kalerkantho


দরজার ওপাশে

শুটিংয়ের সেট থেকে শহর

শুটিংয়ের সেট হিসেবে বানানো হয়েছিল এক নকল শহর। কালক্রমে এটাই পরিণত হয় সত্যিকারের এক শহরে। শহরটির বৃত্তান্ত জানাচ্ছেন আনিকা জীনাত

১২ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



শুটিংয়ের সেট থেকে শহর

ওয়েস্টার্ন ঘরানার ছবি বানাতে হলে পরিত্যক্ত পুরনো শহরগুলোই ভরসা। বিশেষ করে এমন একটি সেট, যেখানে শুটিংও করা যায় আবার কাজ শেষে থাকাও যায়। এ রকম একটি শুটিং লোকেশন খুঁজে পাওয়া ছিল এক ঝক্কির ব্যাপার। কারণ কাউবয়দের নিয়ে ছবি বানাতে হলে বিলাসবহুল কোনো পর্যটনকেন্দ্র চলবে না। এর জন্য বরং দরকার রুক্ষ-শুষ্ক মরুভূমি আর এর মাঝখানে একটি মরূদ্যান।

শুটিংয়ের উপযোগী এমন একটি জায়গা অনেক দিন ধরেই খুঁজছিলেন হলিউড কিংবদন্তি রয় রজার্স, ডিক কার্টিস ও রাসেল হেইডেন। দূর-দূরান্তের শুটিং লোকেশনে যেতে যেতে তাঁরা হাঁপিয়ে উঠেছিলেন।

তাঁদের মধ্যে রজার্স ১৯৪৬ সালের কোনো এক দিনে, ঘোড়া নিয়ে ইউকা ভ্যালিতে যাচ্ছিলেন। বিশ্রাম নেওয়ার জন্য যেখানে থামলেন, সেই জায়গাটিই মনে ধরে গেল তাঁর। ভেবে দেখলেন, ছোট্ট পাহাড়ের কোলে বালিতে ঢাকা এই জায়গার চেয়ে জুতসই কোনো শুটিং লোকেশন পাওয়া অসম্ভব।

তিনজন মিলে ক্যালিফোর্নিয়ার ইউকা ভ্যালি থেকে চার মাইল উত্তর-পশ্চিমের সেই জায়গাটিতে পাঁচ একর জায়গাজুড়ে একটি ওয়েস্টার্ন ছবির সেট বসানোর পরিকল্পনা করলেন।

অচিরেই শুরু হলো ১৯ শতকের ওয়েস্টার্ন শহরের অনুকরণে নকল একটি শহর নির্মাণের কাজ। শুটিং সেটটির নকশা করলেন আরন্ট ই থম্পসন। ১৯৪৭ সালেই শেষ হয়ে গেল শুটিং সেট বা শহরটি বানানোর কাজ। নাম দেওয়া হলো পাইওনিয়ার টাউন।

এখানে অভিনয়শিল্পীদের অস্থায়ী বসবাস শুরু হওয়ায় দোকানপাট খুলতেও বেশি সময় লাগল না। শুটিং সেটে গোসলখানা, কারাগার ও ব্যাংকের পাশাপাশি বসল সেলুন, গান রেকর্ডিং ও খাবারের দোকান।

শহরটি বানানোর উদ্দেশ্য সে সময় পুরোপুরি সফল হয়েছিল। এই সেটে ২০০-রও বেশি হলিউডি ছবির শুটিং হয়। শুধু ছবি নয়, অনেক টেলিভিশন সিরিজেরও শুটিং সেট ছিল এই পাইওনিয়ার টাউন। তবে সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে কমতে থাকে ওয়েস্টার্ন ছবি বানানোর হিড়িক। পাইওনিয়ার টাউনের চাহিদাও দ্রুতগতিতে কমতে থাকে। তবে শুটিং সেটটি পরিত্যক্ত হওয়ার পর দর্শনার্থীদের কাছে বেড়ে যায় এর কদর।

বড় বড় শহরের চিত্রশিল্পী, উদ্যোক্তা ও বৈচিত্র্যপিয়াসী ব্যক্তিদের কাছে পাইওনিয়ার টাউন এখন হয়ে উঠেছে দম ফেলার একটি  জায়গা। যেখানে শহুরে কোলাহলের  লেশমাত্র নেই। এ কারণেই হয়তো পাইওনিয়ার টাউনের আশপাশের জায়গাজমিগুলো হটকেকের মতো বিক্রি হওয়া শুরু করে। অনেকেই স্থায়ীভাবে থাকতে শুরু করেন এখানে। এখন শহরের জনসংখ্যা ৬০০ ছাড়িয়ে গেছে।

কানাডিয়ান পরিচালক জুলিয়ান টি পিন্ডার লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে এই শহরে এসে বসতি গাড়েন, ২০১৪ সালে। স্ত্রীকে নিয়ে এখন তিনি এখানেই থাকছেন পাকাপাকিভাবে। শুটিংয়ের জন্য বানানো একটি খনির কেবিনই এখন তাঁর বাড়ি। এমন আরো অনেকেই এসেছেন। নিউ ইয়ার্ক থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে এসেছেন বেলজিয়ান এক অলংকারের নকশাকার ও তাঁর স্ত্রী। তিনটি বাড়ি কিনে এখন কাউবয়দের শহরেই ঘাঁটি গেড়েছেন।

শহরে বেশ কিছু দোকানপাটও গড়ে উঠেছে। একটি দোকানে বোহেমিয়ান স্কার্ট, জাম্পস্যুট, চামড়ার জ্যাকেটসহ ওয়েস্টার্ন যুগের নানা ধরনের কাপড় বিক্রি হয়। খাবার খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গান শোনার জন্য আছে পাইওনিয়ার টাউন প্যালেস নামের একটি মিউজিক ক্যাফে। যেখানে স্থানীয়দের পাশাপাশি এরিক বার্ডন ও রবার্ট প্ল্যান্টের মতো বিখ্যাত শিল্পীরাও এসে গান  গেয়েছেন। গত বছরই এই শহরে কনসার্ট করে গেছেন স্যার পল ম্যাকার্টনি। পাইওনিয়ার টাউনের বেশির ভাগ বাসিন্দাই এতে উপস্থিত ছিলেন।

শহরটিতে ভেতরে একটি কবর চোখে পড়বে। সেখানে একটি কাঠের খুঁটিতে লেখা স্বাগত। কবরটি সত্যিকারের নাকি শহরে ঢোকার পথেই লোকদের চমকে দেওয়ার জন্য এটা করা হয়েছে তা নিশ্চিত নয়। শহরের রেলিং আর পিলারের ওপর নকল কাক বেঁধে রাখা হয়েছে। এক জায়গায় রকিং চেয়ারের ওপর বসানো হয়েছে একটি ডামি। রাস্তার ধারেই ট্রলিতে রাখা নকল আর অকেজো বিস্ফোরক। মূল সড়কের বাড়িগুলোর সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় মনে হবে, শ দুয়েক বছরের পুরনো কোনো ওয়েস্টার্ন শহরের মধ্য দিয়েই হেঁটে যাচ্ছেন। কল্পনা আর বাস্তবের মিশেলের এমন শহর পাবেন না আর একটাও। তাই তো সবাইকে টানে পাইওনিয়ার টাউন।


মন্তব্য