kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


থাকতে না হয় আরও কিছুকাল

মিতা দাশ গুপ্তা   

৬ অক্টোবর, ২০১৬ ১২:১১



থাকতে না হয় আরও কিছুকাল

১৯৮১ সালের ৬ অক্টোবর আমরা বিয়ে করেছিলাম। সেই হিসেবে এ দিনটি ছিল আমাদের বিয়ে বার্ষিকী।

বিয়ের পর আর বিয়ে বার্ষিকী নিয়ে কোনো উৎসাহ ছিল না আমার। যেন বিষয়টা ছিল এমন যে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে অবশেষে বিয়েটা হলো- এই অনেক আমার কাছে। তুমি আছ আমার কাছে, আমার পাশে- এটাই আমার কাছে অনেক আনন্দের।

কিন্তু তুমি ছিলে ঠিক অন্যরকম, আমার বিপরীত। বিয়ে বার্ষিকী উদযাপন করতেই হবে। ঘটা করে করা হয়নি কখনোই, কিন্তু তুমি প্রতিটি বিবাহবার্ষিকী উদযাপন করেছ একান্ত নিজের মতো করে। এ দিনটিকে ভুলতে তোমাকে আমি দেখিনি কখনও। আমার হয়ত একদমই কিছু মনে নেই, কিন্তু তুমি ঠিকই মনে করে আমার জন্য ছোট উপহার আর ফুল দিতে ভুল করোনি।

একদিনের কথা বিশেষভাবে মনে আছে। আমি বাইরে ছিলাম, হঠাৎ তোমার ফোন বেজে উঠল। তুমি জিজ্ঞেস করলে, মিতু কি খাবে? বিরিয়ানি, না নান-চিকেন? আমি তো রীতিমত চেঁচিয়ে উঠলাম, কেন বিরিয়ানি খাব? তোমরা বুঝি টাকা খরচ না করলে চলে না? তখন তুমি আমাকে শান্ত করার জন্য বললে, আজ আমাদের বিয়ে বার্ষিকী। শুনে আমি শান্ত হলাম।

আমাদের বিবাহকাল ছিল ৩৪ বছর কয়েক মাস। ৩৪ বছরকে যদি অর্ধেক করি তাহলে দাঁড়ায় ১৭ বছর। কারণ রাতটা বাসায় থাকতে, দিনে থাকতে অফিসে। আর তোমার অফিস তো কখনও ৮ ঘণ্টার হিসাবে বাঁধা ছিল না; ছিল না কোনো ছুটির দিন। এবার ১৭ কে যদি অর্ধেক করি তাহলে দাঁড়ায় সাড়ে ৮ বছর। তুমি হয়ত আমার সাথে সাড়ে ৮ বছর ছিলে। কারণ এর মধ্যে তোমার ছিল ফিল্ড ওয়ার্ক, ছিল বিদেশে যাওয়া। সব মিলিয়ে সাড়ে ৮ বছর আমরা একসাথে ছিলাম। এটা কি খুব বেশি সময়? কেন এত তাড়াতাড়ি চলে গেলে? আরও না হয় কিছুকাল থাকতে আমার সাথে, আমাদের সাথে। এত কি তাড়াহুড়োর দরকার ছিল, বল?

আজ সবাইকে খুব জানাতে ইচ্ছা করছে কিভাবে তোমার প্রতি অনুরক্ত হয়েছিলাম আমি। তুমি সুদর্শন ছিলে, স্মার্ট ছিলে তা বলছি না। তোমার বাইরের সৌন্দর্য তোমার প্রতি আকর্ষণের একটা বড় কারণ ছিল বটে, কিন্তু তার চেয়ে বেশি ছিল তোমার ভেতরকার সৌন্দর্য। প্রথমে মোহিত হয়েছিলাম তোমার গলার আওয়াজ শুনে, তারপর তোমার কথা বলার আর্ট দেখে। সর্বোপরি তুমি ছিলে সংস্কৃতিমনা। তুমি কবিতা আবৃত্তি করতে, নাটক করতে, ভলিবল খেলতে। তোমার প্রতিভা ছিল বিচিত্র, আন-প্যারালালড। এসব কিছুই ছিল তোমার প্রতি আমার অনুরক্ত হওয়ার মূল কারণ। আজ এ বয়সে এসে খুব মনে পড়ছে অতটুকু বয়সে আমি এসব বুঝেছিলাম কি করে?

