kalerkantho


রহস্যজট

হারু মাঝির পাঠশালা

ধ্রুব নীল

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



হারু মাঝির পাঠশালা

অঙ্কন : মানব

পশ্চিম আকাশে অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জ্বলজ্বলে চাঁদের আলোয় যখন হুরাসাগর নদীর ওপর কোনো একটা ইঞ্জিন নৌকা প্রায় নীরবে বিলি কেটে এগিয়ে যেতে থাকে, তখন হারু মাঝির মনে হয়, ঠিক হুবহু এই দৃশ্যটাই আগেও সে দেখেছে। দেখতেও পারে।

নদী সহসা বদলায় না। একই দৃশ্য ঘুরেফিরে তৈরি করে।

আজ সন্ধ্যা হতে না হতেই নদীর তীর নীরব-নিথর। অন্য সব দিনের মতো হারু মাঝির সঙ্গে তীরে এসে গল্প জমিয়েছে নিতুনের ছেলে সুজন। বাপের মতো সেও মাছের কারবারি হচ্ছে। স্কুলেও যায় নিয়মিত। আজ সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় সারা দিন টইটই করে ঘুরেছে। সপ্তাহে বেছে বেছে এ দিনটা সে মাঝরাত পর্যন্ত বাবার সঙ্গে মাছ ধরে। মাঝে শুধু হারু মাঝির সঙ্গে কয়েক ঘণ্টা কথাবার্তা চালায়।

হারু মাঝির আবার দিনক্ষণের হিসাব নেই। সে প্রতিদিনই এ সময় নদীর তীরে সময় কাটায়। সুজন এলেই হারু মাঝি হয়ে যায় তার শিক্ষক।

‘উই যে দেখতাসো উপার থেকে আসা চকচকা লুঙ্গি পরা লোকটা। ’

‘চকচকা সাদা লুঙ্গি পরা ওইটে?’

‘হুম। ও এই গেরামে আসতেসে চুরি করতে। ’

‘হে হে। কেমনে বুঝলা হারু মাঝি?’

হারু মাঝি বর্ণনা দেয়। গুরুর দীক্ষাদানের মতো। সুজন মনোযোগ দিয়ে শোনে। শুনতে শুনতে পুলক বোধ করে। তার মনে হয়, তাই তো! মাঝরাত্রিরে আলকাতরা টানা নৌকায় কেউ চকচকে নতুন লুঙ্গি পরে উঠবে কেন! লুঙ্গি চকচকে, কিন্তু চুল এলোমেলো। ফিটফাট হলে আঁচড়ানো থাকত চুল। তার মানে লুঙ্গিটা চুরি করেছে হয়তো। বাকি যাত্রীরা যখন ঢুলুঢুলু, সে তাকিয়ে আছে ঠায়। বকের মতো। নৌকা থেকে নামতে হারু মাঝি তাকে আরো বুঝিয়ে দিল যে লোকটার হাতে থাকা চামড়ার ব্যাগটা বেশ ভারী। সে যেভাবে ওটাকে আগলে রেখেছে, তাতে বোঝা যায় ওটাই তার সম্বল। চুরি করার যন্ত্রপাতি আছে মনে হয়। শেষে সুজনের মনে হয়, লোকটা যে একটা চোর এটা তার আগেই ধরা উচিত ছিল।

এবার তীরে আসা এক বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে সুজন বলল, বুইড়ারে দেইখা মনে হইতেসে তার ছাগল চুরি গেসে। তা না হইলে এত রাইতে!

‘হুমমম। ’ হারু মাঝির হুমম শুনে কিশোর সুজন বুঝে নিল তার ‘দেখা’ হয়নি। চোখ সরু করে তাকাল। বৃদ্ধের পরনে পাতলা স্যান্ডো গেঞ্জি, পুরনো মলিন পায়জামা। হাতে একটা চিকন লাঠির মতো। সহসা চিনতে পারছে না সুজন।

‘বুইড়া এত রাইতে যদি বাইর হয় তয় লুঙ্গি পরনের কতা। গেঞ্জির লগে পায়জামা পইরা কেউ এত দূর আইব না। তার মানে মাথায় ছিট আছে মনে হয়। ’

‘উঁহু। কথা একটু হাচা। তবে পুরা কাহিনি এইটা না। হাতের লাডিডা দেখো বাপু। এইডা গরু-ছাগলের না। এইটা পুলাপাইন পিডানোর। লোকটা মনে হয় আগে স্কুলে পড়াইত। এখন মাথা গেছে। নদীর দিকে চাইয়া আছে কেমুন কইরা। মনে হয় তার পুলা নদীতে ডুইবা মইরা গেসে। এখনো তার মাঝেমইদ্যে মনে হয়, এত রাইত হইসে কিন্তু পুলা অহনও বাড়িত ফিরতাসে না কেন। এই জন্য বেত লইয়া পুলারে মাইরতে বাইর হইসে। ’

