kalerkantho


দুধে বিষাক্ত পেস্টিসাইড, অ্যান্টিবায়োটিক ও টক্সিনের উপস্থিতি এবং আমাদের করণীয়

আব্দুল কাইউম, এফ এম শফিউল আজম, জাকারিয়া চৌধুরী অনিক ও এম হাফিজুর রহমান সানি

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



দুধকে একমাত্র সম্পূর্ণ খাদ্য হিসেবে বিশ্বব্যাপী বিবেচনা করা হয়। দুধে ন্যাচারাল প্রোটিন, চর্বি, কার্বোহাইড্রেট, সব সুপরিচিত ভিটামিন এবং বিভিন্ন খনিজ পদার্থের সুষম মিশ্রণ থাকে, যা একজন মানুষের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য অপরিহার্য। ২০১৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে দৈনিক দুধের উৎপাদন প্রায় ১৮ মিলিয়ন লিটারে দাঁড়িয়েছে। তদুপরি প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় আমাদের দেশে দুধের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কম। যেখানে ভারত ও পাকিস্তানের মাথাপিছু দুধের ব্যবহার বছরে যথাক্রমে ৯০ থেকে ১৯০ কেজি পর্যন্ত, সেখানে বাংলাদেশে এটি মাত্র ১৮ কেজি। বাংলাদেশে শিশু ও কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় দুধের চাহিদা মেটাতে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ গুঁড়া ও তরল দুধ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।

বাংলাদেশে উৎপাদিত দুধের বেশির ভাগ আসে গাভির দুধ থেকে। কিন্তু গত ১০ ফেব্রুয়ারি ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরির (এনএফএসএল) এক গবেষণা প্রতিবেদনে গাভির দুধে (প্রক্রিয়াজাতকরণ ছাড়া) সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি কীটনাশক, নানা ধরনের অ্যান্টিবায়োটিকের উপাদান, বিভিন্ন অণুজীব ও হেভিমেটালের উপস্থিতি পাওয়ার খবর বাংলাদেশের সব প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়। যা বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের মধ্যে ভীতি সঞ্চারের পাশাপাশি এসব দুধ খাবারের জন্য নিরাপদ কি না তা জানার আগ্রহ সৃষ্টি করে। এরই মধ্যে বাংলাদেশের মহামান্য হাইকোর্ট স্বপ্রণোদিত হয়ে দুধ ও দইয়ে অ্যান্টিবায়োটিক, অণুজীব, কীটনাশক ও সিসা ছাড়াও মানবদেহের জন্য অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদান আছে কি না, তা নিশ্চিত হয়ে আগামী তিন মাসের মধ্যে রিপোর্ট প্রদানের জন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন।

উল্লেখ্য, এনএফএসএলের গবেষণা প্রতিবেদন দুধে ‘এনডোসালফান’ নামের মানবদেহের জন্য অত্যন্ত বিষাক্ত কীটনাশকের উপস্থিতি নিশ্চিত করে। যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের একদল গবেষক তাঁদের গবেষণা প্রতিবেদনে ২০১২ সালের ৩১ মে থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় দিনাজপুর জেলায় লিচু খেয়ে অসুস্থ হয়ে ১৩ জন শিশু মৃত্যুর জন্য বিশ্বের বেশির ভাগ দেশে নিষিদ্ধ এই বিষাক্ত এনডোসালফানের ব্যবহারকে দায়ী করেছিল। মারাত্মক ক্ষতিকর এই কীটনাশক অন্যান্য কীটনাশকের মতো পানির সঙ্গে সহজে মিশে যায় না। ফলে এটি পরিবেশে দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকতে পারে, এমনকি এটি বছরের পর বছর মাটিতে তার বিষক্রিয়া অক্ষুণ্ন রাখতে পারে। পরবর্তী সময়ে এনডোসালফান পানির স্রোতের সাহায্যে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে স্থানান্তরিত হলেও তার বিষক্রিয়া অপরিবর্তিত থাকে। শস্যক্ষেতে প্রয়োগের সময় এনডোসালফান বাতাসে ভেসে ভেসে অনেক দূরের নতুন পরিবেশকেও বিষাক্ত করে ফেলতে পারে, এমনকি বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন প্রতিবেদনে এনডোসালফান প্রয়োগের স্থান থেকে ১২১ মাইল দূরেও এর অবশিষ্টাংশের উপস্থিতি খুঁজে পেয়েছেন। বর্তমানে বাংলাদেশে এনডোসালফানের ব্যবহার নিষিদ্ধ হলেও বিভিন্ন শস্য ও খাদ্যদ্রব্যের উপস্থিতি বিদ্যমান রয়েছে, যার সর্বশেষ উপস্থিতি পাওয়া যায় গাভির দুধে।          

