kalerkantho


আসুন, ‘পাকি’ শব্দের মিথ এক্সপ্লোড করি

আহ্‌সান কবীর

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০৬



আসুন, ‘পাকি’ শব্দের মিথ এক্সপ্লোড করি

গত বছরের কথা। সদ্য মুক্তি পাওয়া হলিউডি মুভি জুরাসিক ওয়ার্ল্ড নয়া ব্যবসায়িক রেকর্ড করতে যাচ্ছে- এমন একটা সময়ে ছবির নির্মাতারা মহাখুশি।

নিছক বিনোদনমূলক এই ছবিটিই পাকিস্তানিদের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দেখা দেয়। ছবিটির একটি সংলাপ নিয়ে এর বিরুদ্ধে বর্ণবাদ ছড়ানোর অভিযোগ আনা হয় তখন।

জুরাসিক ওয়ার্ল্ড চলচ্চিত্রে একটি ডাইনোসরের নাম পাকিসেফালউরাস। এটি আসলে প্রাগৈতিহাসিক অতিকায় প্রাণী ডাইনোসরদের একটি প্রজাতির নাম। ৬৫ মিলিয়ন বছর আগে পর্যন্ত পৃথিবী দাপিয়ে বেড়িয়েছে এরা। এ পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল।

গোল বাধে যখন ছবিতে দেখা যায় খাঁচার ঘেরাটোপ থেকে কয়েকটি পাকিসেফালউরাস ডাইনোসর বের হয়ে যায়। তখন জুরাসিক ওয়ার্ল্ডের একজন কর্মচারী চিত্কার করে হুঁশিয়ারি জানাতে থাকে এই বলে যে ‘পাকিরা খাঁচা থেকে বের হয়ে গেছে। ’ এ ক্ষেত্রে সে ‘পাকিসেফালউরাস’-এর সংক্ষিপ্ত রূপ ‘পাকি’ উচ্চারণ করে।

কিন্তু লম্বা আর সেকেলে নামটাকে সংক্ষিপ্ত আর আদুরে ভঙ্গিতে উচ্চারণ করতে গিয়ে সে যা করেছে তা পাকিস্তান আর পাকিস্তানিদের কানপট্টি লাল করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

কারণ ‘পাকি’ শব্দটা দিয়ে আদতে পাকিস্তানিদের গালি দেওয়া হয়। ইউরোপ-আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়া, এমনকি মধ্যপ্রাচ্যসহ এশিয়ার অন্যান্য দেশেও ‘পাকি’ একটি খারাপ গালি হিসেবেই পরিচিত। অন্য জাতির কাছে এটি পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে ব্যবহারযোগ্য অতি আক্রমণাত্মক  এক বিশেষণ।

তবে এই পাকি শব্দটির বানান আর জুরাসিক ওয়ার্ল্ডের পাকির বানান দুটি আলাদা। বানান ভিন্ন হলে হবে কী- উচ্চারণে তো মিলে গেছে!

তাই দুনিয়ার বিভিন্ন দেশের সিনেমা হলে ছবিটি দেখতে বসে পাকিস্তানিরা বেশ অস্বস্তিতে পড়ে। ছবিজুড়ে অসাধারণ সব স্পেশাল ইফেক্টের মনোমুগ্ধকর মোহময়তা ছাড়িয়ে তাদের মননে-মস্তিষ্কে শুধু একটি বিষয়ই অস্বস্তির খচখচে অনুভূতি দিয়ে গেছে- পাকি, পাকি, পাকি!

ব্যাপারটা এত দূর গড়ায় যে পাকিবান্ধব অনেকেই ছবিটি বয়কটের আহ্বান জানায়।

পাকিস্তানিদের কেউ কেউ নাকি এমনও শুনেছে যে ‘দ্য পাকিস আর আউট অব কনটেইনমেন্ট’-এর স্থলে জুরাসিক ওয়ার্ল্ডের ওই কর্মীটি চিত্কার করে বলছে, দিজ পাকিস আর গেটিং আউট অব কন্ট্রোল! মানে পাকি সম্বোধনের আড়ালে ডাকা ‘পাকিস্তানিরা’ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে! পাকিস্তানিদের ধারণা, ওই আপত্তিকর সংলাপ দিয়ে এমনই বোঝানো হয়েছে প্রকারান্তরে।

তবে এই ধারণা আসলে দুনিয়ার বেশির ভাগ মানুষেরই এবং বাঙালি মাত্রেরই যে পাকিস্তানিরা আসলেও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে, সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে যা এর আগেও অনেকবার গেছে তারা। সম্প্রতি আলোচনায় আসা একচোখা পাকিস্তানি বুদ্ধিজীবী ড. জুনাইদ আহমেদের লেখা ‘ক্রিয়েশন অব বাংলাদেশ : মিথ এক্সপ্লোডেড’ নামের বস্তাপচা বইটিও পুরো দুনিয়াকে একই কথা মনে করতে বাধ্য করছে।

পাকিরা হরহামেশাই ভুলে যায় যে সীমা লঙ্ঘনকারীকে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাও পছন্দ করেন না। তারা নিজেদের করা অমার্জনীয় পাপকে, মানবতাবিরোধী অপরাধকে এখন হালাল করার জন্য ১৯৭১ সালের তিতা সত্যকে ‘মিথ এক্সপ্লোডেড’ বলে চালানোর অপচেষ্টা চালায়।

