kalerkantho

দরজার ওপাশে

এখনো আদিম!

ইন্দোনেশিয়ার আদিম এক আদিবাসী দানি। এখনো পুরনো অনেক রীতি-নীতিই ধরে রেখেছে তারা। বিস্তারিত জানাচ্ছেন নাবীল অনুসূর্য

৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



এখনো আদিম!

রিচার্ড আর্চবল্ড। মার্কিন এই ধনকুবের পড়াশোনা করেছিলেন প্রাণিবিদ্যা নিয়ে। বিখ্যাত হয়ে আছেন নিউগিনি অঞ্চলে পরিচালিত তিন অভিযানের জন্য। প্রথমটি ১৯৩৩-৩৪ সালে, দ্বিতীয়টি ১৯৩৬-৩৭ সালে আর তৃতীয়টি ১৯৩৮-৩৯ সালে। তৃতীয় অভিযানটি চালিয়েছিলেন তখনকার ডাচ্ অধিকৃত নিউগিনিতে। এখন জায়গাটা ইন্দোনেশিয়ার অন্তর্ভুক্ত। এই অভিযানেই তিনি সেখানকার বালিয়েম ভ্যালি আবিষ্কার করেন। তিনি অবশ্য জায়গাটার নাম দিয়েছিলেন গ্র্যান্ড ভ্যালি। সেই সঙ্গে ওই অঞ্চলের আদিবাসীদেরও খোঁজ বের করেন।

অবশ্য আর্চবল্ডের অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল, ওই অঞ্চলে কী কী প্রাণী বাস করে তার খোঁজখবর বের করা। সে কাজ করতে গিয়েই বালিয়েম ভ্যালিতে বাস করা অজানা-অচেনা একদল আদিবাসীর খোঁজ বের করে ফেলেন তিনি। তাদের নাম দেওয়া হয় ‘দানি’। তবে আর্চবল্ড তো ছিলেন প্রাণীবিদ, আদিবাসীদের নিয়ে তাঁর তেমন আগ্রহ ছিল না। কাজেই দানিদের নিয়ে তেমন ঘাঁটাঘাঁটি করেননি। একই সঙ্গে উল্টোটাও সত্য। দানিদেরও আধুনিক জীবনযাপনের ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহ ছিল না। কাজেই তারাও থেকে গেছে নিজেদের মতো।

ব্যাপারটি আসলে এখনো সত্য। দানিরা আজও আধুনিক জীবনযাপনের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠেনি। ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তা থেকে সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার দূরত্বে তাদের বাস। উল্টো ধরে রেখেছে হাজার বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা ও পুরনো সব রীতি-নীতি। সম্প্রতি সেই গল্পই উঠে এসেছে জার্মান আলোকচিত্রী মার্কাস রথের ক্যামেরায়। বছর দেড়েক আগে তিনি গিয়েছিলেন বালিয়েম ভ্যালিতে, দানিদের গ্রামে। সেখানে দানিদের সঙ্গে কাটিয়েছেন পুরো একটি সপ্তাহ। ছবি তুলেছেন তাদের আচার-আচরণ, রীতি-নীতি আর সামাজিক প্রথার। এতে দানিদের আধুনিকতাবিবর্জিত সরল জীবনযাপন সম্পর্কে চমকপ্রদ সব তথ্য পাওয়া গেছে। এটা আবার অনেক পর্যটককেই আকর্ষণ করছে তাদের গাঁয়ে যেতে।

আমাদের পরিচিত আধুনিক সমাজের সঙ্গে দানিদের সমাজের অনেক পার্থক্য। সবচেয়ে বড় পার্থক্য, ওরা এখনো চূড়ান্ত গোত্রভিত্তিক জীবন যাপন করে। এমনকি এখনো পরিবারে বিভক্ত হয়ে আলাদা আলাদা বাসায়ও থাকে না। ওদের সব ছেলে এক বাসায় থাকে, সব মেয়ে আরেক বাসায়। কাপড়চোপড়ের ব্যাপারেও ভীষণ উদার। মানে ওদের মধ্যে এখনো খুব একটা কাপড় পরার বালাই নেই। তবে গায়ে কিছুই পরে না, তেমনটা নয়। মুখে রং মাখে। গায়ে পরে পশুপাখির চামড়া, পালক আর হাড়। দানি ছেলেরা পরে এক অদ্ভুত জামা, নাম ‘কোতেকা’। ওটাকে আসলে জামা না বলে কিম্ভূত আকৃতির অন্তর্বাস বলা উচিত। আর যোদ্ধাদের গলায় থাকে এক বিশেষ ধরনের মালা। প্রতিটি মালা একেকটি যুদ্ধজয় বা শত্রু হত্যার প্রতীক।

