kalerkantho


কথা চালাচালির রাজনীতি

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



কথা চালাচালির রাজনীতি

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি আছে এখনো প্রায় দুই বছর। অথচ গেল কয়েক মাসে দেশের রাজনীতিতে প্রধান দুটি দল তথা আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে আগামী নির্বাচন নিয়ে বাগ্যুদ্ধ চলছেই।

বিশেষত, বিএনপি এখনো মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারেনি, দলের মহাসচিব, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিবসহ বেশ কয়েকজন নেতা আগামী নির্বাচন নিয়ে প্রতিদিনই বেশ কিছু বক্তব্য দিচ্ছেন, যার প্রত্যুত্তর দিচ্ছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, যুগ্ম সম্পাদক ও প্রচার সম্পাদক। বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী প্রায় প্রতিদিনই দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন ডেকে নানা ধরনের অভিযোগ উত্থাপন করে চলেছেন। সরকারের সব ‘ষড়যন্ত্রের’ (তাঁর ভাষায়) দাঁত ভাঙা জবাব বিএনপি দেবে—এমন কথাও শোনাচ্ছেন। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামও আগামী নির্বাচন নিয়ে নানা ষড়যন্ত্রের অভিযোগ করেই চলেছেন। বিশেষত, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আদালতে শুনানি চলা মামলাকে দেখছেন খালেদা জিয়াকে নির্বাচনে অযোগ্য করার সরকারি নীলনকশা হিসেবে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিএনপি ঘরে বসে থাকবে না বলেও তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করছেন। বিএনপির মহাসচিবসহ প্রায় সব নেতাই বেগম জিয়া ছাড়া নির্বাচনে বিএনপি যাবে না, দেশে নির্বাচন হতে দেবে না বলেও হুমকি দিচ্ছেন। আওয়ামী লীগ নেতারা এসব অভিযোগের জবাব দিচ্ছেন, বলছেন, আগামী নির্বাচনে না এলে বিএনপির অস্তিত্ব সংকটে পড়বে, মামলা চলছে আদালতে, রায় দেবেন আদালত, কী রায় আদালত দেবেন তা সরকার বলবে কিভাবে? রায়ে খালেদা জিয়া নির্দোষ প্রমাণিত হলে তাঁকে নির্বাচন করতে বাধা দেবে কেন সরকার ইত্যাদি। উভয় দলের নেতারা আগামী নির্বাচন নিয়ে যেসব কথা চালাচালি করছেন—তা মিডিয়ার প্রতিদিনের আহার হিসেবেই কাজ করছে, ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলো সংবাদগুলোর মূল অংশ শোনাচ্ছে, শ্রোতা-দর্শকরা শুনছে, জানছে। প্রিন্ট মিডিয়ায় কখনো বড় শিরোনামে সংবাদ হিসেবে সেসব পরিবেশিত হয়, কখনো ছোট আকারে ছাপা হয়।

