kalerkantho


হায়! আমাদের শৈশব!

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ২২:৪৩



হায়! আমাদের শৈশব!

মুক্তা, হিরা, কহিনুর আর টিপু! আমার এই চারজন ভাগ্নে-ভাগ্নির মধ্যে টিপু একটু বড় হওয়ায় ও ছিলো আমার অ্যাসিসট্যান্ট আর সবার চেয়ে একটু বড় হওয়ায় আমি ছিলাম ওদের লিডার!

ওরা আমাদের বাড়িতে যে কয়টা দিন থাকতো, সে কয়টা দিন আমাদের নাওয়া-খাওয়া-ঘুম হারাম হয়ে যেতো!

আমাদের জোড়া লাগানো ঘরের সামনে বড় একটি উঠোন ছিলো। বর্ষা মৌসুমে সেই উঠোনটি পাটখড়িতে ভরা থাকতো! সাদা ধবধবে পাটখড়ির পালাতে আমরা পাঁচজনে আলাদা আলাদা ঘর বানাতাম।

একজন আরেক জনের ঘরে গিয়ে দাওয়াত দিতাম, খেতাম!

আমাদের বাড়ি থেকে সাত আটটি বাড়ির পরে আমাদের একটি ভিটা ছিলো! হারানের ভিটা! হারান নামের কারো কাছ থেকে কেনা ছিলো সেই ভিটাটি। সেখানে চাষ হতো হরেক রকমের সবজি। আমরা প্রতিদিন বিকেলে সেই ভিটায় গিয়ে বেগুন গাছে বাসা বানানো টুনটুনিদের পিছু নিতাম! কার কোনটি টুনটুনির বাসা সেখানে ঝাণ্ডা উড়াতাম!

বাড়ির সামনে আম বাগান ছিলো। আমাদের পাঁচজনের আলাদা আলাদা পছন্দের আম গাছ ছিলো! সেই গাছে আবার আমাদের রশি ঝোলানো থাকতো। আমরা যখন খুশি তখন দৌঁড়ে এসে দোল খেতাম!

পাড়ার পোলাপানরা সবাই ছিলো এক পক্ষ আর আমরা পাঁচজনে ছিলাম আরেক পক্ষ! বাড়ির পিছনে আমাদের বড় একটি পুকুর ছিলো! সেখানে আমরা এই দুই পক্ষ কলা গাছের খোল দিয়ে নৌকা বানিয়ে নৌকা বাইচ দিতাম। বাইচ শেষে জুলাপাতি রান্না করতাম; পুরস্কার দিতাম!

বাড়ির উত্তর পাশে ছিলো কয়েকটি কৃষ্ণচূড়া গাছ। যখন ফুলে ভরে যেতো গাছ তখন কার কোনটি নিয়ে হতো আমাদের মধ্যে ঝগড়া-ঝাটি! মান অভিমান!

কাচারি ঘরের পাশে ছিলো আমাদের ফুল বাগান। সেখানে আমাদের হাসনাহেনা, রজনিগন্ধা, গোলাপ, গন্ধরাজ, নার্গিস, জবাসহ আরও কি কি ফুল গাছ ছিলো! আমরা প্রতিদিনই সেখানে পানি দিতাম, পরিস্কার করতাম; একে অন্যের গাছ থেকে ফুলও ছিড়তাম!

জোড়া লাগানো ঘরে ছিলো জোড়া লাগানো টপ বারান্দা! বারান্দায় বিভিন্ন রকমের মাছ শোকাতে দিতো। সন্ধ্যা হলেই আমি বারান্দার ওপরে ওঠতাম আর ওদেরকে নিচে ওড়না ধরে রাখতে কইতাম! আমি ঝাড়ু দিয়ে দিয়ে চিংড়ির ডিম নামাতাম।

তারপরে সেই ডিম মা আমাদেরকে ভেজে দিতো আর আমরা সবাই কাঠায় করে মুড়ির মতো খেতাম!

ত্রিশ বছর আগের সেই সাদা ধবধবে পাটখড়ির পালার ঘর, বেগুন বাগানে টুনটুনির বাসা, আম গাছে দোল খাওয়া, কলা গাছের খোলের নৌকা বাইচ, হরেক রকমের ফুল গাছ চাষ আর কাঠায় ভরে চিংড়ির ডিম ভাজি খাওয়ার কথা যখন মনে হয় তখন নিজের কাছেই 'রূপকথা' 'রূপকথা' লাগে!

আজ ত্রিশ বছর পরে যখন এই কথাগুলো ভাবতেছি তখন আমাদের এই পাঁচজন দুনিয়ার পাঁচ জায়গায়; পাঁচ রকমের কাজে ব্যস্ত! একটা সময় গলায় গলায় ভাব হলেও এখন কথা পর্যন্ত হয় না!

সর্বনাশা যমুনা যেমন আমাদের সেই গর্বের বাড়িটা কেড়ে নিয়েছে, তেমনি দিন দিন যান্ত্রিক ব্যস্ততা আমাদেরকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে!

হায়! আমাদের শৈশব!

- আনিসুর বুলবুলের ফেসবুক থেকে।


মন্তব্য