kalerkantho


এই সময়

‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’র সতেরো বছর

তারেক শামসুর রেহমান

১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’র সতেরো বছর

আজ ১১ সেপ্টেম্বর। যুক্তরাষ্ট্র ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ’ শুরু করেছিল, তা ১৭ বছর পার করেছে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তথাকথিত এক সন্ত্রাসী হামলায় নিউ ইয়র্কের বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ‘টুইন টাওয়ার’ ধসে পড়েছিল। হাইজ্যাক করা দুটি বিমান আছড়ে পড়েছিল ভবন দুটির ওপর। কয়েক মিনিটের মধ্যে ভবন দুটি গলে পরিণত হয়েছিল ধ্বংসস্তূপে। ওই ঘটনায় মারা গিয়েছিল তিন হাজার মানুষ, যাদের মধ্যে বাংলাদেশি ছিল ১৪ জন। ওই সন্ত্রাসী ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছিল আল-কায়েদা নামে একটি সংগঠন আর তার প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন লাদেনের বিরুদ্ধে। তার পরের কাহিনি সবার জানা। লাদেনকে আফগানিস্তানের তালেবান সরকার আশ্রয় দিয়েছে—এই অভিযোগ তুলে আফগানিস্তানে ইঙ্গ-মার্কিন বিমান হামলা চালিয়ে উত্খাত করা হয়েছিল তালেবান সরকারকে। সেটা ২০০১ সালের কথা। তারপর ২০০৩ সালে ইরাকের কাছে অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র রয়েছে—এই অভিযোগ তুলে দখল করা হয়েছিল ইরাক। তার ঠিক আট বছর পর একই প্রক্রিয়ায় সাদ্দাম হোসেনের মতো উত্খাত করা হয়েছিল লিবিয়ার গাদ্দাফিকে। কোনো একটি ক্ষেত্রেও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন নেওয়া হয়নি।

মূলত ‘টুইন টাওয়ার’-এর ঘটনাবলির পর মুসলমান অধ্যুষিত দেশগুলোতে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’র নামে এক ধরনের ‘যুদ্ধ’ পরিচালনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশ এই ‘যুদ্ধ’ শুরু করলেও বারাক ওবামা কিংবা ডোনাল্ড ট্রাম্পও এই ‘যুদ্ধ’ অব্যাহত রেখেছেন। বারাক ওবামা শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার পেলেও তিনি লিবিয়ায় বিমান হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন ২০১১ সালে। আর ডোনাল্ড ট্রাম্প সিরিয়ায় আইএসের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ’র অংশ হিসেবে সেখানে বিমান হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের এই যে ১৭ বছর, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্জন কী? সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রম কি বন্ধ হয়েছে? বাস্তবতা হচ্ছে, এই সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। আল-কায়েদা পরিপূর্ণভাবে ধ্বংস হয়নি। বিন লাদেনকে পাকিস্তানে পাওয়া গিয়েছিল। অ্যাবোটাবাদ শহরে তিনি দিব্যি বউ-বাচ্চা নিয়ে থাকতেন। অথচ তাঁকেই কি না যুক্তরাষ্ট্র খুঁজছিল কয়েক বছর ধরে। বিন লাদেনের অবর্তমানে জাওয়াহিরি এখন আল-কায়েদা পরিচালনা করছেন।

২০০১ সালে আফগানিস্তান দখল করে নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে একটি ‘মিত্র বাহিনী’। কিন্তু তালেবানকে সেখান থেকে উত্খাত করা সম্ভব হয়নি দীর্ঘ ১৭ বছরেও। ২০১৮ সালে এসে দেখলাম তালেবান নতুন করে সেখানে আত্মপ্রকাশ করেছে। প্রতিদিনই সেখান থেকে আসছে আত্মঘাতী বোমা হামলার খবর। আফগানিস্তানের প্রত্যন্ত অঞ্চল এখন নিয়ন্ত্রণ করে তালেবান। আর তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে সিরিয়া থেকে উত্খাত হওয়া ইসলামিক স্টেটের জঙ্গিরা। বাদাখাসান, মাগলান, ফারিয়াবসহ উত্তরাঞ্চলের বিশাল এলাকা আর পশ্চিমের ফারাহ প্রদেশ এখন নিয়ন্ত্রণ করে জঙ্গিরা, যার মধ্যে আইএস নিয়ন্ত্রিত এলাকাও রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই দীর্ঘ সময় ধরে সেখান থেকে তালেবানকে উত্খাত করা গেল না কেন? তাদের অর্থ ও অস্ত্র কারা জোগায়? এখানেই রয়েছে শুভংকরের ফাঁকি! সেখান থেকে ‘মিত্র বাহিনী’ প্রত্যাহার করা হয়েছে বটে; কিন্তু ট্রাম্প চাচ্ছেন সেখানে আরো কিছু সেনা পাঠাতে। তথাকথিত ‘প্রশিক্ষণের’ নামে সেখানে এখনো চার হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে। পুরো আফগানিস্তান আবারও তালেবান-আইএস নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন এখন।

