kalerkantho


বিশেষ সাক্ষাৎকার ► কাজী জাফর উল্যাহ

২০০ আসন চিহ্নিত করে জয়ের জোরালো চেষ্টা করব

১৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



২০০ আসন চিহ্নিত করে জয়ের জোরালো চেষ্টা করব

২০০২ সাল থেকে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ। তিনি দলটির নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ডের প্রভাবশালী একজন সদস্য। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত কাজী জাফর উল্যাহ প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি কথা বলেছেন আগামী জাতীয় নির্বাচন এবং এর আগে ছয়টি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মনোনয়ন প্রস্তুতি, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, বিতর্কিতদের বাদ পড়া ও নতুনদের মনোনয়ন সম্ভাবনা প্রসঙ্গে। কথা বলেছেন অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের সম্ভাবনা নিয়েও। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তৈমুর ফারুক তুষার

 

 

 

কালের কণ্ঠ : একাদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন এলাকায় দলীয় কোন্দল মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। দল থেকে সাময়িক বহিষ্কারের ঘটনাও ঘটেছে। তৃণমূলে এমন কোন্দল নিয়ে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে জয়লাভ সম্ভব হবে মনে করেন?

কাজী জাফর উল্যাহ : জটিল প্রশ্ন, উত্তরও সহজ হবে না। কারণ আওয়ামী লীগ অনেক বড় দল। প্রতিটা জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন, ওয়ার্ডে আমাদের সংগঠন আছে। এটা স্বাভাবিক যে পরপর দুইবার ক্ষমতায় আসার কারণে নেতাকর্মীদেরও প্রত্যাশা অনেকটা বেড়ে গেছে। আরেকটি দিক নিশ্চয়ই আপনাদের খেয়ালে আছে, বিগত প্রায় ১০ বছরে আমাদের অর্থনীতি অনেক চাঙ্গা হয়েছে। তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদ থেকে আমরা এখন নিজেদের অর্থায়নে যথাসময়ে পদ্মা সেতু তৈরিতে সফল হচ্ছি। এখন বিদেশে অনেক কর্মী যাচ্ছে। তারা দেশে যে টাকা পাঠায়, তা দিয়ে আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতির বেশ পরিবর্তন হয়েছে। মানুষের হাতে টাকা চলে আসায়, সুযোগ-সুবিধা বেশি চলে আসায় মানুষ এখন সময় পাচ্ছে রাজনীতিতে বেশি সময় দেওয়ার। আগে যারা হেঁটে পার্শ্ববর্তী বাজারে যেত তারা এখন মোটরসাইকেল কিংবা গাড়ি করে সেখানে যায়। ফলে তারা ভাবে, আমি এখন এমপি হব, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হব। এ জন্য তৃণমূলের রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ছে।

আপনি সঠিক প্রশ্নটিই চিহ্নিত করেছেন। সবাই মনে করছে, আওয়ামী লীগ যেহেতু ক্ষমতাসীন দল, সেহেতু আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেলে নির্বাচনে বিজয়ের সম্ভাবনা বেশি। সে কারণেই মনোনয়নপ্রত্যাশীরা দলের ভেতরে খুব চাপাচাপি শুরু করে দিয়েছেন। দলীয় কোন্দলটা কিন্তু অন্য কোনো বিরোধের কারণে নয়। জমিজমা দখল করেছে বা অন্য কিছু নয়। কোন্দলটা হলো রাজনীতিকে কেন্দ্র করে। কে কোন স্থানে যাবেন সেটা নিয়ে কোন্দল। যিনি ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার আছেন তিনি চেয়ারম্যান হতে চান, যিনি ইউনিয়ন পরিষদের কমিটিতে আছেন তিনি থানা কমিটিতে আসতে চান।

আপনারা জানেন, আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময় কঠিন সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। তিনি নির্দেশনা দিয়েছিলেন, নির্বাচনে যারা দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ আমাদের দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা ছিল। আমাদের দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ অনেক নেতাই সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলেছিলেন। নেতাকর্মীদের আশা ছিল, কেন্দ্রীয় নেতাদের এমন শক্ত অবস্থানের ফলে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ঠিক থাকবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, নেত্রীর নির্দেশনার পরও, আমাদের সাধারণ সম্পাদকসহ আমরা যারা কেন্দ্রীয় নেতা আছি তাদের বক্তব্যের পরও সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

 

