kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


'আয়নাবাজি', 'আম দর্শক' 'শাকিব খান' ও কিছু 'হাইব্রিড কাঁকরোল'!

আরিফুর রহমান   

৭ অক্টোবর, ২০১৬ ১৩:৫২



'আয়নাবাজি', 'আম দর্শক' 'শাকিব খান' ও কিছু 'হাইব্রিড কাঁকরোল'!

সিরাজগঞ্জ গিয়েছিলাম শুটিং এর কাজে। সারাদিন শুটিং করে আমরা খুব ক্লান্ত, পাশেই সাগরিকা সিনেমা হল, আয়নাবাজি মুক্তি পেয়েছে সেদিন, গেলাম দেখতে; কিন্তু না সেখানে চলছে শুটার।

মেজাজ খারাপ হয়ে গেল, পোস্টারে লিখা আয়নাবাজি আসছে, সাগরিকায় শুক্রবারে!

খুঁজে বের করলাম হল মালিক কে, তিনি বললেন গেঞ্জাম হইসে, এই সপ্তা শুটার চলবে। সাধারণ দর্শকদের কাছে জানতে চাইলাম কি ছবি দেখতে আসছেন বলল সাকিব খানের ছবি; জানতে চাইলাম কেন? বলল ভাই 'খান' দেশে একটাই!

বললাম কি ভাল্লাগে খানের? কলার উঁচিয়ে বলল, 'ভাইয়ের স্টাইল'। ওনার কথা বলার ভঙ্গিটা খুব ভালো লাগল।

হল মালিককে বললাম, ''ভাই আর কোথায় চলে 'আয়নাবাজী'?'' তিনি ফোনে কোনো একজনের সাথে কথা বলে জানালেন গৌরী সিনেমা হলে। আরও জানালেন সেখানে যেতে পাক্কা এক ঘণ্টা লাগবে। টিমের সবার দিকে তাকালাম, বুঝলাম সবাই খুবই ক্লান্ত কিন্তু ছবি দেখার ব্যাপারে মাশরাফির মতো একরোখা! পাশ থেকে একজন টিপ্পনি কাটল ভাই ইজি বাইক এ উঠে যান আল্লার নাম নিয়ে, ইনশাল্লাহ তিন ঘণ্টায় পৌঁছে যাবেন, আর ওই রাস্তায় মাঝে মাঝে ডাকাতিও হয় কিন্তু! আমরা হেসেই উড়িয়ে দিলাম! মোড়ের দোকানে এক গ্লাস করে গরম দুধ আর আধা সেদ্ধ হাসের ডিম খেয়ে সিএনজিতে উঠে বসলাম। আমরা সবাই শক্ত হয়ে আছি তবে গুগল ম্যাপ আমাদের আশ্বস্ত করল আমরা ঠিক পথেই যাচ্ছি।

গৌরী যখন পৌছালাম তখন হলের ভেতর থেকে জাতীয় সংগীত ভেসে আসছে। ৪০ টাকা করে টিকেট কেটে আমরা পাঁচজন হলে ঢুকে পড়লাম। হলে মোটামুটি ভর্তি দর্শক (আমি নিশ্চিত এরাই এই হলের নিয়মিত দর্শক), আমি লিখে বোঝাতে পারবো না, তাদের সাথে ছবি দেখাটা যে কি সুখের! তাদের আনন্দগুলো কতটা নির্মল, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি কতটা সরল! তারা জাস্ট ছবিটা চেটেপুটেই খেলো। বিষয়টা এমন না যে ভাত খেতে বসে প্রথমেই ভাতের মধ্যে থেকে কাঁকড় বা তরকারির মধ্যে থেকে একটা কোঁকড়া চুল খুঁজে বের করা এবং মুখে খিস্তি করে হাত ধুয়ে উঠে যাওয়া; বরং তারা হাসতে হাসতেই কাকড় ও চুল ফেলে দিয়ে ভাতের রসটুকু খেয়ে নিলো এবং খাওয়া শেষে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে পান চিবুতে থাকলো।

আমার খুব হিংসা হচ্ছিলো কারণ আমরা মধ্যবিত্ত এটা পারি না! আমরা খুবি অসুখী একটা চর্চা'র মধ্যে থাকি সব সময়! আমরা না 'ঘারকা না ঘাটকা' অথবা না 'বাঙ্গালী না মুসলমান' এমন আরকি বিষয়টা! ফেসবুক এসে তো আমরা সারাক্ষণই এই ডিলেমার মধ্যে থাকি!

