kalerkantho

রহস্যজট

মূর্তি চোর

প্রিন্স আশরাফ

১২ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



মূর্তি চোর

অঙ্কন : মানব

রাশেদ রাহা বিরক্ত মুখে গোয়েন্দা কার্যালয় থেকে বের হলো। এই কেসের সুরাহা করতে না পারার কারণে বড় কর্তার কাছ থেকে একগাদা কথা শুনতে হয়েছে।

মাথায় ঘিলুর পরিবর্তে অন্য কোনো পদার্থের উপস্থিতি আছে কি না তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে।

রাশেদ রাহা এবার জ্যোতির্ময় দাদুর কাছে আসতে চায়নি। কেসটা সহজ বলেই নিজ মগজাস্ত্রে শাণ দিয়ে সল্ভ করা যায় কি না তা-ই দেখতে চেয়েছে। বাড়ির সম্ভাব্য সন্দেহভাজন সবারই সাক্ষাত্কার নিয়েছে, জেরা করেছে; কিন্তু তাতে যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই রয়ে গেছে, প্রকৃত অপরাধী যে কে তার কিছুই বুঝে উঠতে পারেনি।

গত্যন্তর না দেখে বাইক চালিয়ে জ্যোতির্ময় দাদুর বাড়িতে চলে এলো রাশেদ রাহা। কেয়ারটেকার সেলিমের কাছে ফোন করে আগেই জেনে নিয়েছিল দাদু বাড়িতে নাকি হাসপাতালে। দাদুর এই বয়সে জীবনের কিছুটা সময় বাড়িতে কাটলেও বেশির ভাগ সময় হাসপাতালেই কাটে।

শীতের শেষ, বসন্তের শুরু। দাদু লনে বসে বই পড়ছেন।

সামনের বেতের চেয়ার-টেবিল। ট্রেতে টি পট, বিস্কুট, দুটি চায়ের কাপ। গোয়েন্দার নজর, দেখেই বুঝে ফেলল, তার আসার কথা শুনে আগেই আরেকটি চায়ের কাপ আনিয়ে রেখেছেন।

‘কী ব্যাপার, ও রকম গোমড়ামুখে কেন? বসের কাছে বকা খেয়েছিস? নতুন কোনো কেসের ঝামেলা?’ দাদু বইয়ের পাতা মার্কিং করে রাখলেন। রাশেদ বইয়ের কভার দেখতে পেল, ফিলিস্তিনের ইতিহাস। এই বয়সেও ফিলিস্তিনের ইতিহাস জানতে হবে কেন বুঝতে পারল না।

‘পড়ার কোনো বয়স থাকে না রে। জানার কোনো শেষ নাই। ’ দাদু মুচকি হাসলেন। ‘নে, আগে চা পান কর। তারপর ঠাণ্ডা মাথায় তোর কাহিনি শুনি। ’

চা পান শেষে রাশেদ রাহা জানাল, ‘মক্কেল মণিমোহন সাহা মোটামুটি ধনাঢ্যই বলা চলে। কাপড়ের ব্যবসা আছে। বেনারসি মার্কেটে দোকানও আছে। পাইকারি বেচাকেনা হয়। ঘটনার সঙ্গে কাপড়ের ব্যবসার কোনো সম্পর্ক নেই। ’

‘কিসের সম্পর্ক আছে, কিসের নেই তোর কিছু বলা লাগবে না। তুই সব কিছুই বলে যা। ব্যাকগ্রাউন্ড ছাড়া ঘটনা পরিষ্কার হয় না। ’

রাশেদ জানাল, ব্যবসায়ী মণিমোহন সাহার কাছে একটা গণেশমূর্তি আছে। বাপ-দাদার আমলের। মূর্তিটা তাদের ব্যবসার লক্ষ্মী। দামি মণিমানিক্য বসানো মূর্তিটা দোকানের একটা আয়রন সেফের মধ্যে রাতের বেলা রেখে আসা হয়। সকালে আবার দোকানে মূর্তির নির্দিষ্ট স্থানে বসিয়ে পূজা দেওয়া হয়। এভাবেই চলছিল এত দিন। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহে বিভিন্ন মার্কেটে চুরির ঘটনায় মণিমোহন সাহা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। এমনকি আশপাশের দোকানদাররা, যাঁরা মণিমোহন সাহার বন্ধুস্থানীয় এবং গণেশমূর্তির অর্থমূল্যের ব্যাপারটা জানেন, তাঁরা মণিমোহন সাহাকে বলেন, ‘দোকানে ওভাবে রাতের বেলায় গণেশমূর্তি রেখে যাওয়াটা এই পরিস্থিতিতে নিরাপদ নয় মোটেই। আপনি ওটা রাতের বেলায় বাড়িতে নিয়ে গিয়ে রাখলে ভালো হয়। তাতে মূর্তিটাও নিরাপদ থাকে, দোকানের ওপর হামলাও হয় না। ’