‘আরে, চিনবার পারসি! এ তো রতনদার বাপ। রতনদা মইরা গেসিল তিন-চাইর বছর অইব। নদীর ওইখানে। বাপটা নাকি পাগল হইয়া গেসিল। ’

হারু মাঝি ক্ষণিকের জন্য বিষাদগ্রস্ত হয়। তবে বিষণ্নতার এ আচমকা ঝাপটা কিশোরকে স্পর্শ করতে পারে না। সে তার গোয়েন্দাগিরি চর্চার নতুন উপকরণ খুঁজতে থাকে। দূরে তাকিয়ে একটা ইঞ্জিন নৌকার আরোহীদের দেখে সচকিত হয়।

‘ও মাঝি, দেহ তো এরা কারা?’

নৌকায় দুই কিশোরী আর এক শিশু। শিশুটা মায়ের কোলে ঘুমিয়ে আছে। এ মাঝিকে আগে কখনো দেখেনি। ইঞ্জিন নৌকায় সিদ্ধহস্ত নয় সে, তা চালানো দেখেই বোঝা যায়।

‘আমার তো মনে হইতেসে মাঝি, এইখানেও ঘাপলা আছে। ’

সুজনের কথা শুনে হারু মাঝির উচ্ছ্বাস হয়। তবে তা প্রকাশ করে না। ছেলেটা দ্রুত শিখছে। হারু মাঝি কিছুক্ষণ নৌকাটার দিকে তাকিয়েই ধরে ফেলল ঘাপলাটা। তবে নিশ্চিত এখনো হতে পারেনি।

দুই কিশোরী ঢুলু ঢুলু চোখে তাকিয়ে আছে দূরে। মাঝির পরনে প্যান্ট আর পাঞ্জাবি। বাচ্চাদের মা তার কোলের শিশুটাকে পাটাতনের এক পাশে শুইয়ে দিল। নৌকা খুব একটা দুলছে না। পড়ে যাওয়ার ভয় নেই। কিশোরী দুজনের মাথায় নিপাট বিনুনি করা। দুজনই জড়োসড়ো হয়ে বসে পানির দিকে তাকিয়ে আছে। দুজনের কাঁধে স্কুলব্যাগের মতো দেখতে একটা করে ব্যাগ।

‘আমার পরথম কথা হইলো, এই বেটা মাঝি না। তার নৌকা চালানি হইতাসে না। ’

‘দারুণ কইছ তো সুজন বাহাদুর। ’

‘লুকটারে দেইখাও মাঝি মনে হয় না। তার মাইনে ঘাপলা আছে। ’

সুজনের চকচকে চোখ দেখে একটা কিছু আশা করতে শুরু করে দেয় হারু মাঝি। নিজের সংসার নেই। তবে পিতৃত্বের স্বাদ থেকে নিজেকে আপাতত বঞ্চিত করতে চায় না সে। এবার চিন্তার সাগরে জোয়ার এনে দিতে আরো কিছু ক্লু ছেড়ে দেয় হারু মাঝি।

‘বড় ঘাপলাটা হইল তাইলে আসল মাঝি কই গেল? আর এই লোক তার পরিবার সমেত কই যাবে? নৌকা রাখবে কই? তবে দেখি আর কী কী বাইর করতে পারে আমাদের সুজন বাহাদুর। ’

বাকিটা বলে সুজন, ‘দেইখা মনে হয় এগো টেকা-পয়সা খুব একটা নাই। নৌকার মায়া ছাইড়া যদি কোথাও যাইতে হয়, তার মাইনে ঘটনা সিরিয়াস। ’

হারু মাঝির চেহারাই বলে দেয়, বিষয়টাকে এখনো সে অতটা গুরুত্বের সঙ্গে নেয়নি। সুজনের মুখে ‘সিরিয়াস’ শুনে এক ধরনের আনন্দমাখা বিস্ময় জাগে। নৌকাটা আরো কাছে আসতেই হারু মাঝি ঠায় তাকিয়ে থাকে। সুজনের মনোযোগ ততক্ষণে সরে গেছে দূরের কোনো এক ছইওয়ালা নৌকায়। সেখানে নতুন রহস্য খুঁজছে ও।

নৌকাটা আরো কাছে। দৃশ্যমান হচ্ছে মুখগুলো। নৌকার হাল ধরে রাখা লোকটা আয়েশ করে পান চিবোচ্ছে। দুই কিশোরীকে দেখছে আড়চোখে। চেহারার মিল নেই খুব একটা। সম্ভবত বাবা নয়। পাটাতনে শুয়ে থাকা বাচ্চাটা কেঁদে উঠতেই খেঁকিয়ে উঠল ওই নারী। এরপর ফিডার খুলে মুখে ধরিয়ে দিল। বাচ্চা চুপ। কিশোরী দুজন কী যেন বলতে গিয়েও পারল না। ধমক খেয়ে চুপসে গেল।

