kalerkantho


অন্য রকম

ব্যাঙ্গালুরুর ‘ডগ ফাদার’

নাবীল অনুসূর্য

৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০





ব্যাঙ্গালুরুর ‘ডগ ফাদার’

রাকেশ শুক্লা। বয়স ৪৫।

পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। বাড়ি ব্যাঙ্গালুরুতে। সেখানেই বছর দশেক আগে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে রাইটার্স ব্লক নামে একটি টেকনিক্যাল কমিউনিকেশন আউটসোর্সিং কম্পানি গঠন করেছিলেন। তিনি নিজে সেটির সিইও। কম্পানিটিও এখন তাদের ইন্ডাস্ট্রিতে বেশ নাম করেছে। এরই মধ্যে কাজ করেছে ইনটেল, মাইক্রোসফট ও ওরাকলের মতো কম্পানিগুলোর সঙ্গে। এই রাকেশ শুক্লা ব্যাঙ্গালুরুর মানুষের কাছে পরিচিত অদ্ভুত একটি নামে—দ্য ডগ ফাদার। কারণ আর কিছুই নয়, কুকুরের প্রতি তাঁর ভালোবাসা। আর সে ভালোবাসার প্রমাণ পেয়েছে, এমন কুকুরের সংখ্যাও নিতান্ত কম নয়। কুকুরের সেবা-যত্নের জন্য তিনি আস্ত একটা প্রতিষ্ঠানই গড়ে তুলেছেন। তাঁর ব্যক্তি-উদ্যোগ আর ওই প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ মিলিয়ে এরই মধ্যে হাজার ছয়েক কুকুরের সেবা-যত্নের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

কুকুরের প্রতি তাঁর ভালোবাসার শুরুটা হয় বছর সাতেক আগে, ২০০৯ সালে। তত দিনে তাঁর রাইটার্স ব্লক বেশ দাঁড়িয়ে গেছে। স্ত্রী-পরিজন নিয়ে বেশ আয়েশি জীবন যাপন করছিলেন। যেমনটা প্রত্যাশা থাকে সবার। কিন্তু কেন যেন তাঁর জীবনটা ঠিক পূর্ণতা পাচ্ছিল না। কারণটি সে বছরই আবিষ্কার করে ফেললেন, যখন একটা পরিত্যক্ত ভীতসন্ত্রস্ত গোল্ডেন রিট্রিয়েভার জাতের কুকুর ঘরে নিয়ে এলেন। বুঝে গেলেন, এটিই তাঁর সেই স্বপ্নের কাজ, যে কাজ করার মধ্য দিয়ে একজন মানুষ জীবনের মানে খুঁজে পায়।

মাস তিনেক পর ঘরে আনলেন দ্বিতীয়টিকে। রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো একটি সাধারণ কুকুর। ব্যস, তার পর থেকে তাঁর বাসায় একের পর এক কুকুর আনতে লাগলেন। যখনই রাস্তায় কোনো বেওয়ারিশ, বিশেষ করে বুড়ো-রুগ্ণ কুকুর দেখেন, বাসায় নিয়ে আসেন রাকেশ। কিছুদিনের মধ্যেই এত কুকুর চলে এলো, বাসায় আর জায়গা হয় না। এদের সামলাতে তাঁর স্ত্রী রীতিমতো হিমশিম খেতে লাগলেন। তখন রাকেশ কুকুরগুলো বাসা থেকে নিয়ে গেলেন অফিসে। অফিসের সবচেয়ে ওপরের তলাটা খালি করে সেখানে বানানো হলো ডগ শেল্টার।

প্রায় সব শহরেই বেওয়ারিশ কুকুর বেড়ে গেলে সিটি করপোরেশন তাদের মেরেকেটে সংখ্যাটা কমিয়ে আনে। ২০১১ সালে ব্যাঙ্গালুরুতেও তেমনটি করা হলো। বিশালসংখ্যক কুকুর মারা হলো। ব্যাপারটা ভাবিয়ে তুলল রাকেশকে। গড়ে তুললেন ‘ভয়েস অব স্ট্রে ডগস’ নামে একটি ডগ রেসকিউ অরগানাইজেশন। পরের বছর সেই প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা জমি কিনলেন পাশের শহর দোদ বাল্লাপুরে। সেখানে গড়ে তুললেন আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধাসংবলিত একটি পূর্ণাঙ্গ ডগ শেল্টার। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব গাড়ি আছে, আছে ডিজিটাল ডাটাবেস, এমনকি জিপিএস ট্র্যাকিংয়ের ব্যবস্থাও। আর সেখানকার কুকুরগুলো কেবল বেওয়ারিশই নয়, বেশির ভাগই বুড়ো, নয়তো অসুস্থ। তাদের অনেকগুলোই হয়তো একসময় কারো পোষা কুকুর ছিল, পরে পরিত্যক্ত করে দিয়েছে। শেষবার যখন গুনে দেখা হয়েছিল, তাঁর এই শেল্টারে মোট কুকুরের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ৭৩৫-এ। আর এদের দেখাশোনার জন্য কাজ করেন ১০ জন কর্মী। একজন ভেটেরিনারি অ্যাসিস্ট্যান্টও আছেন। তাঁরা কেবল শেল্টারের কুকুরগুলোর সেবা-যত্নই করেন না, বিভিন্ন প্রয়োজনে শেল্টারের বাইরের কুকুরদেরও সেবা-যত্ন আর চিকিৎসা করেন। এরই মধ্যে তাঁরা শেল্টারের বাইরের অন্তত পাঁচ হাজার কুকুরের চিকিৎসা আর প্রয়োজনীয় সেবা-যত্ন করেছেন। আর শেল্টারের কুকুরগুলোর বারোমাসি দায়িত্ব তো আছেই। এখানকার কুকুরগুলোর জন্যই প্রতিদিন প্রয়োজন হয় ২০০ কেজি মুরগি আর ২০০ কেজি চাল। সব মিলিয়ে ওদের পেছনে প্রতিষ্ঠানটির দৈনিক খরচ সাড়ে ৬০০ থেকে সাড়ে ৭০০ ডলার। রাকেশ একাই সে খরচের ৯৫ শতাংশের জোগান দেন।

নিঃসন্দেহে এই বিপুল পরিমাণ টাকার জোগান দেওয়াটা বেশ কষ্টকর। তা ছাড়া খারাপ লোকেরও তো অভাব নেই। ব্যাঙ্গালুরুর পশুপ্রেমীসহ তাবৎ সাধারণ মানুষ যখন তাঁর এই কাজে মুগ্ধ, তখন কিছু লোক ঠিকই তাঁর সঙ্গে উত্কট রসিকতা করতে ছাড়েন না। ফেইক কল আসে প্রায়ই। সব মিলিয়ে তিনি সম্প্রতি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আর মুফতে কুকুর নেবে না ভয়েস অব স্ট্রে ডগস। এখন যদি কেউ তাঁর এই শেল্টারে কুকুর দিতে চান, তাহলে তাকে ৩৭ ডলার চার্জ পরিশোধ করতে হবে।


মন্তব্য