kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


হারিয়ে ফেলা জীবনব্যবস্থা

মাহবুব মোর্শেদ   

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ১৭:৩৩



হারিয়ে ফেলা জীবনব্যবস্থা

কলিগদের মধ্যে সঙ্গে আড্ডা হচ্ছে। একজনের বাড়ি টাঙ্গাইল।

ঈদের ছুটি বাড়িতে কাটিয়ে ফিরেছেন। কথা বলছিলেন গ্রামের চাষবাস নিয়ে।

কিছু জমিতে এবার আখের চাষ করছে তার পরিবার। টাঙ্গাইলে চিনিকল নেই। আশপাশের জেলাগুলোতেও নেই। কিন্তু আখচাষ বেশ হয়। জিজ্ঞেস করলাম, আখ দিয়ে কী করেন তারা?

উনি বললেন, আখ মূলত খাবার জন্যই চাষ করা হয়। মিষ্টি আখ কিনে খায় লোকে। বাজারে মিষ্টি আখের বেশ চাহিদা। শুধু আখ বিক্রি করেই চাষের খরচ উঠে আসে। জিজ্ঞেস করলাম, গুড় হয় কি না। জানালেন, গুড় কম হয়। এখন গুড় বানানোর চল প্রায় উঠেই গেছে।

আলাপে আলাপে উঠে এলো পুরনো সময়ের কথা। ছোটবেলায় গ্রামের হাটে দেখতাম, চিনি তেমন পাওয়া যেত না। খাবারে মিষ্টির চাহিদা মিটতো গুড় থেকে। নানারকম গুড় পাওয়া যেত, ঝোলা গুড়, বাহারি আকারের ছোট ছোট পাটালি, বেশি দরকারে বড় পাটালি। আখের গুড়ের সাথে থাকতো খেজুর গুড়। সেসব খুব জনপ্রিয় ছিল। গরুর খাবারের জন্য নালি গুড় অহরহ মিলতো।

চা বানাতে গুড়ই ব্যবহৃত হতো। পরে চিনির ব্যবহার শুরু হলো। চিনিকল যেসব এলাকায় আছে সেখানে আখ দিয়ে গুড় তৈরি করার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হতো। বাধ্যতামূলকভাবে চিনি কলে আখ বিক্রি করতে হতো। এমনকি আখ জ্বাল দিয়ে গুড় বানানো বন্ধ করতে থানাপুলিশ পর্যন্ত করা হতো। পরে তো চিনি কলগুলোও বন্ধ হলো একে একে। অথবা উৎপাদন কমে যেতে থাকলো। একসময় দেখা গেল, বাইরে থেকে আমদানী করা শাদা চিনিতে বাজার সয়লাব। মাঝখান থেকে বাজারের গুড় সব উধাও। গুড়ের জন্য আখ চাষ, গুড় বানানোর জন্য কারখানা, বাজারের বাহারি গুড় সব শেষ। শেষ করার আগে আমরা ভাবলামও না, রাসায়নিক মিশ্রিত ক্ষতিকর চিনির চেয়ে গুড় কতটা স্বাস্থ্যকর ছিল।
একজন কলিগ বললেন, গুড় শুধু কেন আগে গ্রামীণ জীবনের একেকটা বাড়ি ছিল একেকটা জীবনব্যবস্থার মতো। গ্রামের লোকদের বাজারে গিয়ে নিয়মিত কিনতে হতো শুধু লবণ আর কেরোসিন। বিদ্যুৎ ছিল না, হারিকেন জ্বালাবার জন্য দরকার কেরোসিন। তরকারিতে খাবার জন্য লবণ। রান্নাবান্নার কাঠ আশপাশের জঙ্গল থেকেই জোগাড় হতো। গৃহস্থালীতে কাঠের জন্য কিছু গাছ লাগানো হতো। সময়ে সেগুলো কেটে, শুকিয়ে, সংরক্ষণ করে কাঠের চাহিদা পূরণ করা হতো। গৃহস্থ বাড়িতে কাঠের গাছের পাশাপাশি ওষধি নিমগাছ লাগানো হতো, থাকতো আম কাঁঠাল জাম কামরাঙ্গা বরই লিচু লটকন সহ নানা মৌসুমি ফলের গাছ। সারা বছরের ফলের চাহিদা মিটতো সেগুলো থেকে। বাড়ির কোথাও ছোট মাচায় হয়তো লতিয়ে উঠেছে সিম, শসা বা করলার গাছ। কোথাও আপনাআপনি বেড়ে উঠছে ওলের ঝোপ , শাক সবজি। একটু যারা করতেন তাদের উঠানেই হতো লালশাক, ঢেড়শ, ডাটা শাক সহ হরেক রকম শাকসবজি। একটু সৌখিন লোকেরা দারচিনি গাছও লাগাতেন। রান্না ঘর বা গোয়াল ঘরের খড় বা শনের চালে তো দুচারটা লাউ বা কুমড়ার গাছ লতিয়ে উঠবেই। যাদের জমিজিরাত ভাল তাদের গোয়াল থাকবে, একটা রাখাল থাকবে। চাষের জন্য বলদ আর দুধের জন্য গাই। চার-পাঁচটা গরু, ছাগল, ভেড়া সহ গোয়াল প্রায় বাড়িতেই থাকতো। জমিজিরাত থাক বা না থাক, বাড়িতে মুরগির খোয়াড় থাকবে না সেটা হতেই পারে না। ছোট একটা পুকুর থাকবে। তাতে অল্প-বেশি মাছ। বাড়ির হাঁসগুলো দিনভর খেলে বেড়াবে সে পুকুরে। প্রতিদিন খাবার মতো চারপাঁচটা ডিম আসবেই। যাদের বাড়িতে কবুতর একবার ঢুকেছে তাদের তো কথাই নেই। ঘরের ছাউনিতেই কবুতরের খোপ লাগানো হতো। বাড়িতে সারাদিন বাকবাকুম। এসব বাড়িতে দুএকটা কুকুর, বিড়াল তো থাকবেই।
বাড়ির মধ্যেই যে গাছগাছালি, মুরগি, গরুর কথা হচ্ছে সেগুলো হতো প্রায় বিনা উদ্যোগেই। বাড়ির ছেলেমেয়েরা একটু খেয়াল করলেই হতো। পুরনো সদস্যরা বীজ রাখতেন শিকেয় তুলে। গৃহিনীরা সময় করে সেগুলো মাটিতে লাগাতেন। ছেলেমেয়েরা একটু যত্ন নিতো। ব্যস হয়ে যেত।
চষাজমিতে যা ধান, গম হতো তা দিয়ে বছরের খরচ তো মিটতোই, ঘরের চাল-আটাও তাতেই হতো। বাড়ির খরচ চালানোর জন্য পাট আছে, আখ আছে। ডাল আছে। সরিষা আছে। সরিষা ঘানিতে নিয়ে গেলে তেল আসতো। পরে তো যন্ত্রের ঘানি এলো। যব, তিল, তিসিও চাষ হতো। পেঁয়াজ, রসুন তো বাড়ির উঠানেও হতো। এরকম জীবনব্যবস্থা আমরা নিজের চোখে দেখেছি।

