্টালের সম্পাদকের সাথে দেখা করতেই তিনি পছন্দ করলেন। বেতন নির্ধারণ হলো ১২ হাজার টাকা। মাস শেষে বেতন গুনে দেখা গেল ৮ হাজার। আমার সাথেই সে সময় শিবিরের এক ছেলের নিয়োগ হয়েছিল। ছেলেটি মাত্র ঢাকায় এসে অনার্সে পড়াশোনা শুরু করেছে। তার কাছ থেকে জানা গেল সে ১২ হাজার টাকাই পেয়েছে।

কারণটা অনুসন্ধান করে জানা গেল, সম্পাদক সাহেব জামাতি মন-মানসিকতার।

ছেলেটি শিবিরের হওয়ায় তাই তার বেতন ১২ হাজারই। যেহেতু আমি শিবির কিংবা জামায়াতের নই, কিংবা কোনো নেতা যেহেতু আমার জন্য ফোন দেয়নি তাই আমাকে না জানিয়ে ১২ থেকে ৮ হাজারে বেতন নেমে গেছে। জীবনের প্রথম চাকরি, পরিবার ও অফিসের সবাই জানে বেতন ১২ হাজার। আসলে পাই ৮ হাজার। না পারছি বলতে না পারছি সইতে।

সম্পাদককে জানাতেই তিনি জানালেন না পোষালে চাকরি করার দরকার নেই। যেহেতু তার বদৌলতে চাকরি শুরু, তাই মুখ বুজে ১২ হাজার টাকার স্ট্যাটাস রাখতে গিয়ে রীতিমতো শোচনীয় অবস্থা। এদিকে, চাকরির ভাব নিতে গিয়ে বাসা থেকে টাকা নেওয়াও বন্ধ করেছি। কিন্তু, দিনের পর দিন সস্তা হোটেল কিংবা না খেয়েও রিপোর্টার স্ট্যাটাস মেইনটেইন করা যে কি কঠিন তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়।

অনলাইন পোর্টালটি সে সময়ে বেশ জনপ্রিয়। রিপোর্ট ছাপিয়ে দিলে অনেক জায়গা থেকে টাকা পাওয়ার অফার পাওয়া যেত। কিন্তু না খেয়ে থেকেও কোনোদিন টাকার বিনিময়ে কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করিনি। জার্নালিজমে পড়াকালীন অবস্থায় 'ইথিকস অব জার্নালিসম' পড়িয়েছিলেন একজন শ্রদ্ধেয় স্যার। ভালো মার্কস পাইনি। কিন্তু তারপরও ইথিকসটা কেন যেন মাথায় ঢুকে পড়ল! সে সময় স্যারকে দোষারোপ করতে কার্পণ্য বোধ করতাম না।

সাল ২০১৩। ইতিমধ্যে দুটো প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করেছি। কাজ করছি তৃতীয় প্রতিষ্ঠানে। অপরাধবিষয়ক বিটে আমার সাথেই কাজ করেন জনৈক সিনিয়র। তিনি আমাকে অনেক করে বোঝালেন তার সাথে কাজ করে 'ধান্দাবাজি'তে আমি ১ নম্বর হতে পারব। বিনিময়ে তাকে বিভিন্ন তদ্বিরের কাজ এনে দিতে হবে। কিন্তু এবারও হলো না। কেন যেন তার এসব কথায় মন বিষিয়ে গেল। যথারীতি সম্পর্কের অবনতি। তাই দ্রুত সেই প্রতিষ্ঠান ছেড়ে দিলাম। এরপর তাকে ছাড়াই সফলভাবে চতুর্থ প্রতিষ্ঠানে অপরাধবিষয়ক বিটের প্রধান হিসেবে জয়েন করলাম।