কালের কণ্ঠ : আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনের আগে যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, পরে তাদের প্রায় সবাইকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়।

কাজী জাফর উল্যাহ : সেটাই বলছি। বাস্তবে কারো বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি। অ্যাকশন না হওয়ার কারণেই, বিশেষ করে যাদের টাকা-পয়সা হয়ে গেছে, তাদের মধ্যে একটা বিশ্বাস এসেছে, যেকোনোভাবেই হোক নেতাদের ম্যানেজ করে ফেলতে পারব। দেখি না এবার নির্বাচন করে। দল না বলেছে, মনোনয়ন পাইনি; কিন্তু আমার জনপ্রিয়তা বেশি, আমি হবই।

আমরা এ ব্যাপারে খুব কার্যকর সমাধান করতে পারিনি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ইউনিয়ন থেকে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ উপজেলাকে দিয়েছে, উপজেলা আবার জেলাকে দিয়েছে। জেলা হয়তো একটি কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে যে কেন আপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। বাস্তবে আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হলে কেন্দ্রীয় কমিটির অনুমোদন লাগে। সেটা খুব দীর্ঘ সময়ের প্রক্রিয়া।

আমরা চিন্তাভাবনা করছি, একাদশ নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগকে একটি কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তা না হলে আপনি যে প্রশ্নটা তুলেছেন, সেটা সঠিক যে আমাদের দলের মধ্যে কোন্দল অনেক বেড়ে যাবে। একটি আসনে যদি আমাদের পাঁচজন প্রার্থী হয়, অন্যদিকে বিএনপি-জামায়াত তো এক, তাদের যদি একজন প্রার্থী হয় তাহলে তাদের জেতার সম্ভাবনাটা বেশি থাকবে।

 

কালের কণ্ঠ : আগামী জাতীয় নির্বাচনে তিন ধাপে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মনোনয়নের কাজ করার কথা শোনা গিয়েছিল। প্রথম ধাপে নিশ্চিত জয়ের সম্ভাবনা আছে এমন ১০০, পরের ধাপে জয়ের ভালো সম্ভাবনা আছে এমন ১০০ এবং সর্বশেষ অবশিষ্ট ১০০ প্রার্থী বাছাই করার কথা। প্রার্থী মনোনয়নের এ প্রক্রিয়া এখন কোন অবস্থানে আছে? 

কাজী জাফর উল্যাহ : প্রার্থী মনোনয়নের এই প্রক্রিয়া কোনো অফিশিয়াল সিদ্ধান্ত নয়। এটি আন-অফিশিয়ালি করা হচ্ছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে যতদূর জানি, অনেক ক্ষেত্রেই নেত্রী (শেখ হাসিনা) এরই মধ্যে ক্লিয়ারেন্স দিয়ে দিয়েছেন। বর্তমানে যাঁরা মন্ত্রী-এমপি প্রথমে তাঁদের মধ্যে। যাঁদের আসনে ভালো ফল ছিল, যাঁদের আসন নিয়ে আমরা আশাবাদী, তাঁদের একটা সিগন্যাল দেওয়া হয়েছে। ১০০ না হলেও বেশ কিছু আসনে নেতাদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, তোমরা নির্বাচনের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ো।

 

কালের কণ্ঠ : সবুজসংকেত দেওয়া হয়েছে এমন আসনের সংখ্যা কত?

কাজী জাফর উল্যাহ : আনুমানিক ১০০ হবে। কথা ছিল, প্রথম ধাপের পর আরো ১০০ আসনে, যেগুলো আমাদের সম্ভাবনাময়, যেগুলোতে আমরা ফল ভালো করার আশা করি, সেই জায়গাগুলোতে একটা ক্লিয়ারেন্স দেওয়া হবে। আর শেষকালে বাকি যে আসনগুলো থাকবে, সেগুলো নিয়ে কাজ করা হবে। সেখানে আমাদের জোটে যাঁরা আছেন বা সেই সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট মাথায় রেখে আমাদের শেষ সিদ্ধান্ত হবে।

 

কালের কণ্ঠ : আপনি বলছেন, ২০০ আসনে জয়ের লক্ষ্যে জোরালো তৎপরতা চালাবে আওয়ামী লীগ। এই ২০০ আসনে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে কোন ধরনের প্রার্থী বা নতুন প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেবেন কি?

