kalerkantho


আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয় এবং জনগণের প্রত্যাশা

মো. নুরুল আনোয়ার

১৫ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয় এবং জনগণের প্রত্যাশা

৩০ ডিসেম্বর আমরা আবার নতুন ইতিহাস গড়লাম। ১৯৭০ সালের পর দ্বিতীয়বার আমরা ভোটের জোয়ার দেখলাম। ফলাফল সবার জানা। এত অধিকসংখ্যক ভোটারের উপস্থিতি, বিশেষ করে নারী ও তরুণ ভোটারদের উপস্থিতি এটা সাক্ষ্য দেয় যে আমরা গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় আরো এক ধাপ এগিয়েছি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যেভাবে ঘটিয়েছি, উন্নয়নের মহাসড়কেও সেভাবে পা ফেলেছি।

আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরে বর্তমান বাংলাদেশের চালচিত্র অচেনা মনে হবে। নির্বাচনের কয়েক দিন আগে বিভিন্ন তারিখে আমরা মোট ছয়টি নির্বাচনী ইশতেহার দেখেছি। পাঁচটি রাজনৈতিক দলের এবং ছয় নম্বরটি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের। মূল তিনটি ইশতেহারের দিকে একটু নজর দেব। এতে ধারণা পাওয়া যাবে কেন আওয়ামী লীগের এই বিশাল জয় হয়েছে। ৯ পৃষ্ঠার একটি ইশতেহারে বিএনপি মোদ্দা কথায় বলেছে, শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ অর্থ ব্যয় করা হবে, পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষা বাতিল, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের পরিবর্তন, নির্বাচনকালীন সরকারের বিধান চালু ও দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রীর পদে না থাকার বিধান, বাহিনী বাদে সরকারি চাকরিতে বয়সের সীমা তুলে দেওয়া ইত্যাদি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে কিছু নেই এই ইশতেহারে। অন্যদিকে বিএনপি সমর্থিত এবং আহূত ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারটি ৩০ পৃষ্ঠার। এ দুটি ইশতেহারে কিছু বিষয়ে মিল আছে, আবার বিরাট অমিলও আছে। যেমন ঐক্যফ্রন্ট যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ওয়াদা করেছে। ক্ষমতার ভারসাম্য ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ চায়, ছয়টি বিভাগে হাইকোর্টের বেঞ্চ করার কথা আছে। এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা জানিয়ে বলা হয়েছে, নির্বাচনে জয়ী হলে সেটা প্রকাশ করা হবে।

