kalerkantho


রহস্যজট

র‌্যাকেট আর বল

শেখ আবদুল হাকিম

৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



র‌্যাকেট আর বল

অঙ্কন : মানব

সেদিন সকাল ১০টার দিকে নির্ভয় হাসান, কক্সবাজারের সেরা শিশু টেনিস খেলোয়াড় লব্ধ ডিটেকটিভ এজেন্সিতে ঢুকল। তার হাসি শুধু মুখের একপাশে দেখা  যাচ্ছে।

‘আমার কাছে খারাপ ও ভালো, দুই রকম খবর আছে।’ বলল সে।

‘প্রথমে ভালো খবর, প্লিজ!’ আবেদন  জানাল নিষ্ঠা।

‘আমি খানিক আগে টেনিস বলের একটা ক্যান  খুলেছি। ওগুলোর নম্বর আট।’

নিজের কথার ব্যাখ্যা দিল সে। প্রতিটি ক্যানে তিনটি করে বল থাকে। একই ক্যানের বলে একই নম্বর লেখা থাকে—অর্থাৎ প্রতিটি ক্যানের সব বলের নম্বর একই হবে—দুই, ছয় বা আট; সঙ্গে থাকে প্রস্তুতকারকের নাম।

‘আট হলো আমার লাকি নম্বর।’ বলল  নির্ভয়। ‘আট নম্বর বল নিয়ে খেলে আমি কোনো ম্যাচ হারিনি।’

‘আর খারাপ খবর?’ জিজ্ঞেস করল লব্ধ সৈকত।

‘আজ দুপুর ২টায় কুমার মুশফিকের সঙ্গে কক্সবাজার ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপের সেমিফাইনাল খেলব আমি। কুমার মুশফিক হলো সুমন মুশফিকের ছোট ভাই—আর সুমন মুশফিক বেঙ্গল টাইগারের সদস্য হতে যাচ্ছে।’

নির্ভয় হাসানের কথা শেষ হলো না, নিষ্ঠা বলল, ‘মাহি মুস্তাকের বেঙ্গল টাইগারস...?’

মাথা  ঝাঁকাল নির্ভয়। ‘হ্যাঁ, কারো নিন্দা  করা ঠিক নয়; কিন্তু...।’

‘তোমাকে ক্ষমা চাইতে হবে না।’ বলল নিষ্ঠা। ‘টাইগাররা খুব বাজে ধরনের ছেলে।’

প্যান্টের পকেট থেকে ১০ টাকার একটা নোট বের করে নিচু কাঠের বাক্সের মাথায় রাখল নির্ভয়। তারপর মুখ তুলে সৈকতকে বলল, ‘আমি তোমাদের সার্ভিস ভাড়া করতে চাই,  প্রতিযোগিতার ওপর একটু নজর রাখার জন্য।’ বলল সে।

‘তার মানে তুমি আশঙ্কা করছ, মাহি মুস্তাকের টাইগাররা ওখানে কোনো ধরনের গোলমাল পাকাতে পারে, এই তো?’

‘সাবধানের মার নেই ভেবে তোমাদের কাছে আসা আমার।’ আবেদনের সুরে বলল নির্ভয়।

‘ঠিক আছে,  চলো তাহলে যাওয়া যাক।’ বলল সৈকত।

তিনজন সাইকেলের প্যাডেল মেরে কক্সবাজার টেনিস ক্লাবের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ল। নির্ভয় সঙ্গে নিয়েছে দুটি টেনিস র‌্যাকেট, তোয়ালে, আর এক  ক্যান বল—ওগুলো সব  সাইকেলের  হ্যান্ডেলবার বাস্কেটে করে নিয়ে যাচ্ছে সে।

ক্লাবে পৌঁছে বাস্কেট থেকে দুটি র‌্যাকেট, তোয়ালে আর বলগুলো তুলে নিল নির্ভয়, তবে খালি ক্যানটা পেছনে ফেলে যাচ্ছে।

‘ক্যান সঙ্গে নিলে কপাল ফাটে।’ বলল সে। ‘গত বছর আমি মাত্র একটা ম্যাচ হেরেছিলাম, সেবার কোর্টে একটা ক্যান নিয়ে যাওয়ার কারণে।’

টুর্নামেন্ট কর্মকর্তারা প্রোশপের সামনে লম্বা টেবিল ফেলেছেন। সেটির সামনে ছেলে আর মেয়েরা লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে।