কাজী জাফর উল্যাহ : নতুন মুখ তো দেখা যাবেই। সব সময়ই থাকে। ৩০০ আসন যেহেতু, নতুন মুখ অবশ্যই থাকবে। তবে কতজন থাকবে তা মনোনয়ন তালিকা বের হলে না গুনে বলা যাবে না। তবে একটা ভালো সংখ্যায় নতুন মুখ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। যাঁরা ভালোভাবে ১০ বছর ধরে দলের জন্য কাজ করে আসছেন, বিগত নির্বাচনে যাঁদের মূল্যায়ন করা হয়নি তাঁদের অনেকের জন্য সুযোগ এসে যাবে।

আর প্রশ্নের প্রথম অংশে আপনি জানতে চেয়েছেন, কোন ধরনের প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেব। প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে একটিই ক্রাইটেরিয়া। সেটি হলো, যে মুহূর্তে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, সে সময় ওই প্রার্থীর জনপ্রিয়তা কতটুকু। নির্বাচনে জনপ্রিয়তা থাকতে হবে নিজের এলাকায়। ঢাকায় একজন যদি খুবই জনপ্রিয় হয় আর তাঁর আসন যদি হয় কুড়িগ্রাম, তাহলে তো চলবে না। কুড়িগ্রামের আসনে যাঁরা প্রার্থী তাঁদের মধ্যে কার জনপ্রিয়তা বেশি সেটাই আমরা বিবেচনা করব। প্রার্থী বাছাই করার তো আর কোনো পথ নেই। নির্বাচনের সময় কার কেমন জনপ্রিয়তা, জনগণ কাকে চাইছে—এসবই মুখ্য। জনগণ কিন্তু সব সময় একজনকে চায় না।

 

কালের কণ্ঠ : অনেক বিদ্রোহী প্রার্থীই তো জয়লাভ করেন। সর্বশেষ স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও অনেক বিদ্রোহী প্রার্থী জয় পেয়েছেন।

কাজী জাফর উল্যাহ : বিদ্রোহী প্রার্থী জেতেন খুব অল্প। আর স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও জাতীয় নির্বাচন ভিন্ন। সেখানে অনেক বিদ্রোহী প্রার্থী জয় পেয়েছেন। কারণ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অনেক স্থানীয় বিষয় ভূমিকা রাখে। দেখা যায়, খালের এক পাড়ের লোক অন্য পাড়ের লোককে ভোট দিতে চায় না।

তবে জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কিছু বিষয় আছে কমন। যেমন মানুষ ভালো প্রার্থীকে ভোট দিতে চায়; শিক্ষিত, সৎ ও পরিচ্ছন্ন ইমেজের প্রার্থী চায়। মাস্তান প্রার্থী চায় না। ফলে অনেক জায়গায় দেখা যাচ্ছে আমাদের পুরনো প্রার্থী, যাঁরা আগে বেশ কয়েকবার জিতেছেন, তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা মানুষের কাছে কমে যাচ্ছে। কারণ তাঁদের হয়তো তেমন শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই। আপনি যদি দেখেন, ঢাকা সিটি করপোরেশনে আগে যাঁরা কমিশনার হতেন তাঁদের বেশির ভাগের শিক্ষাগত যোগ্যতা ভালো ছিল না। এখন কিন্তু কাউন্সিলরদের বেশির ভাগই শিক্ষিত।

মানুষ এখন পরিচ্ছন্ন ও সততা আছে এমন প্রার্থী চায়। মানুষ চায় যাঁদের কাছে গেলে ভালো রেসপন্স পাবে, টাকা ছাড়া সুপারিশ পাবে তাঁদের ভোট দিতে। এখন তো অনেকে স্কুলের দপ্তরি নিয়োগ দিতে গেলেও অনেক টাকা নেয়। এটা মানুষ কিন্তু দেখে এবং মনে রাখে। চোরের ১০ দিন গৃহস্থের এক দিন। পাবলিক কিন্তু এসব দুর্নীতিবাজকে ভোট দেয় না।

 

কালের কণ্ঠ : আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য রয়েছেন যাঁরা নানা কারণে এরই মধ্যে বিতর্কিত হয়ে পড়েছেন। এসব সংসদ সদস্য কি আবারও দলের মনোনয়ন পাবেন?