‘কিন্তু ওটা তো আমার ব্যবসার লক্ষ্মী। ’ মণিমোহন সাহা দোনোমোনো করেন।

‘তাতে কী! রাতে তো আর ব্যবসা হচ্ছে না। ব্যবসার সময় ওটা দোকানে থাকলেই তো হলো। ’

যুক্তি ও ভয়ের কাছে মণিমোহন সাহা হার মানেন। সেদিনই ঠিক করলেন, রাতে বাড়িতে যাওয়ার আগে মূর্তিটা ওটার কাঠের বাক্সে ভরে কোটের পকেটে করে নিয়ে যাবেন। রাতে দোকানপাট বন্ধ করার সময় দোকানের কর্মচারী নিরাপদকে বলেন, ‘আজ তুই আমার সঙ্গে বাড়িতে যাবি।   রাতে মেসবাড়িতে ফেরার দরকার নেই। আমার বাড়িতেই থাকবি। নিচতলার ঘরে শুবি। ’

কর্মচারী নিরাপদ ঘাড় নেড়ে সায় জানায়। তারপর এক প্রকার গার্ড দিয়েই মণিমোহন সাহাকে তাঁর বাড়িতে নিয়ে আসে। এই প্রথম মনিবের বাড়িতে নিরাপদের রাত কাটাতে আসা। তার একটু অস্বস্তিই লাগে।

‘বাড়ির সম্পর্কে একটু ডিটেইলস কি বলতে পারবি?’

‘জি দাদু, বলছি। মণিমোহন সাহার বাড়ি দোকান থেকে হাঁটা পথের দূরত্ব। প্রাচীন আমলের দোতলা বাড়ি। লোহার গেট আছে। গেটে দারোয়ান থাকে। মণিমোহন সাহা বিবাহিত। স্ত্রী বাড়িতে থেকেই ধর্মকর্ম করেন। একমাত্র সন্তান রামমোহন কলকাতায় স্ত্রী-পুত্র নিয়ে থাকে। বড় বাজারে কাপড়ের ব্যবসা করে। বাড়ির অন্য বাসিন্দারা হলো মণিমোহনের বোনের ছেলে শংকর মোহন। অবিবাহিত। মামার বাড়িতে থেকে একটা এনজিওতে চাকরি করে। শোবার ঘর দোতলার পশ্চিম প্রান্তে। কিছুটা সঙ্গদোষ ও হাতটানের স্বভাব আছে। এর আগে নাকি মামির একটা গলার হার বিক্রি করে দিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে মদ খেয়েছিল। বাড়ির একজন কেয়ারটেকার, নাম নিখিল ভদ্র। বয়স্ক মানুষ। তিনকুলে কেউ নেই। অনেক দিন ধরেই এই বাড়িতে কাজ করে। ঘুমায় নিচতলায়। মণিমোহনের ছোট শ্যালকও বোনের কাছে থাকে। বিপত্নীক। বেকার। খেলাধুলা, গান-বাজনা, পত্রপত্রিকা পড়া—এসবেই সময় কেটে যায় তার। হাতখরচ বোনের কাছ থেকে পায়, যদিও টুকটাক সিনেমায় যাওয়া বা গানের শোতে যাওয়া ছাড়া তার তেমন হাতখরচ নেই। কোনো হাতটান না থাকলেও বোনের সংসারে বেকার পড়ে থাকার এক ধরনের বিতৃষ্ণা তার মধ্যে কাজ করে। নিজের মতো করে থাকে বলেই বেশির ভাগ সময় চিলেকোঠার ঘরে থাকতে পছন্দ করে। সেখানেই গান-বাজনা নিয়ে থাকে। তবে দোতলার পূর্ব দিকের ঘরে ও কখনো কখনো থাকে রাতে। বয়স্ক কাজের মহিলা ঝরনা বাড়ির রান্নাবান্নার দিকটা দেখে। এও পুরনো। মণিমোহনের স্ত্রীর সঙ্গেই তার বাপের বাড়ি থেকে এসেছে। স্বামী মৃত। সন্তানরা দেখভাল করে না। থাকে নিচতলায়।

‘এখন মণিমোহন বাবুর গণেশমূর্তি চুরির ঘটনাটা বল। ’

