kalerkantho


জননেতাদের জনগণের নেতা হতে না পারার দুর্ভাগ্য

এ কে এম শাহনাওয়াজ

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



জননেতাদের জনগণের নেতা হতে না পারার দুর্ভাগ্য

এই দুর্ভাগ্যটি সম্ভবত তিন পক্ষেরই। প্রথম পক্ষ স্থানীয় বা জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতা। জননেতাদের উল্লেখযোগ্য অংশ নিজ কর্মী-সমর্থকদের বলয়বৃত্ত ভেঙে জনগণের সঙ্গে মিশতে পারছেন না। সুখ-দুঃখে জনগণের পাশে দাঁড়াতে পারছেন না। জনগণের কাছে অধরাই থেকে যান যেন। সাধারণ মানুষের চোখে তাঁরা অতিমানব। সাত ঘোড়ার শুভ্র রথে চড়ে যেন সপ্ত আকাশে বিচরণ করেন। জনগণ হয়তো এই ভেবে তৃপ্তি অনুভব করে, নির্বাচন এলে অন্তত এক-আধবার মাটির পৃথিবীতে নেমে আসেন নেতারা। হাত মেলান অতি সাধারণ ভোটারের সঙ্গেও। এতেই হয়তো অনেক সরল মানুষ বর্তে যান। অবশ্য স্বপ্নভঙ্গ হতে থাকে নির্বাচনের পর থেকে। এই সত্যটি যে জননেতারা বুঝতে পারেন না তেমনটি নয়। পরবর্তী নির্বাচন এলে জনগণের ভালোবাসায় যখন ফুরফুরে থাকার কথা তখন দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ে কপালে। নানা পথে নির্বাচনী অর্থ সংগ্রহ করতে হয়। বাড়াতে হয় পেশিশক্তির সংগ্রহ। আর এসব করতে হয় জনগণের সঙ্গে দূরত্ব বেড়ে যাওয়ার কারণে। জনগণের ভোট পাওয়ার ব্যাপারে নিঃসংশয় হতে পারেন না বলে।

দ্বিতীয় পক্ষ রাজনৈতিক দল। সব দলের নেতারা যখন বক্তৃতায় বা ক্যামেরার সামনে কথা বলেন, তখন দমে দমে ‘জনগণ’ বন্দনা করেন। জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছার বাইরে একটি কাজও করেন না যেন। কথা শুনলে মনে হয়, তাঁদের চেয়ে বড় জনগণের সেবক আর কেউ নেই। হরতালের যুগে টিভি খুললে দর্শক-শ্রোতা একটি কৌতুক দৃশ্যে খুব মজা পেত। হরতাল শেষে হরতাল ডাকিয়ে পক্ষের নেতারা জনগণকে ধন্যবাদ জানাতেন হরতাল সফল করার জন্য। আবার সরকারপক্ষের নেতারা জনগণকে ধন্যবাদ জানাতেন হরতালে সাড়া না দেওয়া বা প্রতিহত করার জন্য। এভাবে প্রকৃতপক্ষে সব দলের নেতারাই একটি কল্পনার জনগণের জগতে বাস করেন আবার প্রতারণা করেন বাস্তবের জনগণের সঙ্গে। দলগুলোর স্থানীয় নেতাদের জনবিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া দলগুলোর জনবিচ্ছিন্ন হওয়ার নামান্তর। স্থানীয় নেতারা নিজ স্তাবক পরিবেষ্টিত হয়ে মনে করেন, এটিই তাঁর জগৎ, তেমনি রাজনৈতিক দলের বড় নেতারাও নিজ দলীয় কর্মী-সমর্থকবেষ্টিত সভায় সাধু! সাধু! শুনেই মনে করতে থাকেন এটিই বোধ হয় সমগ্র জনগণের কণ্ঠস্বর। তেমনি মঞ্চে দাঁড়িয়ে যেসব কথা বলার নয়, কণ্ঠ চড়িয়ে তা-ই বলেন। দেশের তাবৎ মানুষ কী ভাবল তা বিবেচনা করার অবকাশ নেই। ক্ষমতায় না থাকা দল আত্মবিশ্বাসের অভাবে জনগণের সামনে যেতে দ্বিধা করে, অন্যদিকে ক্ষমতায় থাকা দল সুশাসন দিতে না পারায় এবং দুর্নীতিবাজদের হাত থেকে জনগণকে রক্ষা করতে না পারায় জনবিচ্ছিন্নতার আতঙ্কে ভোগে। নির্বাচন এলে তাই অন্ধকার পথ হাতড়াতে হয়।

