kalerkantho


কাস্পিয়ান সাগরে কি স্নায়ুযুদ্ধের নতুন অধ্যায়ের শুরু

মুহা. রুহুল আমীন

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



কাস্পিয়ান সাগরে কি স্নায়ুযুদ্ধের নতুন অধ্যায়ের শুরু

প্রায় দুই দশক ধরে আলাপ-আলোচনা ও দর-কষাকষির পর গত ১২ আগস্ট কাস্পিয়ান সাগরের তীরস্থ রাষ্ট্রগুলো একটি কনভেনশন স্বাক্ষর করেছে। বিশ্বরাজনীতির শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে অত্যন্ত ধীরস্থির গতিতে পাঁচটি রাষ্ট্রের মধ্যে এ বোঝাপড়া চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। কাস্পিয়ান সাগরের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান, বৈশ্বিক জলাধারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভুত্ব নীতি, ইউক্রেনে নবতর স্নায়ুযুদ্ধের দামামা প্রভৃতি আন্তর্জাতিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সদ্য সমাপ্ত এই কাস্পিয়ান সাগর চুক্তির বৈশ্বিক বিশ্লেষণ জরুরি।

ভৌগোলিক দিক থেকে দেখলে কাস্পিয়ান সাগর ইরান, রাশিয়া, কাজাখস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও আজারবাইজান—এ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অবস্থিত ভূবেষ্টিত একটি জলাধার। এটি সাগর, নাকি হ্রদ—এ নিয়ে ঐতিহাসিকভাবে বিতর্ক রয়েছে। পাঁচ জাতি চুক্তিতে একে সাগর হিসেবে অভিহিত করে অত্র জলাধারের আন্তর্জাতিক তাৎপর্য তুলে ধরা হয়েছে। কাস্পিয়ান সাগরের ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্য হলো, এটা ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে সেতুবন্ধ রচনা করেছে। বিশ্বের সর্ববৃহৎ অন্তর্ভূমি এই জলাধারে (largest inland body of water) তেল, গ্যাস ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে প্রভূত পরিমাণে। কূটনীতিকরা পাঁচ দেশের এ চুক্তিকে আঞ্চলিক সংবিধান হিসেবে অভিহিত করেছেন।

কাস্পিয়ান সাগরের তীরস্থ পাঁচটি দেশের স্বাক্ষরিত চুক্তিতে বলা হয়েছে, তাদের কোনো দেশ তৃতীয় কোনো দেশ বা যুদ্ধকারী দেশ বা আক্রমণকারী দেশের জন্য তার সীমানা উন্মুক্ত করবে না। অর্থাৎ কাস্পিয়ান সাগরে ওই পাঁচটি দেশের আধিপত্য বজায় থাকবে এবং তাদের এখতিয়ারের বাইরের কোনো রাষ্ট্র অত্রাঞ্চলে কর্তৃত্ব করতে পারবে না। এ চুক্তি স্বাক্ষরের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর অন্যতম একটি মন্তব্য হলো—বিশ্বের সব জলাধার, সাগর, নদী ও মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃত্ব করতে চায়। তাহলে কাস্পিয়ান সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থা কী?

