kalerkantho


এক অবিস্মরণীয় দিন মাঘী পূর্ণিমা

শতদল বড়ুয়া

১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



আজ শুভ মাঘী পূর্ণিমা। আজকের মঙ্গলময় পুণ্য তিথিতে মহামানব বুদ্ধ নিজের আয়ু সংস্কার পরিত্যাগ করেছিলেন। বুদ্ধের প্রধান সেবক আনন্দকে বুদ্ধ বললেন, ‘আনন্দ—এ বৈশালী অত্যন্ত মনোরম স্থান।’ এখানকার উদ্যান চৈত্য, গৌতম চৈত্য, বহু পুত্রক চৈত্য বড়ই মনোরম ও মনোমুগ্ধকর স্থান। প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলি যেমন চমৎকার, তেমনি প্রকৃতি প্রদত্ত সম্পদেও এসব এলাকা ভরপুর। বুদ্ধ আবার বললেন, ‘আনন্দ—তথাগত ইচ্ছা করলে কল্পকাল স্বকীয় ঋদ্ধিবলে বর্তমান দেহ অবস্থান করতে পারেন।’ হে আনন্দ, তথাগতের চারি ঋদ্ধি পাদ ভাবিত, বহুলীকৃত রথগতি সদৃশ অনর্গল অভ্যস্ত, বাস্তুভূমি সদৃশ, সুপ্রতিষ্ঠিত, পরিচিত, সম্যকভাবে আপনার করায়ত্ত। আনন্দ, সে জন্য তথাগত ইচ্ছা করলে কল্পকাল কিংবা কল্পের অবশিষ্ট সময় অবস্থান করতে পারেন।

তথাগত বুদ্ধ কী বোঝাতে চাইলেন, আনন্দ তা অনুধাবন করতে পারল না মারের দ্বারা প্রলুব্ধ হওয়ায়। কিন্তু মার বিরামহীনভাবে বুদ্ধকে শুধু একটি কথাই বারবার বলেছেন, “হে সুগত, আপনি পরিনির্বাণপ্রাপ্ত হোন, আপনার পরিনির্বাণপ্রাপ্ত হওয়ার এখনই সঠিক সময়। ভগবান মারকে বললেন, ‘হে পাপী মার যত দিন আমার ভিক্ষুসংঘ ত্রিপিটকের বাণীগুলো সুন্দররূপে ব্যাখ্যা করতে পারবেন না তত দিন পর্যন্ত তথাগত নির্বাণ লাভ করতে পারেন না।’ মার বলল, ‘ভন্তে ভগবান, আপনার ভিক্ষুসংঘ এখন ধর্ম প্রচারে সিদ্ধহস্ত এবং নিপুণ। সুতরাং ভন্তে ভগবান আপনি নির্বিঘ্নে নির্বাণ লাভ করতে পারেন।”

পাপমতি মারকে ভগবান বললেন, ‘হে পাপিষ্ঠা দুরাচার মার তাহলে শোন, অচিরেই তথাগত পরিনির্বাণপ্রাপ্ত হবেন। এখানে উল্লেখ্য যে তথাগত ভগবান বুদ্ধ তখনকার সময়ে যখন ৮০ বছর বয়সে পদার্পণ করেন তখন রাজগৃহের বেলুরবনে ৪৫ বর্ষা অর্থাৎ অন্তিম বর্ষা অধিষ্ঠান করেছিলেন। তিনি বর্ষাব্রতকালীন কঠিন রোগে আক্রান্ত হন। একমাত্র প্রবল ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগে সাধনা দ্বারা রোগমুক্ত হয়েছিলেন। যাকে ছন্দ, বীর্য, চিত্ত মীমাংসা বলা হয়।’

ভগবান চাপাল চৈত্যে সেই সময়ে আজকের মাঘী পূর্ণিমা তিথিতে স্মৃতিমান ও সচেতন অবস্থায় স্বীয় আয়ু সংস্কার পরিত্যাগ করার সঙ্গে সঙ্গে এই বলে ঘোষণা দিলেন যে এখন থেকে তিন মাস পরে বৈশাখী পূর্ণিমা পর্যন্ত আমার প্রাণবায়ু চলতে থাকুক, সজীব থাকুক, সচেতন থাকুক, অতঃপর নিরুদ্ধ হয়ে যাক। বুদ্ধ এ সংকল্প গ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গে প্রবলভাবে ভূকম্পন শুরু  হয়। মুহুর্মুহু প্রলয়দেব গর্জন করতে থাকে।