জুনাইদ আহমেদ পাকিস্তানভিত্তিক করাচি ফাউন্ডেশন অব ফরেন রিলেশনসের (কেসিএফআর) একজন সদস্য এবং ‘গবেষক’ও বটে। এই পাকিটার বই নামক মিথ্যাচারের বস্তাটি ভরতে যাবতীয় তাগিদ, তাগাদা, অনুপ্রেরণা আর টাকা-পয়সা ঢেলেছে কেসিআরএফ। তবে আদতে এটা পাকিস্তানি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়েরই কাজ বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ।  

এই বইতে জুনাইদ একচোখা পাকিস্তানিরা বাংলাদেশ সম্পর্কে এত দিন যা ভেবে এসেছে তারই একটি ‘দালিলিক’ রূপ দিতে চেয়েছেন। এ নিয়ে আমাদের মহান বিজয় দিবসের দিন অর্থাৎ গত ১৬ ডিসেম্বর করাচিতে গ্রন্থ প্রকাশ আলোচনা সভা নামক এক শয়তানি সভার আয়োজন করে তারা।

সভায় জন্মবিভ্রান্ত কিছু পাকি আলোচক এই বলে বেশ আক্ষেপও করেছে যে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও ১৯৭১ সালের ঘটনাবলি গত ৪৫ বছরে শুধু বাংলাদেশ আর ভারত তাদের নিজেদের মতো করে বয়ান করে গেছে। তারা নাকি তাদের কথা তুলে ধরেনি। ওই বইতে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ঘটানো অনেক পৈশাচিক কাণ্ডের দায় মুক্তিবাহিনীর ওপর চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করা হয়েছে। দুনিয়াজুড়ে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানি হানাদারদের করা হত্যাকাণ্ডের ছবির ক্যাপশন বদলে তা এখন মুক্তিযোদ্ধাদের করা বলে চালানোর নির্লজ্জ চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এমন অপচেষ্টা এই প্রথম নয়।

দাম্ভিক আর অপরিণামদর্শী এক পাকি জেনারেলের বই ‘ডায়েরিজ অব ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান : ১৯৬২-৭২’-এও এই অপচেষ্টা  করা হয়েছিল। বছর দশেক আগে প্রকাশিত ওই বইটি বাঙালিবিদ্বেষের আরেকটি জ্বলজ্বলে প্রমাণ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। আইয়ুবশাহী তাঁর ওই ডায়েরিতে মুণ্ডুপাত করতে চেয়েছেন অনেক জাতেরই। সেখানে বাংলাদেশিরা কূটিল, ভারতীয়রা ধড়িবাজ আর আমেরিকানরা হচ্ছে অনির্ভরযোগ্য।

নির্বোধ আইয়ুবের মাতলামিপূর্ণ বাতচিতের ধারাবাহিকতা পাকিস্তানি বুদ্ধিজীবী তথা সামরিক-বেসামরিক আমলাদের একচোখা শ্রেণিটা একইভাবে চালিয়ে যাচ্ছে, যার সর্বশেষ প্রমাণ পাকি জুনাইদের লেখা বই ‘ক্রিয়েশন অব বাংলাদেশ : মিথ এক্সপ্লোডেড। ’

এর বিপরীতে আমরা কিন্তু কৌশলগত বা বুদ্ধিবৃত্তিক কিছুই করছি না। উল্টো আমাদের যাবতীয় লেখাজোখায় তাদের এক ধরনের মহীয়ান-গরীয়ান করে রেখেছি, রাখছি। ১৯৪৭ থেকে নিয়ে ১৯৭১ সাল ও তত্পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানিদের এত জঘন্য অপরাধ আর অনাচার সত্ত্বেও আমাদের যাবতীয় লেখাজোখায় ‘পাকি’ শব্দটি এখনো উঠে আসেনি। তারা আমাদের বিরুদ্ধে তাদের ষড়যন্ত্র জারি রেখেছে, একের পর এক চালিয়ে যাচ্ছে অপকর্ম। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাদের সম্পর্কে আমরা এখনো লিখি বা বলি ‘পাক’ সরকার, পাক ক্রিকেট দল, ‘পাক’ আর্মি বা ‘পাক’ হানাদার কিংবা ‘পাক’ সেনা।

আমার আপত্তিটা এখানেই।

কারণ উপমহাদেশীয় আবহে ‘পাক’ শব্দটি উচ্চারণে প্রকারান্তরে মনের ভেতর পূত-পবিত্র একটা ভাব ফুটে ওঠে।

এ ক্ষেত্রে এই ভাষার মাসে, মহান স্বাধীনতার মাসের দ্বারপ্রান্তে আজকের এই সময়ে বাংলাদেশ সরকার ও সমগ্র জাতির কাছে আমার একটি আবেদন আছে। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার তো আমরা করছিই, এখন এ অপরাধীদের শক্তিকেন্দ্রে বৃদ্ধিবৃত্তিক আঘাত হানতে হবে। সে জন্য আসুন পাকিস্তানিদের নামোল্লেখের আগে ‘পাক’ না বলে ‘পাকি’ তকমাটি জুড়ে দিই। এটা তাদের পাওনা হয়ে গেছে অনেক আগেই। কারণ যেমন কুকুর তেমন মুগুর না হলে তো দুনিয়ার পথে চলা যায় না।

লেখক : সাংবাদিক


মন্তব্য