অন্যদিকে ৮৪ পৃষ্ঠার সুচিন্তিত, বাস্তবধর্মী ও সুলিখিত ইশতেহার দিয়েছে আওয়ামী লীগ। বিষয় ব্যাখ্যার জন্য গ্রাফ ব্যবহার করা এই ইশতেহারে আগামী দিনে কী কী কাজ করবে, তার আগে বিগত ১০ বছরে সেই খাতে কী কী করেছে তা উল্লেখ করা হয়েছে। শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট দেওয়ার অঙ্গীকারও আছে এতে। পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধের ব্যবস্থা, ঢাকা শহরে দূষণমুক্ত বাতাস, বিপুলসংখ্যক বেকারের কর্মসংস্থানের অঙ্গীকার, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার ওয়াদা, সড়ক ও রেল যোগাযোগে নতুন যুগ আনা, দুর্নীতি-মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান—আরো অনেক প্রতিশ্রুতি ঘোষিত হয়েছে ২০২১ সালের মধ্যে কী কী হবে, ২০৪১-এর রূপকল্প ও ২১০০ সালের ডেল্টা প্ল্যান। আওয়ামী লীগের ইশতেহারের ওয়াদাগুলো মানুষ, বিশেষ করে নতুন ভোটাররা ভালোভাবে গ্রহণ করেছে এবং বিশ্বাসও করেছে। কারণ আওয়ামী লীগের গত ১০ বছরের উন্নয়নকাজের সঙ্গে মানুষ এরই মধ্যে পরিচিত হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহার ছিল অস্পষ্ট, কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্ববিরোধী। তদুপরি তর্কের খাতিরে যদি ধরে নিই ৩০ তারিখ বিএনপি আশ্রিত ঐক্যফ্রন্ট জয়লাভ করলে কে হতো প্রধানমন্ত্রী? খালেদা জিয়া ও তারেকহীন বিএনপিতে কে কাকে মানত? ড. কামাল প্রধানমন্ত্রী হলে জামায়াতের পাস করা ২২ জনের সংসদে অবস্থান কী হতো? ড. কামাল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে চাইলে জামায়াত সংসদ সদস্যরা কী ভূমিকা রাখতেন? মহামান্য রাষ্ট্রপতি কে হতেন? খালেদা জিয়া, তারেকের সাজার ও বিচারাধীন মামলার কী হতো? ২০১৪-১৫ সালের সন্ত্রাসে অভিযুক্ত দলীয় অগ্নিসন্ত্রাসীদের মামলার কী ফয়সালা হতো? প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, সংখ্যালঘুদের জানমালের ওপর হামলা কে ঠেকাত? পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনী, সরকারি কর্মচারীদের কত বিপুলসংখ্যক চাকরিচ্যুত হতেন, ২০০১ থেকে ২০০৫ সালের মতো তার সুমার কে করত? চলমান অবকাঠামোগত কাজ মাঝপথে বন্ধ হয়ে যাওয়া ঠেকাত কে? প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গার ভবিষ্যৎ কী হতো? এসব বিষয় ভোটে প্রধান ভূমিকা রেখেছে জনমত গঠনে। বিএনপিকে ক্ষমতায় এনে দেশে একটা মহাদাঙ্গা, ধ্বংস ও নারকীয় অবস্থায় পড়তে জনগণ চায়নি। মানুষ এখন বুঝতে পেরেছে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এবং ২০০৪-এর ২১ আগস্টের যোগসূত্র কোথায় এবং সেই সঙ্গে এ দুটি ঘটনার কুশীলব কে ও কারা। খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়ার ভয়ংকর চরিত্রও মানুষ দেখতে পেয়েছে। এসব মানুষকে সতর্ক করছে।

একটা প্রশ্ন বা কৌতূহল জনগণের মধ্যে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে, সেটা হলো আওয়ামী লীগ নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে এ ধরনের প্রজ্ঞা ধীশক্তি, বুদ্ধিমত্তা, দূরদর্শিতা, নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও সাহস এলো কোথা থেকে? সেটা জানতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপরের আট পুরুষের দিকে নজর দিতে পারি। ১৪৬৩ খ্রিস্টাব্দে হজরত বায়েজিদ বোস্তামির সঙ্গী বাগদাদের হাসনাবাদ থেকে আগমনকারী দরবেশ শেখ আউয়াল থেকে ক্রমান্বয়ে বঙ্গবন্ধু পর্যন্ত কীর্তিমান পুরুষরা এ দেশে ইসলাম প্রচারে এসে ক্রমে জনসেবায় নিয়োজিত হয়েছিলেন। এঁদের চতুর্থ পুরুষ শেখ কুদরত উল্লাহ ওরফে কদু শেখ কলকাতায় রানি রাশমনির সঙ্গে ব্যবসার কারণে প্রবল বিরোধে জড়ান। তিনি এক ইংরেজ কুঠিয়ালের অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিলাতের প্রিভি কাউন্সিল পর্যন্ত মামলা লড়ে সেই কুঠিয়ালকে পরাজিত করেন। কুঠিয়ালের এক পয়সা জরিমানা হয়। পিতার ও পূর্বপুরুষের সব গুণের সঙ্গে অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে শিখেছেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা তাঁর ধমনিতে পূর্বপুরুষদের মানবিক গুণাবলি ও তেজ বহন করছেন, সঙ্গে নিজ জীবনের নিষ্ঠুর অভিজ্ঞতাকে সমন্বয় করেছেন। সংক্ষেপে এই হচ্ছে তাঁর সফলতার কারণ বা রহস্য।

