kalerkantho


দরজার ওপাশে

শহরের জনসংখ্যা এক

আমেরিকার এক শহরের জনসংখ্যা এক। অফিশিয়ালি এটি আমেরিকার সবচেয়ে ছোট শহরও বটে। বিস্তারিত জানাচ্ছেন নাবীল অনুসূর্য

১৯ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



শহরের জনসংখ্যা এক

‘ইন্টারস্টেট-৮০’ আমেরিকার দ্বিতীয় দীর্ঘতম ইন্টারস্টেট হাইওয়ে। আরো অনেক জায়গার মতো হাইওয়েটা চলে গেছে ওয়াইমিং অঙ্গরাজ্যের ভেতর দিয়েও।

সেখানেই লরেমি আর শায়ান শহর দুটির মাঝে অবস্থিত এই হাইওয়ের উচ্চতম শহর বিউফোর্ড। উঁচুতে অবস্থিত হলে কী হবে, শহরটি নিতান্তই ছোট্ট। এতই ছোট, এটিকে শহর কেন, ঠিক গ্রামও বলা যায় না। আয়তন মোটে ০.০৪ বর্গকিলোমিটার। তাতে থাকেন মোটে একজন! আর এই একজনের মার্কিন শহরের মালিক আবার কোনো মার্কিনি নন, ভিয়েতনামের ব্যবসায়ী নগুয়েন দিন ফ্যাম।

এই ফ্যাম মূলত একজন কফি ব্যবসায়ী। ভিয়েতনামে তিনি একটি বিশেষ ব্র্যান্ডের কফি উত্পাদন করেন। সেই কফি মার্কিন মুল্লুকে জনপ্রিয় করার উদ্দেশ্য নিয়েই তাঁর এই শহর কেনা। সে জন্য বিউফোর্ড কিনেই শহরটির নাম বদলে রাখেন ফিনদেলি টাউন বিউফোর্ড—তাঁর কফির ব্র্যান্ডের নামে।

তবে নামটা এখনো প্রস্তাবিত, কাগজে-কলমে শহরটির নাম আগেরটাই—বিউফোর্ড। এই বিউফোর্ড নামটা রাখা হয়েছিল মার্কিন গৃহযুদ্ধের এক বীর অফিসারের নামে—মেজর জেনারেল জন বিউফোর্ড। শহরটি গড়ে তোলাও হয়েছিল ঠিক গৃহযুদ্ধের পরপরই। ১৮৬১ সালে শুরু হয়ে মার্কিন গৃহযুদ্ধ শেষ হয়েছিল ১৮৬৫ সালে। আর ঠিক তার পরের বছর ১৮৬৬ সালে যাত্রা শুরু করে বিউফোর্ড। সে সময় চলছিল ট্রান্সকন্টিনেন্টাল রেল রোডের নির্মাণকাজ। আর এই কাজ দেখাশোনা করার জন্য একটি মিলিটারি আউটপোস্ট বানানো হয়। নাম দেওয়া হয় ফোর্ট স্যান্ডার্স। ওটাকে কেন্দ্র করে রেল রোড কম্পানির হাত ধরে জন্মলাভ করে বিউফোর্ড। শহরটির জনসংখ্যা তখন এমনকি দুই হাজার অব্দি পৌঁছেছিল।