‘আমি যে হাজির হয়েছি, সেটা আমাকে রিপোর্ট করতে হবে।’ বলল নির্ভয়। ‘খানিক পর ফিরছি।’

পরবর্তী ১০ মিনিট দুই গোয়েন্দা নিজেরাই চারদিকে হেঁটে বেড়াল, দু-একবার থেমে এরই মধ্যে শুরু হওয়া দু-একটি খেলাও দেখল। নির্ভয় হাসান নাম লিখিয়েছে ১০ বছর বয়সী শিশুদের গ্রুপে।

‘ওই দেখো, মাহি মুস্তাকের সঙ্গে সুমন মুশফিক।’ হাত তুলে সৈকতকে দেখাল নিষ্ঠা।

সুমনের বয়স ১৩, থাকে নিষ্ঠাদের পাড়ায়। গোয়েন্দাদের দেখতে পেয়ে এগিয়ে এলো সে।

‘তুমি টেনিস ফ্যান নাকি?’ তাকে জিজ্ঞেস করল সৈকত।

‘আরে, কী বলো!’ উত্তর দিল সুমন মুশফিক। ‘টেনিসের ট-ও আমি বুঝি না। কাকে র‌্যাকেট বলে, কাকে কী বলে কিছুই আমি জানি না। আমি এখানে এসেছি মাহি মুস্তাকের সঙ্গে, সে আমাকে সেবাপ্রতিষ্ঠান বেঙ্গল টাইগার্সে নাম লেখাতে বলেছে।’

‘সেবাপ্রতিষ্ঠান?’ হাঁপিয়ে উঠল নিষ্ঠা। ‘ওদের একমাত্র সার্ভিস হলো সাইকেল আর মোটরবাইক নতুন করে রং করা, যেগুলো ওরা চুরি করে!’

‘মুস্তাক বলছিল, টাইগাররা অনেক ভালো ভালো কাজ করে।’ প্রতিবাদের সুরে বলল সুমন মুশফিক। ‘আজ তারা বিচারকদের সাহায্য করছে। মুস্তাক বুদ্ধি দিল, এখানে এসে নিজের চোখে সব যেন দেখি আমি।’

উত্তরে নিষ্ঠা কিছু বলার আগেই নির্ভয়কে হাঁপাতে হাঁপাতে ফিরে আসতে দেখা গেল।

‘কেউ একজন আমার র‌্যাকেট আর টেনিস বল চুরি করেছে!’ রুদ্ধশ্বাসে বলল সে।

তারপর দম ফিরে পেয়ে কী ঘটেছে, ওদের জানাল।

‘রিপোর্ট করার জন্য লাইনে দাঁড়ানোর আগে আমি আমার র‌্যাকেট দুটি, তোয়ালে, আর বলগুলো প্রোশপের কাউন্টারে রেখেছিলাম। রিপোর্ট করার কাজ সেরে ওখানে ফিরে দেখি আমার লাইট-ওয়েট, মানে হালকা র‌্যাকেটটা নেই, নেই বলগুলোও।’

‘কী সর্বনাশ!’ নিষ্ঠা উদ্বিগ্ন।

‘বলগুলো চুরি গেছে, সেটাকে আমি খুব বড় করে দেখছি না।’ বলল নির্ভয়। ‘কিন্তু ওই হালকা র‌্যাকেটটা দিয়েই আজকের ম্যাচ খেলব বলে ঠিক করেছি আমি। এখানকার কোর্ট শক্ত, আর তাই বলের গতিও বেশি। হাতে হালকা র‌্যাকেট থাকলে আমি খুব দ্রুত ব্যাকসুইং নিতে পারি।’

‘তোমার র‌্যাকেট যে চুরি করেছে, সে অনেক খবরই রাখে, নিশ্চয়ই টেনিস সম্পর্কেও অনেক কিছু জানে সে।’ বলল সৈকত।

‘এই ফাস্ট কোর্টে ভারী র‌্যাকেট নিয়ে খেলতে যাওয়া মানে আমাকে আমার টাইমিং বদলাতে হবে।’ বলল নির্ভয়। ‘আমাকে হয়তো কুমার মুশফিক হারিয়ে দেবে।’

‘ওই হালকা র‌্যাকেট যেভাবেই হোক খুঁজে বের করতে হবে।’ বলল নিষ্ঠা। ‘কিন্তু কথা হলো, খুঁজবটা কোথায়?’

