kalerkantho


পবিত্র কোরআনের আলো । ধারাবাহিক

মানুষ স্বভাবত কৃপণ

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



মানুষ স্বভাবত কৃপণ

১০০. বলে দাও, যদি তোমরা আমার রবের অনুগ্রহের ভাণ্ডারের অধিকারী হতে, তবু খরচ হয়ে যাওয়ার ভয়ে তোমরা তা লুকিয়ে রাখতে। মানুষ তো অতি কৃপণ। (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ১০০)

তাফসির : আগের আয়াতে পরকালের অস্তিত্ব সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছিল। আলোচ্য আয়াতে অবিশ্বাসীদের পরকাল অস্বীকার করার কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। অবিশ্বাসীরা পরকালে বিশ্বাস না করার অন্যতম কারণ হলো দুনিয়ার মোহ। জাগতিক উৎকর্ষ ও চাকচিক্য তাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উদাসীন রেখেছে। উদাসীন রেখেছে পরকালের অনন্ত অসীম জীবন সম্পর্কে। ফলে দুনিয়ার অর্থ উপার্জন, ভোগ ও বিত্তবিলাসে তারা সতত মত্ত। ইরশাদ হয়েছে, ‘কিন্তু তোমরা পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য দিয়ে থাকো। অথচ পরকালই উত্কৃষ্টতর ও স্থায়ী। এটা তো আছে আগের গ্রন্থে—ইবরাহিম ও মুসার গ্রন্থে।’ (সুরা : আলা, আয়াত : ১৬-১৯)

মানুষের মধ্যে সম্পদ আহরণ ও সংরক্ষণের প্রবণতা এত বেশি যে বিশ্বজাহানের মালিক হয়ে গেলেও অর্থ হাতছাড়া করতে রাজি নয়। মানুষ অর্থ-সম্পদ নিজের কাছে রেখে দিতে চায়। স্বভাবতই মানুষ সম্পদ সংগ্রহে আগ্রহী এবং সম্পদ ব্যয়ে অনাগ্রহী। বলা যায়, কৃপণতা মানুষের অস্থিমজ্জায় লুক্কায়িত। সহজাত প্রবৃত্তির ঊর্ধ্বে উঠে দানশীল হতে হলে মানুষকে কঠোর পরিশ্রম ও নিজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হয়।

মানুষের এই সহজাত কৃপণতা বোঝাতে আলোচ্য আয়াতের শেষাংশে ‘নাক্বীর’ শব্দ আনা হয়েছে। খেজুরের আঁটির পিঠে যে বিন্দু থাকে, সেটাকে ‘নাক্বীর’ বলা হয়। অর্থাৎ মানুষ সামান্য পরিমাণও দান করতে চায় না। অথচ মহান আল্লাহ তাঁর ধনভাণ্ডার সবার জন্য অবারিত, উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘আল্লাহর হাত পরিপূর্ণ। তিনি রাত-দিন ব্যয় করেন, তবু তা থেকে কিছুই কমে না। লক্ষ করো, যখন থেকে আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন, তখন থেকে তিনি কতই না ব্যয় করেই যাচ্ছেন, তা সত্ত্বেও তাঁর হাতে যা আছে, তা থেকে কিছুই কমে না।’ (বুখারি শরিফ)

ইসলাম শিক্ষা দেয় মিতব্যয়িতা। পছন্দ করে না কৃপণতা। মহান আল্লাহ মানবজাতিকে দান ও বিসর্জন করতে উৎসাহিত করেছেন। এর জন্য অফুরন্ত সওয়াবের ঘোষণা দিয়েছেন। আবার সর্বস্ব বিলিয়ে নিজে ও পরিবারকে পথে নামাতে বলেননি। তাই মধ্যপন্থা ও মিতব্যয়িতা বজায় রাখতে হবে। ইরশাদ হয়েছে, ‘তুমি তোমার হাত গ্রীবায় আবদ্ধ করে রেখো না এবং তা সম্পূর্ণ প্রসারিত করো না। তাহলে তুমি নিন্দিত ও নিঃস্ব হবে।’ (সুরা বনি ঈসরাইল, আয়াত : ২৯)

কৃপণতা আল্লাহর অপছন্দনীয় কাজ। মানুষের অন্তরেও কৃপণ ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নেই। কৃপণতা মানবিকতার অন্তরায়। মানবতাবিবর্জিত কর্ম হলো কৃপণতা। মানবিক সমাজ গঠনে বাধা তৈরি করে এটি। কৃপণতার আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় দুঃখী মানুষের জীবন। সমাজে ধনী-গরিবের ব্যবধান বাড়ায় কৃপণতা। কৃপণ ব্যক্তি দুনিয়া ও আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইরশাদ হয়েছে, ‘কেউ কার্পণ্য করলে, নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করলে এবং যা উত্তম তা অস্বীকার করলে, তার জন্য আমি সুগম করে দেব কঠোর পথ। যখন সে ধ্বংস হবে, তখন তার সম্পদ তার কোনো কাজে আসবে না।’ (সুরা লাইল, আয়াত : ৮-১১)

যারা কৃপণতা করে, প্রকৃতপক্ষে তারা নিজেদেরই ক্ষতি করে। মহান আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নন। তিনি অভাবমুক্ত। ইরশাদ হয়েছে, ‘দেখো, তোমরা তো তারা, যাদের আল্লাহর পথে ব্যয় করতে বলা হচ্ছে। অথচ তোমাদের অনেকে কৃপণতা করছে। যারা কার্পণ্য করে, তারা তো কার্পণ্য করে নিজেদের প্রতি। আল্লাহ অভাবমুক্ত আর তোমরা অভাবগ্রস্ত...।’ (সুরা : মুহাম্মদ, আয়াত : ৩৮)

গ্রন্থনা : মাওলানা কাসেম শরীফ



মন্তব্য