এমন একটি সময়ে এই কাস্পিয়ান চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপ, এশিয়াসহ বিশ্বের প্রায় সব অংশের সঙ্গে বাণিজ্য সংরক্ষণবাদ নীতি গ্রহণ করেছে। কয়েক দিন আগে রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী দিমিত্রি মেদভেদেভ কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার ওপর যে অবরোধ আরোপ করেছে, তা সব শক্তি দিয়ে মোকাবেলা করা হবে। ইরানের সঙ্গে পঞ্চশক্তি+এক রাষ্ট্রগুলোর স্বাক্ষরিত পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন যে ইরানের সঙ্গে যে রাষ্ট্র বাণিজ্য করবে তার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক ছিন্ন করবে। এর পর থেকে ইরানের কূটনৈতিক অঙ্গন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার ধাক্কা সামলাতে নানামুখী তৎপরতা শুরু করে। কাস্পিয়ান চুক্তি এমন একটি কূটনৈতিক তৎপরতা, যার মাধ্যমে ইরান হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এ বার্তা দিতে চেয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার ক্ষতি ইরানিরা পুষিয়ে নিতে পারবে। কারণ তাদের রয়েছে আঞ্চলিক অখণ্ডতায় নেতৃত্বদানের যোগ্যতা। স্বনামধন্য রাজনীতি বিজ্ঞানী এবং ‘ট্রিপল অ্যাক্সিস’ (Triple Axis)-এর সহলেখক এরিয়ানে তাবাতাবাঈ এক মন্তব্যে বলেন, প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি হয়তো ইরানিদের এই বলে আশ্বস্ত করতে পারবেন যে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ইরানকে অপরাপর বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি; বরং ইরান সফলতাসহকারে আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে গভীর বন্ধনে আবদ্ধ হতে সক্ষম হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ইরানকে কখনো একঘরে করতে পারবে না, কাস্পিয়ান চুক্তির অন্তর্নিহিত চেতনা সেই সত্যকে তুলে ধরেছে। ট্রাম্পের ইরান অবরোধের অন্যতম লক্ষ্য ছিল ইরানের তেল বিক্রি শূন্যে নামিয়ে আনা। কিন্তু গত ১০ আগস্ট ইরানের সর্ববৃহৎ তেল ক্রয়কারী দেশ চীন ইরান থেকে তার তেল ক্রয় অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেওয়ায় ইরান একই রকম ঘোষণা রাশিয়ার কাছ থেকে আদায় করতে চায়। কাস্পিয়ান চুক্তি স্বাক্ষরদানে বিভিন্ন পার্শ্বসভায় পুতিনের সঙ্গে কথা বলে প্রেসিডেন্ট রুহানি সেই লক্ষ্য পূরণের সুযোগ কাজে লাগান।

রাশিয়ানদের কাছে কাস্পিয়ান চুক্তির তাৎপর্য হলো—ইউক্রেন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার যে স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়েছে, স্নায়ুযুদ্ধের সেই লড়াইয়ের ময়দানে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নিজেকে প্রবল প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানো। কাস্পিয়ান তীরস্থ রাষ্ট্র তুর্কমেনিস্তানের সঙ্গে আজারবাইজানের প্রস্তাবিত ৩০০ কিলোমিটার গ্যাস পাইপলাইন স্থাপনের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করে ইউরোপে তুর্কমেনিস্তানের বিশাল গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করা রাশিয়ান কূটনীতির অন্যতম লক্ষ্য, যা পাঁচ রাষ্ট্রের এই চুক্তির মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে। ওই বিশাল গ্যাস সরবরাহের কাজটি বর্তমানে গ্যাজপ্রম নিয়ন্ত্রণ করছে।

গার্ডিয়ানে এক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে যে কাস্পিয়ান চুক্তির বদৌলতে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার একটি মোক্ষম সুযোগ তৈরি হয়েছে।

৩০০ বছর ধরে রাশিয়ার কাছে কাস্পিয়ান সমুদ্র এলাকা গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। সে কারণে রাশিয়া, পরবর্তী সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন কাস্পিয়ান সাগর নিজেদের দখলে রাখে। এর আগে ইরানি ও তুর্কিদের দখলে ছিল এটি। কাস্পিয়ান সাগরের ভূকৌশলগত আরেকটি গুরুত্ব হলো এটা ভলগা নদীর বাইরের মূল অংশ। ফলে অন্যান্য সাগরের তুলনায় এর লবণাক্ততা খুবই কম। মস্কো, কাজান, সামারা, আস্ত্রাখান, ভলগোগ্রাদ (স্তালিনগ্রাদ), নিজনি নভগোরোদ, রায়াজান প্রভৃতি এলাকা কাস্পিয়ান সাগরের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তা ছাড়া সেন্ট পিটার্সবার্গ, শ্বেতসাগর, লাদোগা হ্রদ, কৃষ্ণ সাগর ও বাল্টিক সাগরের সঙ্গে খালের মাধ্যমে কাস্পিয়ান সাগরের যুক্ততা আছে। এখান থেকে ভূমধ্য সাগরে বের হওয়ার সুযোগও রয়েছে। সব কিছু বিবেচনা করে কাস্পিয়ান সাগরকে রাশিয়ার জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং ঐতিহাসিক ও ভূ-রণকৌশলগত স্বার্থের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