অন্যদিকে বিএনপি দলটি ২০১৪ সালের নির্বাচন ভণ্ডুল করার জন্য বিদেশিদের কাছে ধরনা দেওয়াসহ আইএসআইয়ের সহায়তা গ্রহণ, নির্বাচনের দিন ও পরে প্রায় এক বছর সারা দেশে চরম অরাজকতা ও ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ চালায়, আখেরে যার পরিণতি বুমেরাং হয়েছে। প্রতিটি ঘটনায় মামলা হয়েছে, তদন্তে চার্জশিট শেষে গ্রেপ্তার চলছে। ধারণা করা হয়, সেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে বিএনপি সম্মানজনকভাবে বিরোধী দলে থাকত এবং ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনে অনেক সুবিধা ও স্বস্তি পেত। তারা সে পথে না গিয়ে একটানা দেশে-বিদেশে সরকারের গিবত গাওয়া এবং বিরোধিতায় সময় ব্যয় করে। বিদেশি লবিস্টদের পেছনে অর্থ ব্যয় করে ভারতসহ বিদেশিদের কাছে ক্রমেই ধরনা দিতে থাকে জনগণের ওপর ভরসা না করে। অধিকন্তু জামায়াতকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সঙ্গে একই কণ্ঠে অবস্থান নেয়। খালেদা জিয়া ও তারেকের দুর্নীতি মামলার রায়, ২১ আগস্টের মামলার রায় দলটির মনোবল নষ্ট করে দেয়। তারেককে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পদে আসীন করা, রিজভী-ফখরুলের দ্বন্দ্ব, অতি বিলম্বে নির্বাচনে আসার সিদ্ধান্ত, এক সিটে তিন-চারজনের প্রাথমিক মনোনয়ন পরিণতিতে প্রকৃত প্রার্থীর প্রস্তুতির সময় না পাওয়া, যোগ্য প্রার্থীকে মনোনয়ন না দেওয়া, মনোনয়ন বাণিজ্যের সঙ্গে মা-ছেলের একগুঁয়েমি, জেদ, অহমিকা, দুর্ব্যবহার, নিষ্ঠুরতা, কর্তৃত্বপরায়ণতা, বিলাসী জীবন, সিদ্ধান্তহীনতা, দুর্নীতি দলটিকে নড়বড়ে করে দিয়েছে। বিলেতে অবস্থানরত দলটির মহাশক্তিধর নেতার ইন্টারনেটে সেনাবাহিনীকে পরোক্ষ নির্দেশনা, পুলিশ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের হুমকি—এই ভোটে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। শুধু তা-ই নয়, এতে আগামী নির্বাচন পর্যন্ত দলটির অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়তে পারে। এমনকি বিলীনও হতে পারে।

নির্বাচন-পূর্ব দিন থেকে এখন পর্যন্ত বিএনপি নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য সমানে বিষোদ্গার ও কূটনৈতিক অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের লবিগুলো আরো সক্রিয় হয়েছে। গত শুক্রবার দলটির একদল কর্তা ঢাকার মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বাসায় দেড় ঘণ্টার রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন। এ ছাড়া ইইউ, কানাডা, ব্রিটেনসহ উন্নত দেশগুলোর কাছে নির্বাচন বাতিলের ব্যবস্থা নিতে অনবরত নিবেদন করে যাচ্ছে। জাতিসংঘের কাছেও অনুরূপ নিবেদন ক্রমাগত চালাচ্ছে। এর ফলে মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলার ও জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক মিয়াসেপ্পো আমাদের পররাষ্ট্রসচিবকে বিষয়টি অবহিত করেছেন। জাতিসংঘ অধিক গুরুত্ব দিয়েছে রোহিঙ্গা সংকটকে। তবে পশ্চিমা দেশগুলো ১০ বছর পর অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। পাশাপাশি নির্বাচনের পরিবেশ, ভোটগ্রহণ সম্পর্কিত অনিয়মগুলো আমলে নিয়ে আইনগতভাবে নিষ্পত্তি করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশ এবং এর জনগণের অগ্রগতির স্বার্থে নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করবে জানিয়েছে। সুইডেন, ব্রিটেন ও কানাডার বক্তব্যও একইরূপ। এর দ্বারা বিএনপি ‘সুুগার কোটেড’ সান্ত্বনা পেল। এসব না করে তারা আপত্তি নিয়ে আইনি প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হলে শোভন হতো।