এই বৈশিষ্ট্যগুলো সাধারণ মানুষ থেকে তাদের আলাদা করেছে বটে, কিন্তু তাদের খ্যাতি মূলত তিনটি কারণে—আঙুল কাটা, শিকার-উৎসব আর একটা মামির জন্য। হ্যাঁ, আঙুল কাটা তাদের প্রথা বটে। তবে সেটি অন্যদের আঙুল নয়, নিজেদের আঙুল। আসলে এটি শুধু দানি মেয়েদের প্রথা। দানিদের মধ্যে কেউ মারা গেলে, তার পরিবারের নিকটবর্তী মেয়েরা এই প্রথামাফিক আঙুলের ডগা কেটে ফেলে। এর মাধ্যমে তারা তাদের কাছের মানুষদের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে। পাশাপাশি সেসব মৃত্যু যে তাদের জীবনে এক অপূরণীয় ক্ষতি, তারও এক প্রতীকী উপস্থাপন এই আঙুল কর্তন। এখন অবশ্য ইন্দোনেশিয়ার সরকার এই প্রথা নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। তাই এখন আর দানি মেয়েরা আঙুল কাটে না। শুধু বয়স্ক দানিদের হাতেই এই প্রথার সাক্ষ্য মেলে।

তারা এখনো শিকার-উৎসবটা করে। শিকার করা পশু তাদের কাছে সবচেয়ে দামি। কাজেই এটা নিয়ে উৎসব করবে—সেটাই স্বাভাবিক। তারা শুধু উৎসবই করে না, উৎসবমুখর পরিবেশে পশু রান্নাও করে। বাঁশের ছুরি দিয়ে শিকার করা পশু কেটে, তারপর তপ্ত পাথরের চুল্লিতে সেগুলো রান্না করে। এই শিকার উৎসবের নির্দিষ্ট দিন-তারিখ না থাকলেও তাদের আরেকটি উৎসব আছে একেবারে দিন-তারিখ বেঁধে দেওয়া। প্রতি আগস্টে তারা একটি নকল যুদ্ধের আয়োজন করে। যাকে বলে ‘যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা’। সেই নকল যুদ্ধে তাদের প্রতিপক্ষ সাজে দুই প্রতিবেশী আদিবাসীগোষ্ঠী—লানি ও ইয়ালি। দানিদের বিশ্বাস, এই ঐতিহ্যবাহী নকল যুদ্ধের উৎসবের মাধ্যমে পাপুয়া অঞ্চলের উর্বরতা বৃদ্ধি পায় ও সামগ্রিক মঙ্গল হয়।

দানিদের বিখ্যাত মমিটা প্রাচীন এক যোদ্ধার। ওদের দাবি, মমিটা প্রায় ৩৭০ বছরের পুরনো। সে যে ভীষণ শক্তিশালী আর সফল এক যোদ্ধা ছিল, তা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না। মমিটা দানিদের গ্রামের পুরুষদের ঘরে সংরক্ষিত আছে। ওটা তাদের কাছে ভীষণ গর্বের, ভীষণ অহংকারের। ওদের গ্রামে যে অতিথিই আসে, তাকেই তারা গর্বে বুক ফুলিয়ে ওই মমি দেখায়।

হ্যাঁ, ওদের গ্রামে অতিথিও প্রায়ই আসে। ওদের এই আদিম জীবনযাপন যে পর্যটকদের ভীষণ আকৃষ্ট করে! দানিরা কিন্তু ভীষণ অতিথিপরায়ণ। অবশ্য দেখে বা বর্ণনা শুনলে তেমনটা মনে হয় না বটে। তবে সত্যিটা হচ্ছে, যতক্ষণ ওদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা হয়, ততক্ষণ দানিরাও খুবই শান্তশিষ্ট আর ভদ্র। আর শিকার করা নিয়ে উৎসব করলে কী হবে, ওদের জীবনাচরণও কিন্তু খুবই শান্তিপ্রিয়। এমনকি এখনো ওরা জীবনধারণের জন্য মূলত চাষবাসের ওপরই নির্ভর করে। ইদানীং অবশ্য তাতে বাদ সাধছে কাছের খনিতে খনন আর ওই অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান পর্যটন শিল্প। এদিকে ইন্দোনেশিয়া সরকারও খুব চেষ্টা করছে ওদের আধুনিক ও ইন্দোনেশিয়ার আদর্শ নাগরিক করে তুলতে। তাতে অবশ্য ওরা থোড়াই পরোয়া করে। আধুনিক হতে ওদের বয়েই গেছে!



মন্তব্য