           

এমন পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয়

উপরোক্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দুধে এনডোসালফানের উপস্থিতি জনমনে শঙ্কার সৃষ্টি করছে কিন্তু মানুষের জন্য দুধ একমাত্র সম্পূরক খাদ্য হওয়ায় এটিকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বিশেষ করে ছোট শিশুদের জন্য দুধ অপরিহার্য খাবার। তাই বিজ্ঞানীরা এরই মধ্যে এনডোসালফানযুক্ত দুধকে বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত করে এর ক্ষতির মাত্রা কমাতে সক্ষম হয়েছেন। ভারতীয় বিজ্ঞানী অনির্বাণ গুহা এবং ড. সুরেশ বাবুর নেতৃত্বাধীন দুটি গবেষণা দল তাদের গবেষণা প্রতিবেদনে প্রকাশ করে যে এনডোসালফানযুক্ত দুধকে পাস্তুরিত করে (৬৫-৭৫ ডিগ্রি তাপমাত্রায় ১৫ থেকে ৩০ মিনিট গরম করে দ্রুত ঠাণ্ডা করা) ৫০ থেকে ৯৫ শতাংশ এনডোসালফানের অবশিষ্টাংশকে দুধ থেকে দূরীভূত বা অকার্যকর করা যায়, যা মানুষের জন্য দুধে এনডোসালফান নিরাপদ মাত্রা ০.১ শতাংশের (ইউরোপীয় নীতিমালা অনুযায়ী) চেয়ে অনেক কম। সুতরাং সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করে এনডোসালফানযুক্ত দুধকেও আমরা নিরাপদে পান করতে পারি, যদিও বিজ্ঞানীরা এ ব্যবস্থাকে আপৎকালীন ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছেন। দুধ মানবদেহের সুস্থতা ও পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য অপরিহার্য। তাই এনডোসালফানের বিষক্রিয়াকে সম্পূর্ণরূপে দূর করার আগ পর্যন্ত সহজে পাস্তুরিত পদ্ধতিতে নিরাপদ করে পান করা যায়। এ ছাড়া এনএফএসএলের রিপোর্টে দুধে অতিরিক্ত মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি পাওয়া যায়, যা খুব সহজেই ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ অকার্যকর করে দেওয়া সম্ভব শুধু ৩০ থেকে ৫০ মিনিট ফোটালে অথবা মাইক্রোওয়েভ ওভেনে মাত্র ২০ মিনিটে। একই রিপোর্টে আফলাটক্সিনের উপস্থিতি সহনীয় মাত্রার দ্বিগুণ পাওয়া যায়। যদিও এই টক্সিন পাস্তুরিত করলে বা ফোটালে নষ্ট হয় না কিন্তু আমাদের দৈনিক খাবারের তালিকায় ফুলকপি, ব্রকলি, বাঁধাকপি, হলুদ বা রসুন যথেষ্ট পরিমাণে থাকলে এর ক্ষতির পরিমাণ সহনীয় মাত্রায় রাখা সম্ভব। এ সবজিগুলো টক্সিনের কার্যকারিতা নষ্ট করে ফেলতে সক্ষম। এগুলো সাময়িক সমাধান হলেও এ পরিস্থিতি থেকে দেশের দুগ্ধশিল্পকে রক্ষার জন্য এবং দেশের মানুষের নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সচেতনতা প্রয়োজন।

 

লেখকবৃন্দ : কৃষি রসায়ন বিভাগ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়; বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ এবং ইনস্টিটিউট অব ফুড সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, চায়নিজ একাডেমি অব অ্যাগ্রিকালচারাল সায়েন্স-এর শিক্ষক



মন্তব্য