এ ভূকম্পনে আনন্দ বেশ ভয় পেয়ে গেলেন। এর হেতু কী জানতে আনন্দ দ্রুতগতিতে বুদ্ধের কাছে ছুটে যান এবং ভূকম্পনের কারণ জানতে চান। বুদ্ধ আনন্দকে বললেন, ‘শোন আনন্দ, বোধিসত্ত্ব যখন মাতৃজঠর থেকে ভূমিষ্ঠ হন তখন তাঁর পুণ্যতেজে ভূকম্পন হয়, যখন বোধিসত্ত্ব সম্বোধি জ্ঞান লাভ করেন তাঁর তেজে ভূকম্পন হয়, বুদ্ধের প্রবর্তনকালে একবিংশ ভূমির প্রাণীগণের সাধুবাদ ধ্বনিতে ভূকম্পন হয়, আর যখন তথাগত আয়ু সংস্কার পরিত্যাগ করেন তখন পৃথিবী কারুণ্যে কম্পিত হয়। তিনি যখন নির্বাণ লাভ করেন তখন পৃথিবী রোধন ধ্বনিতে কম্পিত হয়ে থাকে।’

আজ দিনের কার্যসূচি শুরু হয়েছে ভোররাতে বিশ্বশান্তি কামনায় বিশেষ সূত্রপাঠের মাধ্যমে প্রতিটি বিহার থেকে। আজ মাঘী পূর্ণিমা তিথি এমন সময়ে পালিত হচ্ছে যখন বাংলাদেশসহ বিশ্ব এক মহাসংকটময় কাল অতিক্রম করছে। তবে বাংলাদেশের জনগণ সুখে দিনযাপনে অন্যান্য দেশের জনগণের চেয়ে অধিক গুণ এগিয়ে আছে। বৌদ্ধ সম্প্রদায় আজ সারা দিন ধর্মীয় আবেশে পুলকিত থাকবে। ধর্মীয় কার্যাদি এবং বুদ্ধপূজা উৎসর্গের পর বিকেলে প্রতিটি বিহারে ধর্মীয় আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হবে। আজকের দিনের তাৎপর্য তুলে ধরে প্রাজ্ঞ ভিক্ষুসংঘসহ দায়ক-দায়িকারা অংশগ্রহণ করবেন। সন্ধ্যা তথা রাতে সম্মিলিত ধর্মীয় প্রার্থনার পর দিনের কার্যসূচির পরিসমাপ্তি ঘটবে।

আজ শুভ মাঘী পূর্ণিমা তিথিতে সেই অতীতকালের কথাই স্মরণে আসছে। বুদ্ধ কালোগত হওয়ার আগে বুদ্ধের সঙ্গে মারের যেই কথা হয়েছিল, সেগুলো বুদ্ধ আনন্দের কাছে ইঙ্গিতে ব্যক্ত করা সত্ত্বেও আনন্দ বুঝতে পারেনি। এ ঘটনাবলিতে আমাদের জন্য শেখার  অনেক কিছু আছে। বুদ্ধ কিন্তু আমাদের জন্য সুনির্দিষ্ট পথ সৃষ্টি করে দিয়েছেন। নিজের কর্মগুণেই সৎপথ পাওয়া যাবে। এতে কারো সাহায্য-সহযোগিতার প্রয়োজন হবে না। নিজের জ্ঞানবলে এবং মানবকল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রাখতে পারলে দুঃখ নামক জীবনটা অপসারিত হয়ে সুখপাখি হাতের কবজায় চলে আসবে আপনাআপনি।

বুদ্ধ নির্দেশিত সব বাণী মানবের জন্য খুবই মঙ্গলদায়ক। তাই বলছিলাম, জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে যে যার ধর্ম পালনে নিবিষ্ট হতে পারলে দেশ অচিরেই সমৃদ্ধি লাভ করবে। আজকের শুভ মাঘী পূর্ণিমা তিথিতে সবাইকে জানাই লাল গোলাপ শুভেচ্ছা। জগতের সব প্রাণী সুখী হোক।

লেখক : সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক



মন্তব্য