পরে আউটপোস্টটা সরিয়ে নেওয়া হয় লরেমিতে। সেই সঙ্গে এখানকার বেশির ভাগ মানুষও চলে যায় সেখানে। রাতারাতি শহরটা জনশূন্য হয়ে পড়ে। ১৯৭০ সালে রেল কম্পানি বিউফোর্ড বিক্রি করে দেয়। ডন স্যামনস তখন ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের লস অ্যাঞ্জেলসে একটা ব্যবসা করতেন। পরে সেখান থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে সস্ত্রীক চলে আসেন বিউফোর্ডে। এখানে তখন মাত্র সাতজন শ্রমিক থাকে। তারা রেললাইনের দেখাশোনার কাজ করত। নব্বইয়ের দশক শেষ হতে না হতে তারাও চলে গেল। বসতি গাড়ল আশপাশের শহরগুলোতে গিয়ে। এবার পুরো শহরে মানুষ শুধু দুজন—ডন স্যামনস আর তাঁর স্ত্রী। ১৯৯২ সালে স্যামনস শহরটি কিনে নিলেন। তারপর শুরু করলেন একে নিজের মতো করে গড়ে তোলার কাজ।
এমনিতেই বিউফোর্ড একেবারেই ছোট একটা শহর। তাতে আছে মাত্র গোটা ছয়েক বিল্ডিং। তার মধ্যে একটা ছিল স্কুলঘর। ১৯০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত স্কুলটি বন্ধ হয়ে যায় ১৯৬২ সালে। সেটাকেই তিনি শহরের অফিস ঘর বানান। ১৮৯৫ সালে একটা গুদামঘর বানানো হয়েছিল। সেটাকে বানান গাড়ির গ্যারেজ। তাতে একসঙ্গে চারটা গাড়ি রাখা যায়। ১৯০০ সালে একটা পোস্ট অফিস চালু করা হয়েছিল। পোস্ট কোড ৮২০৫২। চালু রাখলেন সেটাও। এ ছাড়া শহরে আরো আছে একটা করে গ্যাস স্টেশন, মুদি দোকান আর তিন বেডরুমের একটা লগ কেবিন। এর বাইরে স্থাপনা বলতে একটা মোবাইলের নেটওয়ার্কের টাওয়ার আর একটা টুল শেড। এ নিয়ে যাত্রা শুরু করল স্যামসনের বিউফোর্ড। আয়ের মূল উত্স গ্যাস স্টেশন আর মুদি দোকান। খদ্দের তিন শ্রেণির—হাইওয়ের যাত্রী, আশপাশের অঞ্চলের বাসিন্দা ও পর্যটক।

স্যামসনের দিন নিতান্ত খারাপ কাটছিল না। গ্রীষ্মকালের দিনগুলোতে গড়ে হাজারখানেক খদ্দের আসত বিউফোর্ডে। শীতকালে অবশ্য সংখ্যাটা নেমে আসত শখানেকে। সব মিলিয়ে স্যামসন বেশ গুছিয়ে উঠছিলেন। কিন্তু ১৯৯৫ সালে হঠাত্ করেই তাঁর স্ত্রী মারা গেলেন। তত দিনে অবশ্য তাঁদের এক ছেলে হয়েছিল। তাকে নিয়েই এবার স্যামসন বিউফোর্ড চালাতে লাগলেন। এর মধ্যে ২০০৪ সালে বিউফোর্ডের পোস্ট অফিসটাও বন্ধ হয়ে গেল। রইল শুধু একটি ডাকবাক্স। ওদিকে ছেলে যখন বড় হলো, সে আবার বাবার মতো এই একার রাজত্বে থাকতে রাজি হলো না। ২০০৭ সালে সে বিউফোর্ড ছেড়ে চলে গেল। তার পরও বছর পাঁচেক একাই বিউফোর্ডের রাশ ধরে রাখলেন স্যামসন। অবশেষে ২০১২ সালে ঠিক করলেন, অনেক হয়েছে। এবার তিনি বিউফোর্ড বিক্রি করে দেবেন। বাকি জীবন কাটাবেন ছেলের সঙ্গে।

এবার দৃশ্যপটে হাজির হলেন নগুয়েন দিন ফ্যাম। তত দিনে তাঁর ‘ফিনদেলি’ কফি ভিয়েতনামে বেশ নাম করে ফেলেছে। তিনি তখন আমেরিকার বাজার ধরার পরিকল্পনা আঁটছিলেন। তারই অংশ হিসেবে ৯ লাখ ডলার দিয়ে কিনে নিলেন শহরটি। মুদি দোকানটাকে সাজালেন নতুন করে। সেখানকার বিশেষ আকর্ষণ তাঁর ফিনদেলি কফি। শুধু তা-ই না, সেখানে একটা ম্যুরালও বসালেন, যেখানে কয়েকজন ভিয়েতনামি নারীকে দেখা যাচ্ছে কফি ক্ষেতে কাজ করছে। আর এই বিউফোর্ডের মালিকানার কারণে তিনি নিজ দেশে রীতিমতো তারকা বনে গেছেন।