তৃতীয় পক্ষ জনগণ। ওপরের দুই পক্ষের উন্নাসিক মানসিকতা, স্বার্থবাদী ও দলকেন্দ্রিকতার বলয়বন্দি আচরণ ‘জননেতাদের’ সাধারণ মানুষ নিজেদের নেতা ভাবতে পারেনি। এ কারণে সবচেয়ে অসহায় অবস্থায় রয়েছে সাধারণ মানুষ। তাদের অভাব-অভিযোগ জানানোর কোনো জায়গা নেই। তারা শুধু বিনোদন হিসেবে তথ্যমাধ্যমে প্রতিদিন নেতানেত্রীদের কৃতিত্বের ঢোলের বাদ্যি শোনে এবং নিয়ম করে দুই বিবদমান রাজনৈতিক পক্ষের ঝগড়াটে শব্দবাণ বিরক্তির সঙ্গে উপভোগ করে।

আমাদের মনে হয়, স্থানীয় পর্যায়ের জননেতারা যদি জনগণের নেতা হতে পারতেন, তাহলে ক্রমান্বয়ে ওপরের দিকটাও পরিশুদ্ধ হতে পারত। আবার একইভাবে ক্রমটি ওপর থেকে নিচেও আসতে পারে। আমি জননেতাদের জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারা না-পারার কয়েকটি উদাহরণ যুক্ত করতে চাই।

গত ২৬ আগস্টের একটি টাটকা অভিজ্ঞতার কথা দিয়ে শুরু করি। দুঃসহ অভিজ্ঞতাটি আমার এক আত্মীয়ের। শরীয়তপুর থেকে ঢাকা আসছেন সেদিন। ঈদের পরে ফেরিতে খুব চাপ থাকে। শরীয়তপুর থেকে একটি গাড়ি নিয়ে এসেছিলেন। কাঁঠালবাড়ি ঘাটে দীর্ঘ গাড়ির লাইন। নাব্য সংকটের কারণে বড় ফেরি এখন দেওয়া হচ্ছে না। অপেক্ষাকৃত ছোট ফেরি চলাচল করছে। এর মধ্যে ফেরির সংখ্যাও অপ্রতুল। জানতে পারলেন অনেকে সাত-আট ঘণ্টাও আটকে আছে। গরমের মধ্যে মানুষের অবর্ণনীয় কষ্ট। বাচ্চারা চিৎকার করছে। বৃদ্ধদের অবস্থা শোচনীয়। কিন্তু এই আক্রার সময়েও দুই ঘাটে দুটি ফেরি নিশ্চল বসে আছে। প্রথমে ভাবা হয়েছিল বুঝি নষ্ট ফেরি। পরে জানা গেল ফেরি দুটিতে এসেছেন দুজন মন্ত্রী। তাঁরা কখন ফিরবেন নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছে না। ভিআইপিদের নিয়েই ফিরতে হবে। ততক্ষণ বসে থাকবে ফেরি দুটি। এই নেতারা জনগণের নেতা হলে হয়তো এই দুঃসময়ে জনগণের কথা ভাবতে পারতেন। চার ঘণ্টা হাতে পেলে ফেরি দুটি দুবার আসা-যাওয়া করতে পারত। এতে অনেকেরই কষ্ট লাঘব হতো। কিন্তু যাঁরা সপ্ত আকাশে বিচরণ করেন, তাঁদের সাধারণ মানুষের কষ্ট দেখার সময় কোথায়!