‘চলো, প্রোশপ থেকে শুরু করা যাক।’ বলল সৈকত। ‘খেলাধুলার সব ধরনের জিনিস বিক্রি হয় ওখানে। চোর সঙ্গে র‌্যাকেট আর বল রেখে নিজের দিকে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ  করবে না।’

‘কুমার মুশফিক নেটে খুব ভালো খেলেছে।’ বলল নির্ভয়। ‘আজ যদি আমাকে হারায় সে, তোমরা দায়ী করতে পারো ওই চোরের দল টাইগারদের, যাদের কাজই সবার ক্ষতি করা!’

‘এটা তোমার অন্যায়।’ বলল সুমন মুশফিক। ‘টাইগাররা সবাই সততার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। মাহি মুস্তাক এ রকমই বলেছে।’

‘এসো, জানার চেষ্টা করি।’ বলল সৈকত।

প্রোশপের সামনে গিয়ে দেখা গেল, ক্রেতা আর দর্শকদের বেজায় ভিড় লেগে আছে। এক কোণে একটি ইস্পাতের বাক্স দেখতে পেল সৈকত। টেনিস বলে সেটি ভর্তি হয়ে আছে। ‘ওটা কী?’ নির্ভয়কে  জিজ্ঞেস করল সে।

‘ওগুলো ব্যবহার করেন টেনিস টিচার, যখন তিনি ট্রেনিং দেন।’ নির্ভয় উত্তর দিল। ‘বৃষ্টি হলে কিংবা টুর্নামেন্টের কারণে সব কোর্ট দখল হয়ে গেলে বাক্সটা এখানে রাখেন তিনি।’

‘আমার মনে হচ্ছে, তোমার টেনিস বলগুলো তুমি ওই বাক্সে পেতে পারো।’ বলল লব্ধ সৈকত। ‘তুমি একটু দেখবে, সুমন? ওগুলো আনকোরা নতুন, নম্বর আট।’

‘আর নম্বরগুলোর ওপর প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের নাম ছাপা আছে—উইলকিনস।’ বলল নির্ভয়।

প্র্যাকটিস বলের বাস্কেটে হাত ঢুকিয়ে খোঁজাখুঁজি করছে সুমন। ওদিকে হারানো র‌্যাকেটটা খুঁজে পেল সৈকত। দেয়ালে ঝুলছিল সেটি। আরো চারটে র‌্যাকেটের আড়ালে, যেগুলোয় নতুন স্ট্রিং বা তার বাঁধতে হবে।’

হঠাৎ বাস্কেট থেকে ‘উইলকিনস’ লেখা তিনটি বল বের করল সুমন মুশফিক, প্রতিটির গায়ে ইংরেজিতে ৮ লেখা। ‘এই তো, পেয়ে গেছি!’

‘এগুলোর মধ্যে দুটি আমার হতে পারে।’ বলল নির্ভয়। ‘কিন্তু তৃতীয় বলটা খুব বেশি পুরনো। আমারটা তো ব্যবহারই হয়নি।’

সুমনকে হতাশ দেখাল। আবার খুঁজতে লাগল সে।

‘চোর কিন্তু সুমনও হতে পারে।’ সৈকতকে ফিসফিস করে বলল নিষ্ঠা। ‘আমার এ কথা বলার কারণ হলো, কেউ যদি টাইগারদের দলে নাম লেখাতে চায়, মাহি মুস্তাক টেস্ট করে দেখে সে অসৎ কাজ করতে পারে কি না।’

‘তোমার কথার সুরে অনিশ্চয়তা রয়েছে।’ বলল সৈকত।

‘হতে পারে, নির্ভয় নিজেই নিজের র‌্যাকেট আর বল কোথাও লুকিয়ে রেখেছে।’ বলল নিষ্ঠা। ‘তাহলে কুমার মুশফিকের কাছে হেরে গেলে একটা অজুহাত দেখাতে পারবে সে। না, মানে আমার আসলে জানা নেই...’,

‘জানবে।’ বলল সৈকত—‘যদি তুমি থামো, তারপর চিন্তা করো।’

সৈকত কাকে সন্দেহ করেছে?



মন্তব্য