কাজী জাফর উল্যাহ : আমার মনে হয়, যারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, যারা বিতর্কিত, যারা হত্যা-খুনের সঙ্গে জড়িত বা মামলার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে তাদের এবার মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা কম থাকবে। যাদের কাছে গেলে টাকা ছাড়া সুপারিশ মেলে না তাদের তো মানুষ ভোট দেবে না। এ কারণে যারা বিতর্কিত হয়ে গেছে তাদের আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম থাকবে।

 

কালের কণ্ঠ : আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন জরিপে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতার স্থান পেয়েছেন। কিন্তু সে তুলনায় দল হিসেবে আওয়ামী লীগ অতটা জনপ্রিয় নয়। এমন পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তার ওপর ভর করে আগামী নির্বাচনে জয়লাভ সম্ভব হবে বলে মনে করেন?

কাজী জাফর উল্যাহ : শুধু নেত্রীর জনপ্রিয়তার ওপর ভর করে নির্বাচন হবে, এটি ঠিক নয়। আমাদের দলের এমন কোনো লক্ষ্যও নেই যে নেত্রী জনপ্রিয় আর আমরা তাঁর শাড়ির আঁচল ধরে পার হব। তবে এটা সত্য, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা এখন অনেক ভালো। সাধারণ মানুষ যারা মা, মাটির সঙ্গে সম্পর্কিত তারা কিন্তু শেখ হাসিনার সঙ্গে একটি আত্মিক বন্ধন খুঁজে পায়। নেত্রীর প্রতি সাধারণ মানুষ সন্তুষ্ট। শেখ হাসিনা যেভাবে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন, তাঁর যে সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা এর লেভেলটা অনেক উঁচু। আমাদের মতো সাধারণ যাঁরা নেতা আছেন তাঁদের পক্ষে এই জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করা সম্ভব নয়। এটি বাস্তব চিন্তাও নয়। আগামী এক বছরে যদি আমরা দল হিসেবে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে পারি, যদি জনগণের সামনে আমাদের দলের ছবিটা আরেকটু উন্নত করতে পারি তাহলে নির্বাচনে দলের প্রার্থী হিসেবে আমাদের ভালো করার সম্ভাবনা বেশি।

 

কালের কণ্ঠ : কয়েক দিন পরই রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন। কিছুদিনের মধ্যেই আরো পাঁচটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। গতবার পাঁচটি সিটিতেই আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা পরাজিত হন। গত পাঁচ বছরে এসব সিটি করপোরেশন এলাকায় জনসমর্থন বাড়াতে আপনারা কী কী উদ্যোগ নিয়েছেন?

কাজী জাফর উল্যাহ : রংপুরে আমরা আগের মেয়রকেই প্রার্থী করেছি। আমি মনে করি, তাঁর জয়ের সম্ভাবনা ভালো। কিন্তু আপনি যদি প্রশ্ন করেন, আপনি কি নিশ্চিত? আমি বলব, না। কারণ এবার আমরা সেখানে দেখতে পাচ্ছি জাতীয় পার্টি ও বিএনপি দুই দলই তাদের প্রার্থী নিয়ে মাঠে আছে। এটা একটা টেস্ট কেস আমাদের জন্য। আমরা অনেক উন্নয়ন করেছি। শেখ হাসিনা ব্যক্তিগতভাবে সাধারণ মানুষের পাশে থেকে কাজ করছেন। এটার কতটুকু ফল পাওয়া যায় নির্বাচনে, সেটা আমরা খেয়াল করব।

গতবার পাঁচটি সিটি করপোরেশন থেকে আমরা একটা জিনিস বুঝতে পেরেছি, উন্নয়নে ভোট আসে না। উন্নয়নের বিষয়টা এমন যে যখন রাস্তাঘাট, মসজিদ পাকা হয় তখন মানুষ কয়েক দিন মনে রাখে, এরপরই ভুলে যায়। মানুষ এমন একজন প্রার্থীকে ভোট দিতে চায়, যিনি সুখে-দুঃখে তাদের পাশে থাকবেন। ভোটে আজকাল প্রার্থীর ইমেজ একটা বড় ফ্যাক্টর হয়ে গেছে। সে কারণে পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফলাফল আমাদের জন্য একটা বড় ধাক্কা ছিল। সেখান থেকে শেখ হাসিনা অনেক কষ্ট করে, অনেক খেটে আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর একটা সুযোগ করে দিয়েছিলেন জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভ করে। ওই নির্বাচনের পর এমন একটা নেতিবাচক প্রচারণা চালানো হয়েছিল যে আমরা হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। সে জন্য আমরা এবার খুবই সতর্ক।

 

কালের কণ্ঠ : আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপিকে আগামী নির্বাচনে আনার ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে অনীহার কথা জানিয়েছেন। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় অনেক নেতাও একই ধরনের মত জানাচ্ছেন। আমরা কি বিএনপির অংশগ্রহণ ছাড়া আরেকটি নির্বাচনের পথে এগোচ্ছি?

