kalerkantho


অন্য রকম

গহিন বনের হিপো পয়েন্ট

তাহমিনা সানি   

১০ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



গহিন বনের হিপো পয়েন্ট

খুব সাবধানে পা টিপে টিপে হাঁটার পরও যেই না পায়ের নিচে শুকনো পাতা মুচ মুচ করে উঠল, অমনি ঝটপট করে ডানা ঝাপটে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাবে কিছু চমকে যাওয়া পাখি। এরপর আরো কিছুদূর এগোতেই আপনি নিজেও চমকে যাবেন! বনের ইয়া বড় হলদে বাবলাগাছের ডাল ছাড়িয়ে মাথা উঁচু করে থাকা একটি বিশাল টাওয়ার দেখে। দেখতে অনেকটা প্যাগোডা বা বৌদ্ধ মন্দিরের মতো। ১১৫ ফুট লম্বা আর ৫০ ফুট চওড়া। কেনিয়ার লেক নাভাশা ও লেক ওলোয়ডিয়েনের মধ্যবর্তী স্থান হিপো পয়েন্টে এই টাওয়ারটির অবস্থান।

হিপো পয়েন্ট হলো ব্যক্তিগত মালিকানাধীন একটি বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য। ৩৫০ প্রজাতিরও বেশি পাখিসহ অসংখ্য বন্য প্রাণীর বিচরণক্ষেত্র আফ্রিকার এই এলাকা। ব্যস্ত দুনিয়া থেকে একটু অবসর নিতে অতিথিরা চলে আসেন এই হিপো পয়েন্টে। প্রাকৃতিক পরিবেশ উপভোগের পাশাপাশি টাওয়ারটিতে রাত কাটানোটাও রোমাঞ্চকর। রাতের বেলা হায়েনা, জলহস্তী আর রাতজাগা পাখির ডাক শুনতে শুনতে অনেকটা সময় মন্ত্রমুগ্ধের মতো কাটিয়ে দিতে পারেন।

টাওয়ারটির আইডিয়া কেনিয়ান দম্পতি ডোদো আর রেইডের মস্তিষ্কপ্রসূত। তাঁরা চেয়েছিলেন, হিপো পয়েন্টে এমন একটি জায়গা থাকবে, যেখানে তাঁরা ছুটিছাঁটায় পরিবার নিয়ে আনন্দ করতে আসতে পারবেন। মাঝেমধ্যে কিছু অতিথি বা পর্যটকও এসে থাকতে পারবেন তাঁদের সঙ্গে। আর তাই প্রায় ৬০০ একর জায়গা কিনে এই অভয়ারণ্যটি গড়ে তোলেন। আর বানান ৯ তলা একটি দালান। ডোদোস ফলি নামে পরিচিত টাওয়ারটির নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৯৯৩ সালে। এই ৯ তলা দালানে আছে মোট চারটি ডাবল বেড এবং একটি সিঙ্গল বেডরুম। রাশিয়ান লিনেনের তুলতুলে বিছানা, চমত্কার কাঠের মেঝে, বাথটাবসহ সব ধরনের আরাম উপকরণের সুব্যবস্থা আছে এখানে। শুধু কি তা-ই? ডোদো আর রেইড মিলে টাওয়ারের একেবারে উঁচুতে বানিয়েছেন খোলা অবজারভেশন টাওয়ার। এখান থেকে যে কেউ বনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন দুই চোখ ভরে। এদিকে টাওয়ারে স্থান সংকুলান না হলে আপনি থাকতে পারেন হিপো পয়েন্টের ১৯৩২ মডেলের ম্যানর হাউসটিতে। অতিথিদের কথা ভেবে পুরনো ইংলিশ ম্যানর হাউসের নকশায় এই দালান তৈরি করা হয়। আটটি ডাবল রুম ও একটি সিঙ্গল রুম, কিচেনরুম, ডাইনিংরুম আছে এখানে। জানালার সামনে দাঁড়ালেই হয়তো দেখবেন, পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে কোনো জিরাফ কিংবা অ্যান্টিলোপ। নাইরোবি থেকে প্রাইভেট প্লেন বা হেলিকপ্টারে মাত্র ২৫ মিনিট লাগে হিপো পয়েন্টে পৌঁছতে। যাঁরা পাখি দেখতে ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য হিপো পয়েন্ট আদর্শ স্থান। ৩৫০ প্রজাতির পাখি তো আছেই, সেই সঙ্গে মাইগ্রেট করা বেশ কিছু অতিথি পাখিও যোগ দেয় এখানে। লেকের পানিতে চলে এদের সরব বিচরণ।

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৮৮০ মিটার উচ্চতায় লেক নাভাশা হলো কেনিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম স্বাদু পানির লেক। এটি ও লেক ওলোয়ডিয়েনের মধ্যবর্তী স্থানেই তৃণভোজী ও মাংসাশী প্রাণীদের বিচরণ। আর তাই হিপো পয়েন্টে ধীরগতিতে যেতে যেতে যে কেউ স্বাদ নিতে পারে এক অসাধারণ জঙ্গল অ্যাডভেঞ্চারের।

সারা দিন জল-জঙ্গলে রোমাঞ্চের স্বাদ নিতে নিতে আর ঘুরে ঘুরে পরিশ্রান্ত হয়ে পড়লে ডোদোর টাওয়ারে বিশ্রামের অভিজ্ঞতাও এখানে আসা অতিথিকে দেবে স্মরণীয় এক অনুভূতি। যুক্তরাষ্ট্রের ৪১তম প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডাব্লিউ বুশের নাতনি লরা বুশও এখানে এসে বলেন, ‘হিপো পয়েন্ট হলো আমার দেখা সেরা মন্ত্রমুগ্ধকর জায়গা।’ ডোদো দম্পতি দুটি শব্দে একে পরিচয় করিয়ে দেন—‘ম্যাজিক্যাল প্যারাডাইস’।


মন্তব্য