ইরাকের কথা যদি বলি, সাদ্দাম হোসেনকে উত্খাতের পর (২০০৩), আজও সেখানে স্থিতিশীলতা ফিরে আসেনি। ইরাকে সর্বশেষ একটি নির্বাচন হয়েছে ২০১৮ সালের ১২ মে। কিন্তু আজ অদধি সেখানে কোনো সরকার গঠিত হয়নি। কার্যত ইরাক এখন অলিখিতভাবে কয়েক টুকরায় ভাগ হয়ে গেছে। ইরাকি কুর্দিস্তানে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৭ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর। আর গণভোটে ৯৩ শতাংশ মানুষ স্বাধীন একটি কুর্দিস্তানের পক্ষেই রায় দিয়েছে। ইরাক এখন শিয়া, সুন্নি আর কুর্দিদের মধ্যে ভাগ হয়ে আছে। আরো একটি উদ্বেগের খবর আমাদের জানিয়েছে নিউ ইয়র্ক টাইমস (৩১ জুলাই, ২০১৮)। তারা জানিয়েছে, কোনো কোনো ড্রাগ কম্পানি ইরাকে সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে অর্থ জোগান দিচ্ছে। এখানে এক ধরনের ব্যাবসায়িক মনোবৃত্তি কাজ করছে—যুদ্ধ প্রলম্বিত হলে ওষুধের চাহিদা বাড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ এখন বিষয়টির তদন্ত করছে। সেখানে আইএসের তৎপরতা রয়ে গেছে। ওবামা Humanitarian Intervention তত্ত্ব প্রয়োগ করে লিবিয়ায় বোমাবর্ষণের নির্দেশ দিয়ে (২০১১) গাদ্দাফিকে উত্খাত করেছিলেন। কিন্তু ফলাফল কী? গত সাত বছরে লিবিয়া একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। সেখানে কোনো কেন্দ্রীয় সরকার নেই। অস্ত্রবাজরা সেখানে একেক এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। গাদ্দাফিকে উত্খাতের জন্য সেখানে এসব অস্ত্র ফেলা হয়েছিল। কিন্তু অস্ত্র আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। অস্ত্র এখন লিবিয়ার রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে। সিরিয়ায় Responsibility to protect ব্যবহার করে আসাদ সরকারকে উত্খাতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এই তত্ত্বের মূল কথা হচ্ছে মানবতা রক্ষায় বিশ্ব শক্তির দায়িত্ব। কিন্তু মানবতা কি সেখানে রক্ষিত হয়েছে? সিরিয়ার ১০ লাখ নাগরিক দেশান্তরিত হয়েছে। ভূমধ্যসাগর অতিক্রম করে ইউরোপে আশ্রয় নেওয়া কত মানুষ চিরদিনের জন্য সাগরে হারিয়ে গেছে, তার হিসাব আমরা কোনো দিনই পাব না। লাখ লাখ সিরীয় নাগরিকের (যাদের মধ্যে শিশুরাও আছে) ইউরোপের বনে-জঙ্গলে আশ্রয় নেওয়ার দৃশ্য আমরা টিভিতে দেখেছি। আমি পর পর দুই বছর ইউরোপে গেছি। আমি জার্মানিতে (ফ্রাংকফুর্ট) দেখেছি সিরিয়ার নাগরিকদের ভিক্ষা করতে। অথচ সিরিয়া কিংবা লিবিয়া একসময় সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্র ছিল। অনেক ইউরোপীয় দেশের চেয়ে এদের অর্থনৈতিক ভিত্তি অনেক শক্তিশালী ছিল। কিন্তু আজ তা একেকটি ধ্বংসের নগরীতে পরিণত হয়েছে। ২০১৪ সালে প্রথমবারের মতো জানা গিয়েছিল আইএসের নাম। ইসলামের নামে এদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সারা বিশ্বকে অবাক করেছিল। জনৈক বুগদাদি নিজেকে মুসলিম বিশ্বের ‘খলিফা’ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন এবং তাঁর প্রতি আনুগত্য স্বীকার করার জন্য মুসলমানদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। সুন্নি সম্প্রদায়ভুক্ত আইএস সিরিয়া ও ইরাকের বিশাল এলাকা নিয়ে তথাকথিত একটি ‘রাষ্ট্র’ গঠন করেছিল, যার রাজধানী ছিল রাকাতে। এদের একটি শক্তিশালী নিয়মিত সেনাবাহিনীও ছিল।