সব মায়েরই তো বাচ্চা জন্ম দেবার সময় একই পেইন নিতে হয় তাই না, কিন্তু কজনের বাচ্চা 'সু' হয় বলেন তো? তাই বলে কি কেউ প্রেসক্রিপশন দেয়; সব মা বাচ্চা জন্ম দিতে পারবেনা! 'আমাদের সিনেমা' 'আমাদের সিনেমা' বলে যে গলা ছিঁড়ে ফেলছি আমরা কি জানি এটা একদিনের কোন জার্নি না! সাগরিকা সিনেমা হলের মালিক আমাদের জানালেন একসময় চালা ইউনিওনেই ছিল ১৩ টা হল আর এখন মাত্র ২ টা! আর পুরো রাজশাহী শহরে এখন কয়টা সিনেমা হল জানেন? মাত্র একটা, আর বরগুনা শহরে কোন সিনেমা হলই নাই! সারা দেশে সিনেমা হলের সংখ্যা নেমে এসেছে ৩০০ এর নিচে! তাহলে হিসাব সহজ সিনেমাই যদি না হয় তাহলে জাদুঘরের মত হয়ত একটা দুটা হল থাকবে তাই না!

আমি 'মাটির প্রজার দেশে'র ছবির প্রযোজক (Kingdom of Clay Subjects/মাটির প্রজার দেশে) আমার এই ছবি শেষ করতে সময় লেগেছে ৫ বছর, জমি বেঁচে যেই ছবি শেষ করেছি সেই ছবি আস্তাকুড়ে ফেলে দিতে আমাদের এক সেকেন্ডও লাগবেনা আমি খুব ভাল করেই জানি! ফেলে দিয়েই আবার কান্না শুরু করবো কবে হবে 'আমাদের ছবি'?

লেখাটা শেষ করছি একটা মজার ঘটনা দিয়ে, সিরাজগঞ্জের দেলুয়া বাজারে একদিন শুটিং করছি, হঠাৎ আমার চোখ আটকে গেলো কাঁঠালের মত দেখতে একটা নতুন ফলের দিকে। আমি কাছে যেয়ে বিক্রেতার কাছে জানতে চাইলাম ভাই এটা কি ফল? উনি অবাক হয়ে বললেন এটা তো ফল না, এটা কাঁকরোল! আমি তো রীতিমত একটা ভিরমি খেলাম! পরে আয়নাবাজী সিনেমার বিভিন্ন রিভিউ পড়তে পড়তে একটা রিভিউ পরে আমার সেই কাঁকরোল দেখার অনুভূতি হোল! সঙ্গত কারণেই যিনি লিখেছেন তার নামটা প্রকাশ করছি না! কিন্তু তিনি যা লিখেছেন তার চুম্বক নিচে দিয়ে দিলাম!

'হেগেলিয়ান ডায়ালেকটিকের থিসিস অ্যান্টি থিসিস এর সংঘাতে অ্যানটি থিসিস... ফয়েরবাখ, মার্কস এর দান্দিক বস্তুবাদ আর ঐতিহাসিক বস্তুবাদ...।

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ লেখাটি বাংলা সিনেমা'র দর্শক নিয়ে আমার একেবারেই নিজস্ব উপলব্ধির জায়গা থেকে লিখা! কেউ আহত হলে নিজ দায়িত্বে হবেন! তবে যে কোন অনিচ্ছাকৃত ভুল তথ্যের ব্যাপারে আমাকে জানান দিতে পারেন। আর এই ছবি 'আয়নাবাজী' না হয়ে 'চিরুনিবাজী' বা 'লাগবাবাজী' হলেও আমার অবস্থান একই থাকবে!

সবাই হলে গিয়ে সিনেমা দেখুন, শুধু স্টার বা ব্লক বাসটার নয়, পারলে ঢাকার বাইরে একদিন সিনেমা দেখে আসুন! সিনেমা হলকে আলুর গুদাম হওয়া থেকে রক্ষা করুন। সুখে থাকুন সুস্থ থাকুন। বেঁচে থাক 'সিনেমা'!

লেখক, চলচ্চিত্র প্রযোজক


মন্তব্য