দেশের মানুষ কতটা এসব কথা চালাচালির বিষয়বস্তু নিয়ে আগের মতো আগ্রহ দেখায় কিংবা চায়ের টেবিলে বা কর্মস্থলে আলোচনা-সমালোচনায় অংশ নেয় অথবা মিডিয়ার ভাষায় ও আলোচনার ঝড় বইয়ে দেয়—তা দেখার বিষয়, জানারও বিষয়। আমরা যারা চারপাশের মানুষজনকে চলতে-ফিরতে দেখি, কথা বলতে শুনি, আমাদের কাছে এখন তেমন কোনো পরিস্থিতি সচরাচর দৃশ্যমান হয় না। আসলে দেশে রাজনীতি নিয়ে এখন মানুষকে আগের মতো ‘নিজের খেয়ে বনের মোষ’ তাড়াতে দেখি না। বেশির ভাগ মানুষই ব্যস্ত, অনেকেই যার যার কাজ নিয়ে এতটা ব্যস্ত থাকে যে রাজনীতির খবর খুব বেশি রাখে না, রাখলেও কান দিয়ে শোনে, আবার নিজের মধ্যেই চাপা দিয়ে রেখে দেয়। কর্মস্থলে, রাস্তাঘাট বা দোকান-বাজারে তেমন কোনো কথা বলে না। না বলার কারণ একেকজনের কাছে একেক রকমের। অনেকেই মনে করে, এখন থেকে এক বছর পর দেশে নির্বাচন নিয়ে দলগুলোর মধ্যে যে পরিস্থিতি তৈরি হবে—তা এত আগে বোঝার উপায় কী? এ যেন ‘মাঘ মাসে বর্ষার গীত গাওয়া’। নির্বাচন নিয়ে এখনই মাতামাতি ও হুমকি-ধমকি দেওয়ার কিছু নেই। রাজনৈতিক দলের নেতাদের এসব কথার অন্তর্নিহিত অর্থ সাধারণ মানুষের জানার সুযোগ নেই। তা ছাড়া দলগুলোর তেমন কোনো বৈঠক হয় না, নীতিনির্ধারণী ফোরামও বসে না, দেশের রাজনীতি নিয়ে তেমন কোনো সিরিয়াস আলোচনা হয় না, দেশ ও জাতির জন্য প্রয়োজনীয় কোনো সিদ্ধান্ত নেয় না। যেখানে দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামই বসে না, সেখানে দলের সিদ্ধান্ত বা চিন্তাভাবনার কথা দলের কোনো কোনো নেতা প্রতিদিন অবলীলায় বলছেন কিভাবে? সাধারণত দলের কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সভা শেষে সংবাদ সম্মেলন ডেকে জানানো হয়, যা দেশবাসী মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পারে। এটাই রেওয়াজ। কিন্তু তেমন কোনো বৈঠকের খবর নেই, অথচ বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব প্রতিদিন সংবাদ সমাবেশ ডেকে লিখিত ভাষণ পাঠ করেন, লিখিত বক্তব্যই কি দলের সিদ্ধান্ত, নাকি তাঁর ‘স্বরচিত বক্তব্য’? অবস্থাদৃষ্টে তো মনে হয়, এসব তাঁরই স্বরচিত ভাষণ। কেননা এসব বক্তব্যের কোনো কার্যকর প্রভাব বা কর্মসূচি দলের মধ্যে নেই। অন্যদিকে প্রেস ক্লাব বা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে কোনো আলোচনায় এ দল-ও দলের নেতারা যা যা বলেন, তা-ও অনেকটাই ‘রাজনৈতিক বক্তব্য’ হিসেবে শোনান, কেউ কেউ সেভাবেই অভিহিতও করে থাকেন। প্রশ্ন হচ্ছে, ‘রাজনৈতিক বক্তব্য’ মানে কী? যার কোনো গভীর অর্থ নেই, তা-ই কি রাজনৈতিক বক্তব্য বলে ধরে নিতে হবে!