এ ঘাটেই বছর দুই আগে আমারও প্রায় অভিন্ন অভিজ্ঞতা হয়েছিল। সেবারও ঈদের দুদিন পর শরীয়তপুর থেকে ফিরছি। সকাল ১০টায় কাঁঠালবাড়ি ঘাটে এসে দেখি প্রায় এক কিলোমিটার ট্রাকের লাইন। আরেক পাশে মাইক্রোবাসসহ ছোট গাড়ির লাইন। দীর্ঘ বিরতিতে ফেরি এলেও দীর্ঘ লাইন কমতে বিকেল গড়িয়ে যাবে। প্রচণ্ড গরমে বাচ্চারা কাঁদছে গাড়িতে। পাশের জেটিতে ফরিদপুর নামের একটি ফেরি ভেড়ানো। জানা গেল এটি ভিআইপি নিয়ে এসেছে। ভিআইপি নিয়েই ফিরবে। সকাল ৯টায় এসেছেন ভিআইপি। বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁর প্রতি একটি আলাদা শ্রদ্ধা রয়েছে আমার। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করা নামডাকওয়ালা ভিআইপি। কাছাকাছি তাঁর নির্বাচনী এলাকা। সেই অর্থে স্থানীয় জননেতা। তবে জনগণের নেতা কি না বোঝা গেল না। তিনি দুপুরের পর ফিরবেন। সবার এক কথা মানুষের এই সীমাহীন কষ্টে ভিআইপি ঢাকায় ফেরার আগে অনায়াসে ফেরিটি একবার অন্তত কাঁঠালবাড়ি-মাওয়া যাতায়াত করতে পারে। কিন্তু তা হওয়ার নয়। যেন ব্রাহ্মণ ভিআইপির ফেরিতে শূদ্র জনগণের ছুঁতে মানা। তবে ঘাটের দায়িত্ববানরা আশ্বস্ত করলেন ভিআইপি ওঠার পর জায়গা থাকলে অন্য গাড়ি তোলা যাবে। তবে নিশ্চিন্ত হওয়া গেল না। কারণ এ ধরনের ভিআইপিদের সঙ্গে নাকি আবার সাঙ্গোপাঙ্গদের বহর থাকে। তবে কিঞ্চিৎ আশা নিয়ে কেউ কেউ বসে রইল। এরই মধ্যে দুবার বড় ফেরি এলো, এতে বেশ কিছু গাড়ি যেতে পারলেও আমাদের সিরিয়াল অনেক পেছনে। দুপুরে বজ্রাঘাতের মতো খবর এলো এমপি সাহেব লাঞ্চের পর রেস্ট নিচ্ছেন। সন্ধ্যার আগে আসার সম্ভাবনা নেই। আর সেই পর্যন্ত ‘ফরিদপুর’ ফেরির ইঞ্জিনও চালু হবে না।

এবার ভিন্ন উদাহরণ। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর নারায়ণগঞ্জের একটি নির্বাচনী এলাকায় এমপি হলেন একজন সাবেক আমলা। বাংলাদেশের বেশির ভাগ এমপিই নির্বাচনী এলাকায় থাকেন না। এই এমপি সাহেবও ঢাকায় থাকেন। ঘটনাক্রমে আমার বাড়ি এই নির্বাচনী এলাকায়। এমপি হওয়ার পর তাঁরা উচ্চমার্গে চলে যান। সরাসরি জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক রাখেন না। তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হলে মাধ্যম ধরতে হয়। আমাদের এই এমপি সাহেবেরও মাধ্যম ছিল। এমপি সাহেবেরই ভাগ্নে হচ্ছে তাঁর ডান হাত, বাঁ হাত। স্বাভাবিকভাবে ভাগ্নের দাপটও অনেক। একবার আমাদের বাড়ি নিয়ে একটি ছোট্ট ঝামেলায় এমপি সাহেবের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন ছিল। আমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে থাকি। কীর্তিমান ভাগ্নের খোঁজ আমি রাখি না। ভাবলাম ঢাকাতেই আমি দেখা করব। এমপি সাহেবের বাসার ফোন নম্বর জোগাড় করলাম। পাঁচ-ছয় দিন ধরে অনেকবার ফোন করলাম। ওপাশ থেকে একই কথা, তিনি বাড়িতে নেই। তাঁদের দেওয়া সময়মতো কয়েকবার ফোন করেছি। উত্তর একই। অগত্যা ভালোভাবে নিজ পরিচয় দিয়ে অনুরোধ করলাম, এমপি সাহেব এলে একটু জানাবেন—আমি ফোনে কথা বলব। আর যদি দয়া করে সময় দেন, তবে এসে কথা বলব। কিন্তু এমপি সাহেবের নির্বাচনী এলাকার সাধারণ জনগণের একজন আমি সেই সুযোগটুকু পাইনি। অনেকে বললেন, আমি তরিকা ভুল করেছি। ভাগ্নের হাত না ধরে মহান জননেতার দেখা পাওয়া সম্ভব নয়।