তবে ভিয়েতনামে তারকা হয়ে গেলে কী হবে, বিউফোর্ডে এখনো খুব একটা সুবিধা করে উঠতে পারেননি। নিজেও অবশ্য সেখানে থাকেন না, থাকেন নিজের দেশের হো চি মিন সিটিতেই। সেখানেই তাঁর কফির মূল ব্যবসা। বিউফোর্ডের দেখাশোনা করেন ডেভিড হার্শ্চ। তিনিই শহরটির ম্যানেজার হিসেবে কাজ করছেন। শুধু ম্যানেজারই নন, তিনি একই সঙ্গে মুদি দোকান, গ্যাস স্টেশনও চালান। তবে শহরের দেখাশোনার কাজ তাঁকে একা করতে হয় না। সত্যি বলতে তিনিও আসলে শহরটাতে থাকেন না। থাকেন তিন মাইল দক্ষিণের আরেক শহরের একটা ছোট্ট র্যাঞ্চে। বিউফোর্ডের এখনকার একমাত্র বাসিন্দার নাম ব্র্যান্ডন হুভার। বাড়িঘরহীন এই ভবঘুরে লোকটাকে বিউফোর্ডের লগ কেবিনে বিনা ভাড়ায় থাকতে দেওয়া হয়েছে একটাই শর্তে—শহরটার দেখাশোনার কাজে সে হার্শ্চকে সহায়তা করবে।

হার্শ্চ ফ্যামের কাছ থেকে শহরটি লিজ নিয়েছিলেন ২০১৫ সালে। শর্ত অনুযায়ী শহরের সব রক্ষণাবেক্ষণ ও খরচাপাতির দায়িত্ব তাঁর। শহরের মুদি দোকান আর গ্যাস স্টেশন থেকে যা আয় হবে, সেখান থেকেই এই ব্যয়গুলো নির্বাহ করবেন। শুরুতে সহজ মনে হলেও, পরে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন, কাজটা কতটা শক্ত। ছোট হলে কী হবে, শহরটা রক্ষণাবেক্ষণের হ্যাপা কম নয়। শুধু ময়লা সরানোর জন্যও তাঁকে মাসে গুনতে হয় ৮০০ ডলার করে। দোকানের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আর স্টেশনের জন্য গ্যাস আনার খরচও নিতান্ত কম নয়। গ্রীষ্মকালে তবু চালিয়ে নেওয়া যায়। কারণ সে সময় লোকজনের যাওয়া-আসা থাকে। কিন্তু বিপদ হয় শীতকালে। অমন ঠাণ্ডার মধ্যে লোকজনও আসে না, বিউফোর্ড চালানোর খরচও তোলা যায় না।

তবে এরই মধ্যে পর্যটক বাড়ানোর জন্য নানা আয়োজন শুরু করেছেন হার্শ্চ। এই যেমন মাঝখানে একটা পার্টির আয়োজন করেছিলেন। রেখেছিলেন গান-বাজনা, বারবিকিউ আর বিয়ারের ব্যবস্থা। তাতে সাড়াও মিলেছে ভালোই। আশপাশের লোকজন বেশ আগ্রহী হয়ে উঠেছে শহরটির ব্যাপারে। এ ছাড়া দিন দিন পর্যটকের স্রোতও বাড়ছে। এরই মধ্যে আমেরিকার বাইরে থেকেও পর্যটক আসতে শুরু করেছে। ভিয়েতনাম থেকেও নাকি অনেক মানুষ এসেছেন ঘুরতে। তাই বিউফোর্ড চালাতে এখনো টানাটানি চললেও, হতাশ হয়ে পড়েননি হার্শ্চ। বরং স্বপ্ন দেখেন বিউফোর্ডকে একটা আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার।


মন্তব্য