আরও মজার কিছু বিষয় ছিল আমাদের। ভালোলাগার অভিব্যক্তিও ছিল অন্য সকলের চেয়ে আলাদা। তুমি কবিতা লিখতে, কবিতা লিখেই আমাকে পড়তে দিতে। আমি পড়েই কি করে বুঝতাম যে তুমি কবিতাটি আমাকে নিবেদন করেছো। তাই বলতেই হয় একটু বোধ হয় বেশিই পাকা ছিলাম। এবং কবিতাই আমাদের সম্পর্ক তৈরিতে মূল ভূমিকা নিয়েছিল।

তার মধ্যে দুটি কবিতার কথা না উল্লেখ করলেই নয়। একটি হচ্ছে 'মিতালীর অন্বেষায়'। অন্যটি 'কাচ দেয়াল'। মিতালীর অন্বেষায় কবিতার দুটি লাইন তুলে না ধরে পারছি না।
'কি এক দুর্বোধ্য সেতুবন্ধে
বেঁধেছ আমায়!
বুকেও টানো না উষ্ণ আলিঙ্গনে,
সরিয়েও দাওনা দূরে
ঘৃণাভরে। '

'কাচ দেয়াল' এও তাই।
'এ পাশে আমি
ও পাশে তুমি
মাঝখানে স্বচ্ছ কাচের দেয়াল
এ পাশ থেকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি
তোমার পূর্ণাবয়ব নির্বাক দৃষ্টি,
বসন্ত রঙ্গিন কপোল উদ্ধত যৌবন সব--সব।
নিশ্চিত করে বলতে পারি
তুমিও দেখছো আমাকে অথচ:
মাঝখানে স্বচ্ছ কাচের দেয়াল। '

তাই বলছি তোমার কবিতা আমাকে নিশ্চিত করে বুঝতে শিখিয়েছে আমার প্রতি তোমার অনুরাগ। তারপর কোন দুর্বল মুহূর্তে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলাম, আমরা থাকবো একসাথে। তাই সকল ঝড়-ঝাপটা আর রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে আমরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলাম। এখানে বলে নেওয়া ভালো, আমরা ছিলাম দুজন দুই সম্প্রদায়ের। আমাদের বিয়ে হয়েছিল দুইবার। একবার আমার স্বামীর ধর্মমতে, দ্বিতীয়বার আমার ধর্মমতে। আমাদের তাতে কোনও অসুবিধে ছিল না। আমরা দুজন একপর্যায়ে হেসে বলেছিলাম, আরো যদি কোনো মত থাকে তাহলে সেটাও আপনারা ব্যবহার করতে পারেন।

আজ এ বিষয়ে আমার সকলের কাছে একটা প্রশ্ন: বিয়ে কি মানুষ ধর্মকে করে? না একজন নারী বিয়ে করে একজন পুরুষকে এবং উল্টো দিকে একজন পুরুষ বিয়ে করে একজন নারীকে। ধর্ম তো শুধুই একটা বিশ্বাস। যে বিশ্বাস আমরা আমাদের মনের গভীরে ধারণ করি।

মনের গভীরে যে বিশ্বাস আমি লালন করছি জন্মাবার পর থেকে, তা কি উপড়ে ফেলা যায়? সেতো একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। ব্যক্তিগত ভালোলাগার অনুভূতি, ব্যক্তিগতভাবে নিজেকে সৃষ্টিকর্তার কাছে উৎসর্গ করা।

যাক এখন আসল কথায় আসি। প্রসঙ্গ ছিল আমাদের বিবাহবার্ষিকী। তুমি চলে যাওয়ার পর এই প্রথম বিয়ে বার্ষিকীকে স্মরণ করছি এভাবে। যে কাজটা তুমি করতে এতদিন। আর এবার বেদনার সাথে আমি স্মরণ করলাম এভাবে। তোমরাই কবিতার দুটি লাইন দিয়ে তোমাকেই প্রণতি জানালাম।
এ পাশে আামি
ও পাশে তুমি
মাঝখানে স্বচ্ছ কাচের দেয়াল।

আসলেই তাই, আমি তোমাকে দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু ছুঁতে পারছি না। এটাই আমার যন্ত্রণা। অনেক অনেক ভালো থেকো।
তোমার মিতু।

[আমার স্বামী অচিন্ত্য দাশ গুপ্ত, ডেভেলপমেন্ট সাপোর্ট লিংক এর প্রতিষ্ঠাতা প্রধান, ৪ এপ্রিল, ২০১৬তে প্রয়াত হয়েছেন। ]

 


মন্তব্য