পঞ্চম প্রতিষ্ঠানে পরিচয় হলো প্রখ্যাত অপরাধবিষয়ক সাংবাদিকের সাথে। তিনি নাকি কারাগারের সংবাদ পরিবেশনে রীতিমতো প্রখ্যাত। প্রতিদিন সন্ধ্যায় পত্রিকা অফিসে এসে অনলাইন থেকে নিউজ কপি পেস্ট করে বাইলাইনে ৫-৬টা করে নিউজ ছাপতেন। কপি পেস্টের কথা জিজ্ঞেস করতেই তার উত্তর 'এসব অনলাইন সার্ভিস থেকে নেওয়া', তাই একে কপি পেস্ট বলা যাবে না। কারণ তার কারণেই নাকি এসব অনলাইন সার্ভিস টিকে আছে। ঘটনা বুঝতে পেরেও চুপ থাকতে হয়েছে। কারণ তিনি সম্পাদকের বিশেষ প্রিয়ভাজন। সম্পাদকের বিভিন্ন তদ্বিরের কাজ তার মাধ্যমেই হয়ে থাকে। আর আমি ছাপোষা সাংবাদিক সারাদিন স্পটে স্পটে ঘুরে ১টা বিশেষ সংবাদ দিতে গেলেও দম বের হয়ে যেত। একদিন পরিচিত এক পুলিশ কর্মকর্তা জানালেন, তার এক ঘনিষ্টজনকে পুলিশে চাকরি দেওয়ার নাম করে সেই কথিত প্রখ্যাত সাংবাদিক বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়েছেন। কাজ হয়নি। ১ বছর যাবৎ তিনি ঘোরাচ্ছেন। আমি তাকে বিষয়টি জানাতেই আমার ওপর জ্বলে উঠলেন। সম্পাদককে গিয়ে জানালেন সারাদিন ঘুরে এসে আমি ১টা করে বিশেষ সংবাদ দেই। তার মতো ৫-৬টা করে সংবাদ দিতে পারি না। যথারীতি সেই প্রতিষ্ঠানও ত্যাগ করতে হলো। অনেকদিন পর সেই সাংবাদিকের সাথে দেখা হয়েছিল। তিনি তখন একটি নামসর্বস্ব পত্রিকায় চাকরি করেন। বিভিন্ন সাংবাদিক সম্মেলনে তাকে হল কিংবা অডিটরিয়ামের বাইরে দেখা যায়। তার কাজ, অপরাধের শিকার ব্যক্তি কিংবা পরিবারের কাছ থেকে তদ্বিরে সংবাদ ছাপিয়ে দেওয়ার নাম করে টাকা নেন তিনি।

বর্তমানে আমি কাজ করছি একটি অনুসন্ধানী টিমে। অনুসন্ধান করতে গিয়ে কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে প্রায়ই সাপ বেড়িয়ে আসে। সেই সাপেরা যথারীতি মোটা পরিমাণ টাকার অফারও করেন। একটা হিসেব কষে দেখেছি, গত ৩ বছরে অনুসন্ধান কাজে যে টাকার অফার পেয়েছি, তা যদি নিতে পারতাম তাহলে ৭ বছরের ক্যারিয়ারেই আমার নিজস্ব দুটি ফ্ল্যাট, সরকারি শপিংমলে ১০টি দোকান আর ১টি গাড়ি থাকত। মাসে হয়তো সেসব থেকে গড়ে ৩ লাখ টাকা আয় হতো। যাই হোক, স্বপ্ন দেখা ভালো। আমিও মাঝে মাঝে সেই ৩ লাখ টাকার স্ট্যাটাস উটের জাবর কাটার মতো তারিয়ে তারিয়ে উপভোগও করি। সেদিনই একজন বলছিলেন, 'আপনাদের দেখে আমার খুব লোভ হয়, যদি আপনাদের টিমে থাকতে পারতাম তাহলে আমি আপনাদের মতো ধান্দা করতে পারতাম। ' সেই ভাইয়ের কথার জবাবে হাসি দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। কে জানে, সেই হাসি দেখে হয়তো তিনি তার 'কামনার' উত্তরও পেয়েছিলেন। আমি বলবো না টাকা না নেওয়াটাকে সততা বলে কিনা। তারপরও সেই যে ইথিকস অব জার্নালিসম মাথায় ঢুকেছিল সেটাকে আর নামাতে পারিনি। হয়তো সুযোগের অভাবে এখনও সৎ রয়েছি। তারপরও দিন শেষে এটাই আমার পুঁজি। এ সততাকেই হয়তো ভালোবাসি বড্ড বেশি। এ পেশার প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ যেন চিরদিনই এমনটাই থাকে, সবার কাছে সে দোয়াই কাম্য।
লেখক : তাইমুর হাসান শুভ

 


মন্তব্য