বড় বড় দলের বড় নেতারা কথা বলবেন, দেশের সব মিডিয়ায় তা নিয়মিত প্রচারিত হবে, অথচ এর কোনো প্রভাব থাকবে না, গুরুত্ব থাকবে না, কথার কথা হিসেবে নিতে হবে—এমন চর্চা মোটেও সমাজসচেতনতা গঠন, রাজনৈতিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ জানা ও বোঝার জন্য সহায়ক হবে না তা কী করে হয়? দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা গণতন্ত্রের নামে এমনই একটা অবস্থানে বসবাস করছি, যখন অবাধ স্বাধীনতার নামে যে যা খুশি তা বলছেন, আমরা শুনছি, ধরে নিচ্ছি এর মধ্যে অসময়ের কথাই বেশি, গুরুত্বপূর্ণ কথা বা সিদ্ধান্তের প্রমাণ পাওয়া বেশ কঠিন। এর ফল কতটা নেতিবাচক হচ্ছে তার নজির হচ্ছে, নেতারা এখন প্রতিদিন এত কথা বলছেন, কথার চালাচালি করছেন; কিন্তু বেশির ভাগ মানুষই এসব শুনছে না, শুনলেও কানে নিচ্ছে না, বাসাবাড়িতে বেশির ভাগই ভারতীয় সিরিয়ালে বুঁদ হয়ে থাকার সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। বেশির ভাগ টিভি চ্যানেল যেসব টক শোর আয়োজন করছে গভীর রাতে, সেগুলো দেখার দর্শক সংখ্যাও কমে আসছে, গভীর বিশ্লেষণাত্মক আলোচনার প্রতি আগ্রহ দর্শকরা সে রকম আলোচনা খুঁজে দেখার চেষ্টা করে, কিছু পেলে শোনে, না পেলে ঘুমিয়ে পড়ে। একটা নিস্পৃহতা রাজনীতির প্রতি, রাজনীতিবিদদের কথাবার্তার প্রতি দেশে তৈরি হয়েছে, তরুণদের বড় অংশই রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, সুবিধাবাদী, অর্ধশিক্ষিত, সুযোগসন্ধানীরা বড় দলগুলোতে পদ-পদবি বাগিয়ে নিয়ে ঠেলাঠেলি, ধাক্কাধাক্কি করছে, আদর্শের বালাই নেই, যুক্তিতর্কের  মাধ্যমে দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ গড়ার প্রয়োজনীয় ও জরুরি করণীয় নির্ধারণের কোনো উদ্যোগ নেই। কোনো দলেই এমনকি গ্রাম বা ইউনিয়ন পর্যায়েও কোনো সভা নেই, কর্মসূচি নেই, জনসম্পৃক্ত কোনো কার্যক্রম নেই, দলের আদর্শ-উদ্দেশ্য নিয়ে কোনো সেমিনার-সিম্পোজিয়াম নেই, প্রশিক্ষণ শব্দটি রাজনৈতিক দল থেকে অনেক আগেই উঠে গেছে। বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সভাগুলোতে যেসব আলোচনা হয় সেগুলো থেকেও দেশের রাজনীতির গতি-প্রকৃতির কোনো বিশ্লেষণ উঠে আসে না, বরং নিজ দলের দুর্বলতাকে আড়াল করে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কিছু পুরনো অভিযোগ নতুনভাবে তোলার মাধ্যমে করতালি পাওয়ার ব্যবস্থাই দেখি। অথচ একটি রাজনৈতিক দল হচ্ছে আধুনিক রাষ্ট্র ও রাজনীতির একটি প্রতিষ্ঠান, যা দেশ ও জাতিকে পথ দেখাবে, করণীয় নির্ধারণে প্রস্তুত করবে। আমরা কি সে ধরনের কোনো নজির দেশের রাজনীতিতে দেখতে পাই?

দলগুলো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেদের তৈরি না করে যেভাবে চলছে তাতে আদর্শ প্রতিষ্ঠার প্রকৃত রাজনীতির চর্চা মোটেও হতে পারছে না, দলের নেতাকর্মীরা দলীয় রাজনীতির আদর্শকে ধারণ ও বহন করার জন্য যোগ্য হয়ে উঠতে পারছে না। অন্য দলের বা সমগ্র রাজনীতির চুলচেরা বিশ্লেষণ জানা বেশ দূরের বিষয়। গলাবাজি আধুনিক যুগের রাজনীতির অংশ হতে পারে না মোটেও। আধুনিক যুগের রাজনীতিতে দেশের আর্থ-সামাজিক, শিক্ষা-সংস্কৃতি, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও বিশ্বরাজনীতির বাস্তবতার শিক্ষা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা থাকতে হয়। আমাদের দেশে একসময় রাজনীতি বেশ প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রতিষ্ঠা করার জন্য একদল তরুণ নিজেদের উৎসর্গ করেছেন। তাঁদের ব্যক্তিজীবন ও সংসারকে তাঁরা উপেক্ষা করেছেন, আধুনিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় তাঁরা জীবন উৎসর্গও করেছেন। বঙ্গবন্ধু, তাজউদ্দীন, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মওলানা ভাসানী, মণি সিংহ, কমরেড ফরহাদ, অধ্যাপক মোজাফফরসহ অনেকেই আমাদের রাজনীতির পথ প্রদর্শক। তাঁরা প্রত্যেকেই দেশ-বিদেশের রাজনীতির তত্ত্বগুলো জানার আগ্রহ থেকে বই পড়তেন, অন্যদের পঠনপাঠনে উদ্বুদ্ধ করতেন। সে কারণে রাজনৈতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠায় নেতা ও কর্মীদের মধ্যে আদর্শের চর্চা, লেখাপড়ার বিষয়গুলো বিশেষভাবে গুরুত্ব পেত।

