kalerkantho


রহস্যজট

ওঝার কেরামতি

তাহমিনা সানি তাহমিনা সানি

৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



ওঝার কেরামতি

অঙ্কন : মানব

তাঁকে কেউই পছন্দ করে না। ভুল বললাম।

আমি ছাড়া কেউ পছন্দ করে না। না করার কারণও আছে। তাঁর সব কিছুতেই আপত্তি! এই সরলা গ্রামের এমন কেউ নেই যে তাঁর আপত্তির শিকার হয়নি! যদিও বা কেউ ভুল বাংলায় কথা বলেছে তো তাতে আপত্তি,  কেউ ডাক্তারের কাছে না গিয়ে ওঝার কাছে গেছে তাতেও আপত্তি, এমনকি কেউ পারিবারিক সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে ভুল করলেও! ঠিক তাঁর বাগড়া পড়বে। দরকার পড়লে এক মাইল হেঁটেও সশরীরে গিয়ে বাগড়া দেবেন। তিনি আর কেউ নন। আমার বড় চাচা। আমি ডাকি প্রাগৈতিহাসিক চাচা! ১৯৪০ সালে জন্ম। সেই আমলের এমএ পাস। তাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। মুক্তিযুদ্ধের দুর্বার স্মৃতি এখনো তাঁকে স্থির থাকতে দেয় না। গ্রামে কোনো অন্যায় দেখলে এই বুড়ো বয়সেও ছুটে যান সবার আগে। কেউ কেউ উপকৃত হলেও বেশির ভাগই তাঁর এই ছোটাছুটির বিপক্ষে। তাতে শান্তিতে অন্যায় করার রাস্তা থাকে না যে!

যা-ই হোক, ১৯৭১ সালের পর তিনি গ্রামেই রয়ে গেলেন। আর ঢাকামুখো হলেন না। বলেন, ঢাকার ছাত্ররা এখন নিজ নীতি ও রাজনীতিতে বিশ্বাসী, দেশনীতি নয়! কে আর বোঝায় তাকে? প্রধান শিক্ষক হিসেবে অনেক দিন সরলা প্রাথমিক হাই স্কুলে শিক্ষকতা করে ২০০২ সালে অবসর নিলেন। আর তার পর থেকে নিলেন গ্রামে গ্রামে যেকোনো অন্যায় কাজে বাগড়া দেওয়ার নিজস্ব নিযুক্তি!

আমিও এবার পণ করে গ্রামে এসেছি। চাচাকে ঢাকা নিয়েই ছাড়ব। বাংলাদেশের এমন একজন বীরের এভাবে অভিমান বুকে নিশ্চুপ হয়ে থাকা ঠিক নয়। গেরিলা যুদ্ধের সময় বুকের পাঁজর ছুঁয়ে বেরিয়ে যাওয়া বুলেটের ক্ষতচিহ্নটার মতো কেন নিজেকে সবার আড়ালে রাখবেন?

হলো না। বাড়ি গিয়ে চাচাকে পেলাম না। তিনি নাকি পাশের গ্রামে গেছেন অন্যায় কাজে বাগড়া দিতে! আমিও ব্যাগ-ব্যাগেজ ফেলে ছুটলাম।

গ্রামটা বেশি দূর নয়। আগেও গিয়েছি। একটু এদিক-সেদিক ঘুরতেই খুঁজে পেয়ে গেলাম চাচাকে! তিনি খুব মনোযোগ দিয়ে এক ওঝার ওঝাগিরি দেখছেন। সে ওঝার দুই রোগী। একজনকে সাপে কেটেছে। আরেকজনকে পাগলা শিয়ালে কামড়েছে! শিয়ালের বিষ তোলা হচ্ছে। আক্রান্তকে চিড়বিড়ে রোদে বসিয়ে রাখা হয়েছে পিঁড়িতে। আমাকে দেখতে পেয়ে কাছে ডাকলেন চাচা। ভেবেছিলাম, অনেক দিন পর আমাকে দেখে অবাক হবেন। কিন্তু যেন কাল রাতেই আমার সঙ্গে ডিনার করেছেন, সেই ভঙ্গিতে পিঠে চাপড় দিয়ে ঘড়ঘড়ে গলায় বললেন—‘বুঝলি রনো, যে রোদ পড়েছে তাতে র‍্যাবিস ভ্যাকসিন লাগবে না, ঝলসিয়েই ব্যাটা শিয়ালের বিষ নামিয়ে ফেলবে। আর ওই দ্যাখ—শুয়ে আছে যে সে সাপেকাটা—ওইটা তো ভয়েই মরবে! আনার পর একটা কথাও বলেনি এখনো পর্যন্ত। ’

