kalerkantho


বাঙালির গৌরবোজ্জ্বল অর্জন

ড. মুহম্মদ মনিরুল হক

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



বাঙালির গৌরবোজ্জ্বল অর্জন

নির্দিষ্ট কোনো দেশ বা অঞ্চলের অধিবাসীদের বা কোনো জাতি বা সম্প্রদায়ের মনের ভাব প্রকাশ করতে ব্যবহৃত শব্দাবলি ও তার প্রয়োগ-কৌশল হলো ভাষা। একটি আধুনিক ও স্বয়ং সম্পূর্ণ ভাষা হিসেবে বাংলার রয়েছে নিজস্ব ভাব প্রকাশের রীতি ও ইতিহাস। বাঙালির শোণিত চিত্তে, স্বপ্নের ধ্বনিতে, উৎসাহ-উৎসবে এবং মুক্তির স্লোগানে মাতৃভাষা শান্তি-সম্প্রীতির সুবাতাস ছড়িয়েছে যুগযুগান্তরে। ভাষা চেতনায় আবিষ্ট থেকে বাংলার দামাল ছেলেরা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন শত্রুর বিরুদ্ধে। বাংলা ভাষায় রচিত গল্প-উপন্যাস, গদ্য-পদ্য, গবেষণা-প্রবন্ধ অর্জন করেছে বিশ্বস্বীকৃতি। বাঙালি জাতিসত্তার মতো অমর, তৎপর, অবিনশ্বর বাংলা ভাষা মানেনি কোনো শৃঙ্খল—সহ্য করেনি বর্বরতা। ভাষার ওপর আঘাত-প্রতিঘাতে বাংলা ভাষায়ই প্রতিরোধের বার্তা ছড়িয়েছেন এ দেশের কবি-লেখক। সংগ্রামী আর প্রতিবাদী ভাষা হিসেবে বাংলা যেমন কথা বলেছে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে, তেমনি প্রার্থনাও করেছে শান্তি ও ধর্মীয় ধ্যানমগ্নে।

যে মাতৃভাষার চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়ে বাঙালির সোনার ছেলেরা ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি রক্ত দিয়েছিলেন, সেই রাষ্ট্রভাষা বাংলা তার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও যোগ্যতায় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছে। ২০১০ সাল থেকে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশে বাঙালির ‘শহীদ দিবস’ ২১শে ফেব্রুয়ারি পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে ভাষাশহীদ সালাম, জব্বার, রফিক, শফিউল, বরকতসহ সব ভাষাসৈনিকের নামও শ্রদ্ধাচিত্তে আলোচিত হচ্ছে বিভিন্ন রাষ্ট্রে। ২১শে ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সামনে রেখে বিশ্বের ৪৯টি ভাষায় বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত প্রকাশ করেছে বেলারুশের একটি প্রকাশনী সংস্থা। এর আগে ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’র ৩৩ খণ্ড চীনা ভাষায় প্রকাশিত হয়েছিল। লালনের গান-দর্শন অনুবাদ হয়েছে ইংরেজি ও জাপানি ভাষায়। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত বাংলা ভাষার কাব্যগ্রন্থ ‘গীতাঞ্জলি’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯১০ সালে। ‘গীতাঞ্জলি’ ও সমসাময়িক কয়েকটি কাব্যগ্রন্থের কবিতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের অনুবাদে ‘Song Offering’ কাব্যগ্রন্থটি ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়েছিল ১৯১২ সালে। প্রথম বাঙালি হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছিলেন।

বাংলা ভাষায় রচিত আমাদের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা...’ পৃথিবীর মধুরতম সংগীতের একটি। অতি সম্প্রতি ইউনেসকোর জরিপে পৃথিবীর মধুরতম ভাষার স্বীকৃতি পেয়েছে বাংলা। বাংলা ভাষায় প্রদত্ত বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ইউনেসকোর ঐতিহাসিক দলিলে। ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের অধিবেশনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাংলায় দেওয়া ভাষণও বিশ্বদরবারে বাংলাকে প্রসারিত করেছে। একটু দেরিতে হলেও প্রযুক্তির ভাষা হিসেবেও এগিয়ে যাচ্ছে বাংলা।

বর্তমানে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায়ও বাংলা ভাষার ব্যবহার ও গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। বিশ্বের ৩০টি দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে বাংলা বিভাগ। প্রতিবছর বিশ্বের হাজার হাজার অবাঙালি বাংলা ভাষা শিক্ষা, গবেষণা ও সাহিত্য নিয়ে কাজ করছেন। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, লালন, চর্যাপদ ও মধ্যযুগের সাহিত্য নিয়ে গবেষণা হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। বাংলাভাষী মানুষ বিভিন্ন দেশের জাতীয় সংসদ সদস্যসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

২০১৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল সংসদ বাংলা ভাষাকে স্বীকৃতি দিয়ে ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস জাতীয়ভাবে পালনের বিল পাস করেছে। এর আগে ২০১৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার ক্যানাবেরা অঙ্গরাজ্যের সংসদে ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। ইউরোপ-আফ্রিকাসহ জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে কাজ করছেন বাংলাদেশের সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। বাংলা ভাষাকে সে দেশের দ্বিতীয় ভাষার মর্যাদা দিয়েছে সিয়েরা লিওন। ভারতেরও দ্বিতীয় জনপ্রিয় ভাষা বাংলা। বাংলা ভাষায় বিভিন্ন অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হয় বিশ্বের ১০টি দেশের বেতারে। বাংলা ভাষার বেতার সম্প্রচার কেন্দ্র আছে ভারতসহ ছয়টি দেশে। বাংলা ভাষায় টেলিভিশন সম্প্রচার কেন্দ্রও আছে ভারতসহ কয়েকটি রাষ্ট্রে। বাংলা ভাষায় সংবাদপত্র প্রকাশিত হয় আমেরিকা, কানাডাসহ, ইউরোপের আটটি এবং মধ্যপ্রাচ্যের ছয়টি দেশ থেকে।

পৃথিবীর উন্নত ভাষাগুলোর মধ্যে একটি বিজ্ঞানসম্মত সজীব, জীবন্ত ও দ্রুত সম্প্রসারণশীল ভাষা বাংলা। টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমায় আরবির সঙ্গে বাংলা ভাষায় আখেরি মোনাজাত শুরু হয়েছে ২০১৮ সাল থেকে। ২০১৮ সালের ১২ মে ‘বঙ্গবন্ধু-১’ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে মহাকাশেও যাত্রা শুরু করেছে বাংলা ভাষা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে বাংলাকে অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব করেছেন। আশা করা যায়,  শিগগিরই জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে বাংলা স্বীকৃতি পাবে। মাতৃভাষার দিক থেকে চতুর্থ এবং জনসংখ্যার বিচারে সপ্তম এ ভাষার শব্দসংখ্যা প্রায় চার লাখ। পরিশেষে বলা যায়, ভকভক কথায়, ফসফস লেখায়, ফুরফুরে মেজাজে, কারণে-অকারণে, পটাপট বিদেশি শব্দ বাদ দিয়ে আচার-আচরণে, কথায়-লেখায়, শিল্প-সাহিত্যে ঝকমকে-তকতকে বঙ্গভাষা যদি করি ব্যবহার, সেটাই হবে গৌরবের ও মর্যাদার।

লেখক : জেন্ডার, স্থানীয় সরকার ও উন্নয়ন গবেষক

dr.mmh.ju@gmail.com



মন্তব্য