অন্যদিকে নির্বাচনের পরদিনই ভারত, চীন, ভুটান ও নেপাল নতুন সরকারকে স্বাগত জানাল। সার্ক দেশগুলো, সৌদি আরবসহ অনেক আরব দেশ; জাপান, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানিয়ে একযোগে কাজ করার কথা বলেছে। সর্বশেষ ওমান, সুদান, এমনকি পাকিস্তানও নতুন সরকারকে শুভেচ্ছা জানিয়েছে। এ ছাড়া মুসলিম দেশগুলোর উন্নয়নের জোট জি-৮৩ শুভেচ্ছা জানিয়েছে সরকারকে। মোদ্দা কথা, আমাদের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন এবং নির্বাচিত সরকার বিশ্বের দেশগুলোর কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। ৮ জানুয়ারি নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। এরশাদের জাতীয় পার্টি প্রধান বিরোধী দল হিসেবে সংসদে দায়িত্ব পালন করবে এবং তিনি হবেন বিরোধীদলীয় নেতা আর ছোট ভাই গোলাম কাদের হবেন উপনেতা। পরিবারতন্ত্রে আটকে থাকলেন এরশাদ। বিএনপি এখন কী করবে? এখনো তাদের দলের ও ফ্রন্টের আটজন সংসদ সদস্য শপথ নেননি। আমজনতা মনে করে, তাঁদের উচিত শপথ নিয়ে সংসদে দায়িত্ব পালন করা। তবে ঐক্যজোটের দুজন সংসদ সদস্য শপথ নেবেন বলে জানা গেছে।

নির্বাচনে জয়ী দলের নেতাকর্মীদের আচরণ কেমন হওয়া উচিত। এককথায় বিনয়ী হওয়া, সংযত ও শোভন আচরণ করা। দলনেত্রী নেতাকর্মীদের কোনো ধরনের বিচ্ছিন্ন বিজয় মিছিল করতে নিষেধ করেছেন। কিন্তু স্থানীয়ভাবে নিম্ন মনোবৃত্তির কিছু নেতাকর্মী এরই মধ্যে কিছু ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছে, যা দল তথা সরকারের ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলেছে। নোয়াখালীর সুবর্ণচরের গণধর্ষণের ঘটনা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। রক্ষা যে সরকার সঙ্গে সঙ্গে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে। ধর্ষণকারীদের গ্রেপ্তার করেছে। নড়াইলে দোকানপাট পোড়ানোর ঘটনা ঘটেছে। বিচ্ছিন্নভাবে আরো কিছু ঘটনা ঘটেছে, যা কাম্য নয়।

বর্তমান সরকারের আবার নির্বাচিত হওয়া যেমন সুখবর ও স্বস্তির, সেই সঙ্গে জনগণের চাহিদাগুলোকে চিহ্নিত করে দ্রুততার সঙ্গে সেগুলো পূরণ করার পদক্ষেপও জরুরি। কিছু চাহিদা জরুরি, কিছু সময়ভিত্তিক। রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক দাবির চেয়েও সার্বিক মঙ্গলময় বিষয় আগে হাতে নিতে হবে। উদাহরণ ঢাকা-চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং বর্তমান চার লেনের স্থলে আট লেন সড়ক নির্মাণ। সরকারের কয়েকটি মেগা প্রজেক্ট, বিদ্যুৎ উৎপাদন একটা পর্যায়ে গেছে। পদ্মা সেতু, মেট্রো রেল, পূর্বাচল ৩০০ ফিট সড়কসহ অন্য সব প্রকল্পের কাজ যেন দেওয়া সময়ের মধ্যে শেষ হয়।

রেলপথ ও মহাসড়ক সম্প্রসারণের চলমান কাজগুলো, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ, নতুন এয়ারপোর্ট নির্মাণ, বর্তমান বিমানবন্দরের সম্প্রসারণ ইত্যাদি দ্রুত দৃশ্যমান হবে আশা করা যায়। স্বপ্নের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্রের বাস্তবায়নও মানুষ চায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে।