প্রশ্ন হচ্ছে, এই আইএস বা ‘দায়েস’—তাদের অর্থ ও অস্ত্রের উৎস কোথায় ছিল? অভিযোগ আছে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র এদের প্রশিক্ষণ দিয়েছিল। বুগদাদি ইসরায়েলি নাগরিক—এমন কথাও সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। মার্কিন ও রাশিয়ার আলাদা বিমান হামলায় আইএস সিরিয়া থেকে উত্খাত হয়েছে বটে; কিন্তু সিরিয়ায় স্থিতিশীলতা আসেনি। রাশিয়ার সামরিক সহযোগিতা আসাদ সরকারকে সেখানে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখছে বটে; কিন্তু আসাদবিরোধী বিভিন্ন সামরিক গ্রুপকে যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা করছে। সেখানে কার্যত এক ধরনের ‘প্রক্সি যুদ্ধ’ চলছে। একদিকে রাশিয়া (সেই সঙ্গে ইরান ও লেবাননের হিজবুল্লাহ) আসাদ সরকারকে সমর্থন করছে। অন্যদিকে ‘ফ্রি সিরিয়ান আর্মি’, ‘সুপ্রিম মিলিটারি কাউন্সিল’—যারা আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে, তাদের সহযোগিতা করছে (অস্ত্র ও অর্থ) যুক্তরাষ্ট্র। পূর্ব ইউরোপ থেকে অস্ত্র কেনা হচ্ছে—এমন খবর সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ট্যাংক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র (BGM-71 TOW) বিদ্রোহীরা ব্যবহার করছে, এমন খবরও সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বিমান থেকে যেসব অস্ত্র ফেলেছিল, তা বিদ্রোহী আল-নুসরা ফ্রন্টের কাছে চলে গিয়েছিল, এমন খবরও আমরা পত্রিকায় দেখেছি। সিরিয়া আজ একটি ধ্বংসের নগরীতে পরিণত হয়েছে। দেশটি রাষ্ট্র হিসেবে টিকে আছে বটে, কিন্তু প্রায় প্রতিটি বড় শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সেখানে নেই সুপেয় পানি, নেই বিদ্যুৎ, নেই স্বাস্থ্যব্যবস্থা। শিশুরা মারা যাচ্ছে জীবনরক্ষাকারী ওষুধের অভাবে।

যুক্তরাষ্ট্রের এই ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে চলছে। কিন্তু কি পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র? ডেভিড ডি গ্রো (David de Graw) Global Research-এ একটি প্রবন্ধে স্বীকার করেছেন যে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে’ যুক্তরাষ্ট্রের মোট খরচ ছয় ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। চিন্তা করা যায়, কি পরিমাণ অর্থ যুক্তরাষ্ট্র ব্যয় করছে এ খাতে? সাধারণ করদাতারা এই অর্থ পরিশোধ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয় এই যুদ্ধের খরচের একটি হিসাব দিয়েছে। তাদের ভাষায়, এই খরচ ৩.৭ ট্রিলিয়ন ডলার (Maclathy-র প্রতিবেদন, ১৫ আগস্ট ২০১১)। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই খরচ ছয় ট্রিলিয়ন ডলারের অঙ্ককে ছাড়িয়ে যাবে।

অথচ যুক্তরাষ্ট্রে দারিদ্র্য আছে। প্রতি ছয়জন মার্কিনের মধ্যে একজন দরিদ্র। পাঁচটি শিশুর মধ্যে একজন শিশু দারিদ্র্যের নিচে বাস করে। কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে ৫৪ শতাংশ দরিদ্র। এশীয়দের মধ্যে দারিদ্র্যের হার ১২.১ শতাংশ। যুদ্ধের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় না করে তা সামাজিক খাতে ব্যয় করলে পরিস্থিতি পাল্টে যেত। নাইন-ইলেভেন একটি ব্যবসার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। টুইন টাওয়ারে তৈরি হয়েছে ‘ফ্রিডম টাওয়ার’, সেখানে এখন বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা। ইরাকে পুনর্গঠনের কাজ করছে মার্কিন কম্পানিগুলো। সেখানেও বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা। ইরাক এখন অতিরিক্ত তেল উত্তোলন করে এই ব্যয়ভার মেটাচ্ছে। ফলে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। ফিনিয়ান কানিংহাম একটি প্রবন্ধে বলেছেন, ‘9/11 paved the way for america’s permanent war of aggression’। আর অধ্যাপক মিসেল চসুডোভস্কি তো স্পষ্ট করেই বলেছেন, ‘alleged Jihadi plotters were the product of US state terrorism’। বহুল আলোচিত চমস্কির বই 9/11 : Was There an Alternative-এ আছে নানা তথ্য ও উপাত্ত। রয়েছে নানা প্রশ্ন। দীর্ঘ ১৭ বছরেও এসব প্রশ্নের কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

লেখক : অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

tsrahmanbd@yahoo.com

 



মন্তব্য