বাড়ির উঠান বা চাষের খেতের কথা বাদ দিলে গ্রামের পথঘাট, জলাজঙ্গল, আর চাষের খেতের আলে যে প্রাকৃতিকভাবে যত শাকসবজি হতো সেসব দিয়েও অনেক জীবন চলে যেত। আপনাআপনি জন্মানো অনেক শাকসবজি তো রীতিমতো জনপ্রিয় ছিল। সবই হারিয়ে গেছে বা যেতে বসেছে।

আমাদের চোখের সামনেই গ্রামে একসময় বিদ্যুৎ এলো। পাকাঘর উঠতে থাকলো। টিনের চালের বাড়বাড়ন্ত শুরু হলো। খামারে মুরগির চাষ শুরু হলো। ট্রাক্টর এলো। বলদের সঙ্গে উঠে যেতে থাকলো গরুও। এখন তো ইন্টারনেটও এসে গেছে গ্রামে।
এখন গ্রামগুলোতে গেলে দেখতে পাই, সেই পুরনো জীবনব্যবস্থা পুরোটাই ধসে গেছে। কলিগরা সবাই একমত। গ্রামে গিয়ে যখন ফার্মের মুরগি, হাইব্রিড মাছ কিনতে হয় তখন তো বোঝাই যায় কী হচ্ছে। খুব কম বাড়িতেই, আগের মতো ওরকম শত রকম গাছপালা বা প্রাণীদের অস্তিত্ব আছে।

গ্রামের উন্নতি হবে না তা কেউ বলছে না। কিন্তু উন্নতি হলেই, ভাল মুরগির চাষ বাদ দিয়ে ফার্মের ক্ষতিকর মুরগি খাওয়া শুরু করতে হবে? গ্রামগুলোতে গেলে আর গ্রাম পাওয়া যায় না। গ্রামের মানুষগুলো হয়তো আছে। আত্মীয়-পরিজন আছে, মূল্যবোধ আছে। কিন্তু গ্রাম যে কারণে গ্রাম সেগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। পাকাবাড়ি, টিনের চাল, বিদ্যুৎ আর শহুরে অভ্যাসগুলো গ্রামের মৌলিক জীবনব্যবস্থাকে নিঃশেষ করে দিয়েছে। বেশি নয়, মোটামুটি ২৫ বছরের মধ্যে ঐতিহ্যবাহী গ্রামের বাড়িগুলো সব ঐতিহ্য ও চর্চা বিসর্জন দিয়ে বসে আছে। এর পেছনে হয়তো মেকি অভ্যাস রপ্ত করানোর চেষ্টা আছে, হাইব্রিড জাতের প্রতি আকৃষ্ট করার প্রচারণা আছে, বেশি উৎপাদনের লোভ আছে, বীজ সংরক্ষণ না করানোর ষড়যন্ত্র আছে কিন্তু আমাদের অভ্যাস বদলের ইতিহাসটাও তো আছে। কেউ তো আর বলেনি তোমরা বাড়ির গাছাগাছালি চাষ বন্ধ করে নীল চাষ করো নইলে গর্দান নেব। অনেক ভাল চর্চা আমরা নিজেরাই বাদ দিয়েছি। শহরগুলোকে আমরা শহর করে গড়ে তুলতে পারিনি। কারণ, শহর জিনিশটা আমরা এখনও রপ্ত করতে পারিনি। গ্রাম জিনিশটা আমরা আমাদের মতো করে রাখতে পারিনি। কারণ আমরা গ্রাম বাদ দিয়ে শহরটাই বেশি করে রপ্ত করতে চেয়েছি। তাই আমাদের শহরও ঠিকমতো হয়নি, গ্রামও অযত্নে হারিয়ে যেতে বসেছে।

 মাহবুব মোর্শেদ : অনলাইন ইনচার্জ, কালের কণ্ঠ।
https://www.facebook.com/mahbubmorshed


মন্তব্য