জনগণ কিছু বিষয়ের সত্বর সমাধান চায়। যেমন—শিক্ষা ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষা বাতিল, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা, প্রাইমারি শিক্ষকদের শিক্ষা অনুদানসহ রেশন, পোশাক ভাতা, ভ্রমণ ভাতা ইত্যাদি প্রদান। বিদ্যালয়গুলোর সংস্কার করা নিয়েও একটা পদক্ষেপ। কারণ প্রাইমারি থেকেই সুনাগরিক তৈরি হয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম শহরের যানজট নিরসন ও দুর্ঘটনা বন্ধে দ্রুত দৃশ্যমান কার্যকর পদক্ষেপ। শহরকে ১০-১২টি বাস কম্পানির আওতায় নিয়ে এসে উন্নতমানের বাস চালু করা। ছোট রাস্তা ও রুটের জন্য ব্যাংককের মতো ‘টুকটুক’ বা ১৬ সিটের ইলেকট্রিক যানের অনুমতি দেওয়া। এগুলো দৃশ্যমান করতে এক বছরের অধিক সময়ের দরকার হবে না। সরকারি চাকরিতে বয়স দুই বছর বৃদ্ধি করা। বেকারত্ব দূর করার জন্য প্রতি জেলায় একটি কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র চালু করা। পুরনো এলএমএফ কোর্স চালু করা গ্রামে চিকিৎসা সুবিধার জন্য। গুরুত্বপূর্ণ বাজার, ব্যবসাকেন্দ্রে সরকারি পানি সরবরাহ লাইন চালু করা দরকার। আরো প্রয়োজন মাদক নির্মূলের মতো দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। সরকারের প্রতিটি সেবাকেন্দ্র ঘুষ-দুর্নীতিতে আচ্ছন্ন, বিশেষ করে ভূমি অফিস, সিটি করপোরেশন, বিদ্যুৎ, গ্যাস, ওয়াসা, আয়কর, শিক্ষা অফিস, হাসপাতাল, মাদক নির্মূল বিভাগ, সরকারি সব চাকরিতে নিয়োগে, দুদক, ফায়ার সার্ভিস, বিস্ফোরক দ্রব্য বিভাগ, পরিবেশ ও বন অধিদপ্তরও দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত।

মাদক আমাদের সমাজকে খুবলে খুবলে খাচ্ছে। এই মাদকের অতলে ডুবে যাচ্ছে দেশ, সমাজের সব বয়সের মানুষ এতে আসক্ত, বিশেষ করে যুবসমাজ। আগে নারীরা মাদক থেকে দূরে থাকত, হালে নারীরাও এতে দংশিত হচ্ছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী গত বছরের শুরুতে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান ঘোষণা করেছিলেন। ফলে দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সাঁড়াশি অভিযান শুরু করে। ১৬ হাজারেরও অধিক মাদকসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ধরা পড়ে। উদ্ধার হয় বিপুল পরিমাণ ইয়াবা বড়ি, ফেনসিডিল, গাঁজা এবং ঢাকা বিমানবন্দরে ‘খাত’ নামে নতুন মাদক। এই নির্মূল অভিযানকালে র‌্যাব-পুলিশের হাতে তিন শতাধিক ব্যক্তি ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত হয়। মাদক উদ্ধার অভিযানের এই অংশটুকু বাদে বাকিটুকু সর্বতো কারণে সমর্থন করে জনগণ।

অপরাধ দমন, আইন-শৃঙ্খলা বহাল রাখা, নাগরিকদের নিরাপত্তা দান, যা দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে স্বাভাবিক রাখে। এ কাজ মূলত পুলিশ বাহিনীর। এই বাহিনী যদি সততা, দক্ষতা, আন্তরিকতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে, সে ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও অপরাধমূলক কার্যকলাপ সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকবে। জনগণ সরকারকে পূর্ণ সমর্থন দেবে। সরকারের অন্য সংস্থাগুলোর দুর্নীতিও নিয়ন্ত্রিত থাকবে। বাস্তব অবস্থা দেশে এখন ভিন্নতর। পুলিশ বাহিনী এখন সরকারের নিয়ন্ত্রণ থেকে দলীয় কিছুসংখ্যক নেতাকর্মীর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। মাঠপর্যায়ে পুলিশের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো আসে, তা অসত্য নয়। বর্তমান আইজিপি দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম অপরাধ সভায় পুলিশ সদস্যরা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তাদের বিরুদ্ধে যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন, তা পত্রিকায় ছাপার অক্ষরে পাঠকরা দেখেছিলেন। বর্তমান আইজিপি পুলিশকে কালিমামুক্ত করার জন্য একটা উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এতে সরকারপ্রধানের সমর্থন প্রয়োজন।

আরো একটি কাজ সরকারকে করতে হবে। আওয়ামী লীগের সংস্রবের বাইরে একটা সত্যিকারের গণতান্ত্রিক বিরোধী দল সৃষ্টিতে কাজ করতে পারলে বাংলাদেশ উচ্চ সম্মান ও দ্রুততার সঙ্গে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে—এটা সর্বজনের একান্ত প্রত্যাশা।

লেখক : সাবেক আইজিপি



মন্তব্য