১৯৭৫ সালের পর থেকে দেশে হঠাৎ করেই ‘নেতা আবির্ভাবের’ সূচনা হতে থাকে। আগে নেতা ও কর্মী রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে তৈরি হতো; কিন্তু ১৯৭৫ সালের পর থেকে ‘আবির্ভূত’ হয় বা ‘নাজিল’ হয়! রাজনীতিও সেভাবে নাজিল হতে থাকে। মেধাবী ও গড়ে ওঠা নেতাদের নাজিল হওয়ারা হত্যা করে। রাজনীতির মাঠ ও মসনদ দখল করলেন যাঁরা তাঁদের বেশির ভাগেরই তেমন কোনো বিদ্যাশিক্ষার প্রয়োজন পড়েনি। রাজনীতি তাঁদের কাছে কেনাবেচা ও গলাবাজির মাঠে পরিণত হয়েছে। সেই গলাবাজি থেকেই গালাগাল, যুক্তিহীন, অর্থহীন কথাবার্তা, দেশ ও জাতির মহৎ অর্জনকে বিসর্জন দেওয়া, খাটো করার প্রবণতা, ইতিহাস বিকৃতি, গণতন্ত্রের সংজ্ঞা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি, নির্বাচন নিয়ে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপানো ইত্যাদি করা ও দেখার বিষয়ে পরিণত হচ্ছে, শুনতে হচ্ছে। অথচ দেশটা একজন প্রকৃত রাজনীতিবিদের শাসনে আসার পর অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধির পথে দ্রুত বর্ধনশীল হয়ে উঠেছে। কিন্তু এর স্থায়িত্ব নিয়ে সন্দেহ দূরীভূত হয়নি। কেননা দেশের সমাজ, রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতিতে সাম্প্রদায়িকতা, জঙ্গিবাদ, পশ্চাত্পদতা, সংকীর্ণতা, কূপমণ্ডূকতা, মূর্খতা, সন্ত্রাস, হানাহানি ইত্যাদি সর্বগ্রাসী হয়ে উঠছে; রাষ্ট্রকে এরা রাজনৈতিকভাবে পেছনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, গণতন্ত্র নামক জ্ঞানতত্ত্বকে বুলিসর্বস্ব করে ফেলছে, প্রকৃত ও মেকির মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে দিয়েছে। এর সুবিধা নেবে সুবিধাবাদী, উগ্র, হঠকারী, সাম্প্রদায়িক ও জঙ্গিগোষ্ঠী। এ পরিস্থিতিতে মেধা, মনন, দেশপ্রেম চর্চার মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম দেশের রাজনীতিকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছে, পড়বে। জটিলতর হচ্ছে দেশ ও রাজনীতির ভবিষ্যৎ। এ বিষয়ে এখনই সতর্ক হতে হবে নতুবা পরে তেমন কিছু করার সুযোগ না-ও থাকতে পারে।

 

লেখক : অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

patwari54@yahoo.com


মন্তব্য