কাজী জাফর উল্যাহ : না, কোনোমতেই না। আগামী নির্বাচন সব দলের অংশগ্রহণেই হবে। এটা এ মুহূর্তে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর লক্ষ্য। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর দিক থেকে আমাদের কাছে নির্দেশনা স্পষ্ট—আগামী নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও ১০০ ভাগ শান্তিপূর্ণ হতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরপর দুইবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, আমাদের দলকে ক্ষমতায় এনেছেন। তাঁর কাছে এখন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার থেকেও বড় হলো, এ দেশে গণতন্ত্রকে একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। গণতন্ত্রকে আরো শক্ত ও মজবুত করতে হবে। কারণ গণতন্ত্র যদি মজবুত না হয়, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে যদি শক্তিশালী করতে না পারি তাহলে আমাদের অর্থনৈতিক উন্নতিই বলেন আর যাই বলেন, এগুলোর কোনো কিছুই আমরা ধরে রাখতে পারব না। ফলে আমাদের কাছে এখন সবচেয়ে অগ্রাধিকার হলো গণতন্ত্রকে মজবুত করা। আমাদের একটা কালচার বদলাতে হবে। সেটা হলো, ক্ষমতায় থাকতেই হবে; এই কালচার থেকে বের হয়ে আসতে হবে। যেই দল বা যেই প্রার্থীকে পাবলিক চায় তাদেরই নির্বাচিত হওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।  

 

কালের কণ্ঠ : খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে চলমান একাধিক মামলার বিচারকাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আদালতে যদি খালেদা জিয়া দোষী সাব্যস্ত হন, এর মধ্য দিয়ে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পরিবেশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে কি?

কাজী জাফর উল্যাহ : আইন তার নিজস্ব গতিতে চলছে। মামলাগুলো এই সরকারের দেওয়াও নয়। সেখানে সরকার কোনো হস্তক্ষেপও করেনি। সুতরাং এখানে সরকারের দিকে কোনো ইঙ্গিত করা গ্রহণযোগ্য নয়। বরং সরকার হস্তক্ষেপ করলে এই মামলা অনেক আগেই শেষ হয়ে যেত। বছরের পর বছর ধরে চলত না। আর এগুলো তো এখন নিম্ন আদালতে চলমান মামলা। সেখানে পক্ষে-বিপক্ষে যে রায়ই হোক না কেন, সুযোগ আছে আপিল করার। এই আদালতের রায় মানেই তো নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য হয়ে যাওয়া নয়। 

 

কালের কণ্ঠ : আওয়ামী লীগ সভাপতিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা বারবার বলছেন, আগামী নির্বাচনে বিএনপি অবশ্যই অংশ নেবে। আপনাদের কেন মনে হচ্ছে, বিএনপি নির্বাচনে আসবেই? 

কাজী জাফর উল্যাহ : কারণ বিএনপি তো সংসদীয় রাজনীতির একটি দল। এ ব্যবস্থায় একটি রাজনৈতিক দলের ভোটে অংশগ্রহণ ছাড়া ক্ষমতায় যাওয়ার কোনো পথ নেই। আর তারা ১৩ বছর ক্ষমতার বাইরে। একটা দলকে ধরে রাখতে হলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ক্ষমতার অংশ হতে হয়। এত দিন ক্ষমতার বাইরে থাকলে একটি দলকে ধরে রাখা কঠিন। এর মধ্যেই তো আমরা দেখতে পাচ্ছি, বিএনপির অনেক নেতাকর্মী আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন আওয়ামী লীগে যোগদানের জন্য। আমরা মনে করি, একটি রাজনৈতিক দল যদি কার্যকরভাবে রাজনীতিতে অংশ নিতে চায় তাহলে অবশ্যই নির্বাচনে অংশ নিতে হবে।

 

কালের কণ্ঠ : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

কাজী জাফর উল্যাহ : আপনাকেও ধন্যবাদ।


মন্তব্য