‘সে কথাতেই আসছি। মণিমোহন সাহা সাবধানে মূর্তিটা বাক্সে ভরে বাড়িতে নিয়ে এলেন। নকশা করা কাঠের বাক্স। বাড়ির সবাই চেনে। তিনি যখন বাক্সটা কোটের পকেটের মধ্যে নিয়ে বাড়িতে ঢুকলেন, তখনই দারোয়ানের চোখ গেল বাক্সের দিকে। মণিমোহন সাহা নিজেই দারোয়ানকে বললেন, ‘বাক্সে গণেশমূর্তি আছে। রাতে সাবধানে পাহারা দিয়ো। ঘুমালে চলবে না। ’ তারপর দোতলায় ওঠার সময় কেয়ারটেকারের সঙ্গে দেখা হলো। কেয়ারটেকার বলল, ‘বাবু ব্যবসা লক্ষ্মীকে বাড়িতে নিয়ে এলেন কেন?’ দোতলায় দাঁড়িয়ে ভাগ্নে কেয়ারটেকারের সঙ্গে মামার কথোপকথন স্পষ্ট শুনতে পেল। আর বাক্সটা কোটের পকেট থেকে উঁকি দেওয়ায় দেখতেও পেল। মামা দোতলায় উঠতে সে তাড়াতাড়ি নিজের ঘরে ঢুকে পড়ল। ঘরে ঢুকে মণিমোহন দেখেন, তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে শালাবাবু আছেন কামরায়। বাক্সটা কোটের পকেট থেকে বের করে টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে বললেন, ‘চোর-ডাকাতের ভয়ে জিনিসটা বাড়িতে নিয়ে এলাম। এখন নিরাপদে থাকলেই হয়। ’

শালাবাবু ঠাট্টা করে বলল, ‘চোর-ডাকাত কোথায় নেই জামাইবাবু। চোরের ভয়ে জিনিস কোলে করে কে-ই বা বসে থাকে?’

‘মোট কথা বাড়ির সবাই গণেশমূর্তি বা মূর্তির বাক্সের ব্যাপার জানে?’ জ্যোতির্ময় দাদু জিজ্ঞেস করলেন।

‘হ্যাঁ, তা বলা যায়। রাঁধুনির কাছে জিজ্ঞেস করে দেখেছি, সেও জানত। রাতে ঘরে খাবার দেওয়ার সময় সে টেবিলের ওপর মূর্তির বাক্সটা দেখেছে। মণিমোহন সাহা মাথার কাছের বেডসাইড টেবিলে বাক্সটা রেখে দেন। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখেন, বাক্স উধাও। কেউ মূর্তিসহ বাক্সটা চুরি করে নিয়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে একটা কথা জানিয়ে রাখি,  ছোটবেলায় একবার মণিমোহন সাহাদের পৈতৃক বাড়িতে আগুন লাগে। তখন তিনি যে কামরায় ছিলেন, ওটার দরজা বন্ধ ছিল ভেতর থেকে। আগুনের ভয়াবহতায় দরজার ছিটকিনি খুলতে পারেননি। শেষে বাইরে থেকে জানালা ভেঙে তাঁকে উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনার পর থেকে তিনি ঘরের দরজা কখনো ভেতর থেকে লক করেন না। এতে স্বামী-স্ত্রী শুধু অভ্যস্তই নয়, বাড়ির সবাই ব্যাপারটা জানে। আর দরজা খোলা থাকার কারণে, চোরের পক্ষে ঘর থেকে জিনিসটা হাতিয়ে নেওয়া খুব সহজ হয়েছে। ’

‘দরজা কি ভালোভাবে ইনস্পেকশন করেছিলি?’ দাদু প্রশ্ন করলেন।

‘হ্যাঁ, দাদু। দরজা যে খোলা ছিল, এই তথ্য তখন জানতাম না। তাই ভালোভাবে খেয়াল করতেই মনে হয়, কেউ লোহার পাতের মতো শক্ত একটা কিছু দিয়ে দরজার ফাঁকে ঢোকানোর চেষ্টা করেছে। সেখানে আঁচড়ের দাগ পাওয়া গেছে। আর দারোয়ান এটা নিশ্চিত করেছে, রাতে বাইরে থেকে কোনো লোক ভেতরে ঢুকতে পারেনি। সে সজাগ ছিল। পাচিল টপকে ঢোকার কোনো পায়ের ছাপ বা বাড়ির গ্রিলে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। চুরিটা বাড়ির ভেতরের লোকদের মধ্যে কেউ করেছে। ’

দাদু হেসে ফেললেন। ‘তোর কেসটা আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে। জলবৎ তলরং। চোর কে তা-ও বুঝতে পারছি। কিভাবে চোর ধরলাম তা-ও বলে দিচ্ছি। এখন গিয়ে শুধু পাকড়াও করার অপেক্ষা। ’

 

পাঠক, বলুন তো কে গণেশমূর্তি চুরি করেছে। জ্যোতির্ময় দাদু কিভাবে তা বুঝতে পারলেন।


মন্তব্য