রাশিয়ার প্রতিপক্ষ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্য দেশগুলো কাস্পিয়ান সাগরে পাশ্চাত্য আধিপত্য বিস্তারের নিরন্তর চেষ্টা চালিয়েছে। ইউক্রেন ইস্যু তৈরির পর অত্রাঞ্চলে ন্যাটো সেনা সমাবেশ করে পাশ্চাত্যের এ চিরায়ত রুশবিরোধী রণকৌশলের সত্যকে তুলে ধরেছিল। রাশিয়ার সর্ববৃহৎ যুদ্ধজাহাজ ফ্লোটিলা কাস্পিয়ান সাগরে নিয়োজিত। কাস্পিয়ান থেকে ফ্লোটিলার যুদ্ধজাহাজগুলো ভলগা নদী দিয়ে যাত্রা করে ভলগা-ডন খালের মাধ্যমে ডন নদ পার হয়ে অ্যাজভ সাগরের ওপর দিয়ে কৃষ্ণ সাগর পর্যন্ত যেতে পারে। রাশিয়ার এই ভূ-রণকৌশলগত তাৎপর্যময় এলাকায় স্বাভাবিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র সতর্ক দৃষ্টি রাখবে এবং স্নায়ুযুদ্ধকালীন ‘ট্রুম্যান মতবাদ’ ও ‘মার্শাল পরিকল্পনার’ ছকে এবং ন্যাটোর রণকৌশলের আদলে সব সময় যুক্তরাষ্ট্র অত্রাঞ্চলে রাশিয়াকে প্রতিহত করার তৎপরতা দেখাবে। কিন্তু কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী পাঁচটি রাষ্ট্রের এই চুক্তির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রাশিয়া নবতর স্নায়ুযুদ্ধের নতুন ফাঁদ পেতেছে বলে অনুমান করা যায়।

কাস্পিয়ান সাগরের বুক চিরে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় গমনাগমনের জন্য বিভিন্ন পথ বা রুট রয়েছে। পশ্চিম দিকের পথটি যুক্তরাষ্ট্র খুবই সমর্থন করে, যা বাকু-সিহান প্রকল্প হিসেবে পরিচিত। গ্যাস ও তেল ভর্তি যান কাস্পিয়ান সাগরের বাকু বন্দর থেকে যাত্রা করে জর্জিয়ার তিবলিস হয়ে তুরস্কের সিহানসহ বিশ্বের অন্যত্র পৌঁছে যেতে পারে এই পশ্চিমের পথটি। যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়াকে প্রতিহত করার যে চেষ্টা করতে পারত, তা পাঁচ রাষ্ট্রের কাস্পিয়ান চুক্তির কারণে নস্যাৎ হয়ে গেছে কি না, তা এখন বিশ্লেষণের বিষয়। প্রশ্ন হলো—বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য অবরোধ চালু করে যে বৈশ্বিক বাণিজ্য যুদ্ধের সূচনা করলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, তা প্রতিহত করতে হয়তো চীন, রাশিয়া ও ইরান কাস্পিয়ান চুক্তির সুযোগ কাজে লাগাবে। যুক্তরাষ্ট্র কি স্নায়ুযুদ্ধের এ নবতর অধ্যায়ে নতুন ফ্রন্টে পারঙ্গমতাসহ খেলতে পারবে?

লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

mramin68@yahoo.com



মন্তব্য