আমি হাসলাম। ভাবলাম, এবার বুঝি আমার হঠাৎ আসার কারণ জানতে চাইবেন। কিন্তু চাচা জানতে চাইলেন অন্য কথা—‘বল তো রনো? বিষাক্ত সাপে কাটলে মানুষ মরে?’ আমি অবাক হয়ে গেলাম শুনে। এ আবার কেমন কথা? বিষাক্ত সাপে কাটলে মানুষ মরবে না? আমাকে দ্বিধাভরা চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে নিজেই বললেন—‘আরে বোকা! বিষাক্ত সাপে কাটলেই যে মরতে হবে এমন কোনো কথা নেই, প্রশ্নটা হচ্ছে সাপটা কতটুকু বিষ ঢালতে পেরেছে। মরে তো সব ভয়ে! ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ সাপই নির্বিষ। আর বিষাক্ত সাপ যদি কামড়েও থাকে, তাহলে ওঝার কাছে এসে চিত হয়ে পড়ে না থেকে অ্যান্টিডোট নিলেই মিটে যায়। তা না! দ্যাখ, ওই ভেড়াটা রোদে কেমন রোস্ট হচ্ছে!’

ওঝার তাণ্ডবনৃত্য শুরু হয়ে গেছে। মন্ত্র পড়ে মাঝারি সাইজের পিতলের একটা চ্যাপ্টা থালা ঠাস করে সজোরে শব্দ তুলে যাকে শিয়ালে কামড়েছে তার পিঠের মাঝ বরাবর বসিয়ে দিল। বেচারা মুখ বাঁকা করে কোত করে শব্দ করল কেবল। ওঝার ঠেলায় নড়তেও পারল না। থালা আর পড়ে না। পিঠেই আটকে থাকল! সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত দর্শকদের তুমুল হাততালি। ওঝার সাগরেদ ধমক দেয় সবাইকে—‘এই, চোপ! শব্দ করবি না! শব্দে মন্ত্রের জোর থাকে না!’ সত্যি বলতে কী, আমি নিজেও চমকে গেছি! এভাবে কোনো কারণ ছাড়াই একটা থালার মাধ্যাকর্ষণ শক্তি উধাও হয়ে যাওয়ার কথা নয়। তা ছাড়া সবাই হাত দিয়ে ধরে ধরে চেক করে নিয়েছে, ওটা একটা সাধারণ থালাই।

থালা পিঠে নিয়ে এভাবেই তাকে বসে থাকতে হবে আরো কিছুক্ষণ। এই থালা নাকি সব বিষ শুষে নেবে। ওঝা খেমটা নাচন নাচতে নাচতে সাপেকাটা লোকটার সামনে এলো। ঝোলার ভেতর থেকে লাল রঙের একটা কাপড়ের পুঁটলি বের করল। সেখান থেকে একটা কালো গোলমরিচের দানা চাবাতে দিল। মাথা নেড়ে জানতে চাইল কেমন লাগে?

রোগী জানাল, ‘স্বাদ পাই না। ’

এ কথা শুনে ওঝা ঝাড়ু দিয়ে লোকটাকে ও সাপের চৌদ্দগোষ্ঠীকে ঝাড়তে লাগল। আবারও সেই পুঁটলি থেকে আরেকটা গোলমরিচের দানা চিবোতে দিল। রোগী এবার ভয়ে ভয়ে বলল—‘না না! এবারও স্বাদ পাইতাছি না। আমার ব্যথা তো পরপর বাড়তাছে! আমি কী আর বাঁচুম না?’

হায় হায় পড়ে গেল ভিড়ে। সাগরেদ আবারও সবাইকে চোপ চোপ বলে শান্তি প্রতিষ্ঠা করল। ওঝা জানাল—ভয়ংকর একটা বিষাক্ত সাপে কামড়েছে একে! একে ভালো করতে হলে আরো এক হাজার টাকা বেশি দেওয়া লাগবে। রোগীর পরিবার সঙ্গে সঙ্গে রাজি। টাকার চেয়ে জীবন বড়!