এবার সপ্তাহ দুই আগের কথা। একই নির্বাচনী এলাকার ভিন্ন এমপি। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে পছন্দ করি। আলাপ-পরিচয়ও আছে। শিক্ষা বিস্তারসহ তাঁর জনকল্যাণমূলক কাজে আমি মুগ্ধ। নারায়ণগঞ্জে বসবাস করা আমার এক বয়োবৃদ্ধ ভাই একটি সংকটে পড়েছেন। তাঁর ধারণা, এমপি সাহেব হস্তক্ষেপ করলে তিনি সুবিচার পাবেন। আমাকে অনুরোধ জানালেন, আমি যাতে এমপি সাহেবের সঙ্গে একবার তাঁর দেখা করার ব্যবস্থা করে দিই। বলা বাহুল্য এই এমপি সাহেবেরও একজন মাধ্যম আছেন। তাঁর সঙ্গে আমারও ব্যক্তিগত পরিচয় আছে। অগত্যা আমি ফোন করলাম এমপি সাহেবকেই। সদাশয় এমপি সাহেব বললেন, আমার ভাই যাতে ‘মাধ্যমে’র সঙ্গে কথা বলেন। তিনি দেখা করার ব্যবস্থা করে দেবেন। বিষয়টি সহজ করার জন্য আমি নিজে ‘মাধ্যম’ সাহেবকে ফোন করলাম। সব কিছু বুঝিয়ে বললাম। জানালাম আমার ভাই আপনাকে ফোন করলে আপনি যাতে বাদ বাকি ব্যবস্থা করে দেন। এর পর থেকে প্রতিদিনই আমার ভাইয়ের ফোন আমি পেতে থাকলাম। ‘মাধ্যম’ আজ না কাল বলে বয়স্ক মানুষটিকে ঘোরাতে থাকলেন দিনের পর দিন। শেষ দিকে এই গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমটি হতভাগ্য জনগণের একজন আমার ভাইয়ের ফোন ধরা বন্ধ করে দিলেন। ভাই বিরক্ত ও হতাশ হয়ে রণেভঙ্গ দিতে বাধ্য হলেন। আমি জানি না এমপি সাহেব এসব খোঁজ রাখেন কি না।

এমনি ব্যক্তিগত ও বন্ধুদের অভিজ্ঞতার অনেক সঞ্চয় আমার কাছে রয়েছে। কিন্তু কলামের জন্য বরাদ্দ শব্দসংখ্যার অনেকটাই পূর্ণ হয়ে গেছে এরই মধ্যে। অবশ্য বেশি বলার প্রয়োজন পড়বে না। আমি নিশ্চিত দেশজুড়ে জননেতাদের জনগণের নেতা না হতে পারা এ রকম ঘটনার অভিজ্ঞতা অনেকেরই আছে। এভাবেই বোধ হয় আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কেন্দ্রীয় নেতাদের কথাই বলি। এই যে নিরাপদ সড়কের জন্য স্কুল-কলেজের বাচ্চাদের আন্দোলন হলো। সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ল। বাচ্চাদের সঙ্গে বাচ্চার মা-বাবারাও পথে নামল। নানা অংশ থেকে সমর্থনও জানানো হলো। কিন্তু ক্ষমতাধররা শুধু ষড়যন্ত্র আর গুজবের কাহিনিই শোনালেন। যদি এসবের ভিত্তি থাকে তো তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা সরকার তার পদ্ধতি মতো নিক। কিন্তু এই যে সাধারণ জনগণের বিরাট অংশ পথে নামল, তাদের সেন্টিমেন্টের কোনো মূল্য দেওয়া হলো না। তাহলে গণ-আস্থায় কি করে থাকবেন আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব? এ পর্যন্ত সরকারে আসা সব রাজনৈতিক দলের বেশির ভাগ ‘জননেতা’ই নির্বাচনী দামামা বাজার আগ পর্যন্ত জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতেই পছন্দ করেন। অথবা বলা যায় কর্মী-সমর্থকদের বলয়ের ভেতর থাকতে গিয়ে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। বেলা শেষে এসবের প্রতিক্রিয়া যে মারাত্মক হয় তা দাপট এবং দম্ভের কারণে প্রায়ই বুঝতে চান না। জনগণের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান না রাখতে পারলে কি জনগণের নেতা হওয়া সম্ভব?

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

shahnawaz7b@gmail.com



মন্তব্য