আরেক প্রস্থ লাফালাফি ঝাঁপাঝাঁপি আর মন্ত্রতন্ত্র পড়ে ঝাড়ুপেটা করার পর এবার ওঝা নীলরঙা কাপড়ের পুঁটলি থেকে আরেকটা গোলমরিচের দানা বের করে চিবোতে দিল। এবার লোকটা হাসি হাসি মুখে বলল—‘এবার স্বাদ পাইতাছি! ঝাল লাগতাছে!’ আবারও তুমুল হাততালি।

চাচাও দেখি হাসতে হাসতে হাততালি দিচ্ছেন। আমি তাঁকে কোনো বাগড়াকর্মে নিযুক্ত হওয়ার আগেই চেপে ধরলাম—‘চাচা! আমি কিন্তু আপনাকে সঙ্গে না নিয়ে ঢাকা ফিরছি না। দেশ স্বাধীন করে স্বাধীনতার স্বাদ নিলেন না। এক গ্রামেই কাটিয়ে দিলেন সারা জীবন! আমি আপনাকে ঢাকা নিয়ে যাব। মিডিয়ার সামনে তুলে ধরব। বাংলাদেশকে জানাব—আপনার কমান্ডে কিভাবে একের পর এক গেরিলা যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীকে হারিয়ে দিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। ’

চাচা চুপচাপ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। কিংবা হারিয়ে গেলেন স্মৃতির দুনিয়ায়। সেখানে স্মৃতিরা গেরিলা অপারেশন করছে কৃত্রিমতার দুনিয়ায় না ফেরার!  সংবিৎ ফিরে পেলে আর ওঝার পেছনে লড়তে গেলেন না। আমার হাত শক্ত করে চেপে ধরে বাড়ির পথ ধরলেন।

সারাটা পথ প্রায় নিশ্চুপই থাকলেন। কিন্তু বাড়ির কাছাকাছি আসতেই কী মনে হলো—বললেন, ‘রনো? আমাকে ঢাকা নিয়ে যেতে এসেছিস?’

আমি বললাম, ‘ হুঁ, শুধু তা-ই নয়, অনেক দিন থাকতে হবে আমার সঙ্গে। ’

‘যাব। ’

আমি আঁতকে উঠলাম। ভেবেছিলাম, পায়ের কাছে পড়ে অনুনয়-বিনয় করতে হবে। সে জন্যও রেডি হয়ে এসেছি। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি রাজি হয়ে যাবেন ভাবিনি। বিব্রত মুখে হাসলাম।

চাচা বললেন, ‘কিন্তু এক শর্ত আছে!’

‘আমি যেকোনো শর্তে রাজি চাচা!’

চাচা বললেন, ‘তাহলে বল, একটু আগে যে লোকটাকে সাপে কাটল, ওটা বিষাক্ত না নির্বিষ। আর ওঝার যে দুই বুজরুকি দেখলি, ওটার ব্যাখ্যা কী? আজ তুই ছিলি বলে ওঝার ক্যাচালে জড়ালাম না। জড়ালে বহুত তর্ক-বিতর্ক হয়। শেষে আমার দেওয়া প্রমাণ দেখে গ্রামবাসী ছেঁচা দেয় আর ওঝা গ্রাম ছাড়ে। এর আগে আরো সাতটাকে গ্রামছাড়া করেছি! হাঃ হাঃ হাঃ!’

আমি মনে মনে প্রমোদ গুনলাম। সেরেছে! চাচাকে বলতে হতো এই শর্ত ছাড়া আমি আর যেকোনো শর্তে রাজি! শেষে না পেরে বললাম, ‘চাচা! একটু ক্লু তো দেন?’

চাচা কিছু বললেন না। ছেলেমানুষের মতো হৈচৈ করতে লাগলেন—কী মজা, ঢাকা যাব, ঢাকা! তারপর ঘড়ঘড়ে গলায় গাইতে লাগলেন—‘ঢাকা শহর আইসা আমার আশা ফুরাইছে। আরে লাল লাল নীল নীল বাতি দেইখ্যা নয়ন জুড়াইছে’, আমার মাথা খারাপের মতো লাগল। গানের মধ্যে ক্লু কোথায়? মাথায় হাত দিয়ে উঠোনেই বসে পড়লাম। হাতে মাত্র দুই দিন সময়!

আর হ্যাঁ। এতক্ষণ যা বললাম তা কিন্তু দিন ১৫ আগের কথা। চাচা এখন আমার বাসায়। ঢাকায়!

পাঠক বলুন, কী করে ওঝার দুই বুজরুকি বের করলাম আর সেগুলো কী কী? কী করেই বা বুঝলাম সাপটা বিষাক্ত ছিল, না নির্বিষ!


মন্তব্য