খানিক পর এক কিশোরী এগিয়ে গিয়ে কী যেন বলল মাঝিকে। প্রথমে খেঁকিয়ে উঠলেও পরে একটা পুঁটলি দেখিয়ে দিল। সেখান থেকে দুটি কলা আর পাউরুটি বের করে নিল কিশোরী। সব কিছু বেখাপ্পা লাগলেও, হারু মাঝির মনের কোণে যে বিষয়টা উঁকি দিচ্ছে, সে বিষয়ে এখনো সে নিশ্চিত হতে পারছে না।

‘আইচ্ছা, হ্যারা যদি পুলাধরা হয়, তাইলে আমরা কী করুম!’

হারু মাঝির আশঙ্কাটাই হড়বড় করে বেরিয়ে গেল সুজনের মুখ দিয়ে। তবে উত্তর শোনা গেল না। মাঝি তার চোখ সরু করে আরো বড় কিছু খুঁজছে। যদি ছেলেধরা না-ই হয়, তবে শুধু শুধু অভিযোগ নিয়ে আসাটা সমীচীন হবে না। তার আগে নিশ্চিত হতে চায় হারু মাঝি। নৌকা তীরে ভিড়তেই হারু মাঝি আর সুজন দেখল, মেয়ে দুটি সহজে নামতে চাচ্ছে না। ধমক দিয়ে নামাতে হলো। এগিয়ে গেল হারু মাঝি ও সুজন। সুজনের ইশারা পেয়ে দূর থেকে তার বাবা ও সঙ্গের অন্য জেলেরাও আসছে।

দুই কিশোরীকে দেখেই মনে হয়, এরা লেখাপড়া করে এবং ক্লাসেও ফার্স্ট-সেকেন্ড হয়। কিন্তু তাদের সঙ্গে থাকা বড় দুজনকে দেখে মোটেও শিক্ষিত মনে হয় না।

‘খুকি, এই লোক আর মহিলা তোমাদের কী হয়?’

কিশোরীদের একজন চুপ করে থাকে। আরেকজন কাঁপা কাঁপা গলায় বলে, ‘আমার আব্বা আর আম্মা। ’

‘কী চাই মিয়া! কেন ঝামেলা পাকাইতেসেন। রিনা-মিনা তোরা কতা কইস না। অচেনা লোক। সুবিধার না। ’

‘ওই ব্যাটা ঠিক কইরা কতা ক। ’ শাসিয়ে উঠল সুজন। তার বাবা ও অন্যদের আসতে এখনো অনেক পথ বাকি। সময় কাটানোর জন্য হারু মাঝি বলল, ‘না, কইতেসিলাম রাইতের বেলায় নৌকা রাখবেন কই?’

‘ওইটা মিয়া আমার টেনশন। আপনার টেনশন করতে হইব না। আমার নৌকা আমি নদীতে ভাসাইয়া দেই না কী করি, আমি দেখুম। ক্যান, চোরচামার আছে নাকি এইখানে?’

সুজন একটা কিছু বলতে গিয়েও পারল না। মেয়ে দুটি কেন প্রতিবাদ করছে না, সে বুঝতে পারছে না। নাকি সত্যি সত্যি মা-বাবাই। জোর করে কোথাও নিয়ে যাচ্ছে।

‘খুকি, তোমার নাম কী?’

এক কিশোরীর কাছে জানতে চাইল হারু মাঝি। কিশোরী খানিকটা ভেবেচিন্তে বলল, ‘জি, আমি রিনা। ও মিনা। ’

‘এত রাইতে তোমরা কই যাও?’

‘বড় খালার বাড়ি। ’

‘ওই, তোরা চুপ কর’ বলে আবারও চেঁচিয়ে উঠল লোকটা। তবে গায়েগতরে হারু মাঝির সঙ্গে পেরে উঠবে না বলেই হয়তো তেড়ে আসছে না। সঙ্গের ওই মহিলা এরই মধ্যে কোলের বাচ্চাটাকে নিয়ে হাঁটা শুরু করেছে।

‘খালার বাড়িতে বেড়াতে যাইবা? তা এমন জামাকাপড় পইরা যাইতেসো ক্যান?’

‘ওগোরে স্কুল থেইকা আনসি। রেডি হওনের টাইম পায় নাই। ওগো বড় খালার বাসায় পাত্র আইব দেখতে। ওগো বিয়া দিমু। এইবার সরেন। ’

হারু মাঝি কী যেন ভাবছে। কিন্তু সুজন আর ভাবল না আর। সে নিশ্চিত হয়ে গেছে যে এই লোক ছেলেধরা। জাপটে গিয়ে ধরতেই লোকটা ঝটকা মেরে সরিয়ে দিল সুজনকে। কিন্তু হারু মাঝির পেটা শরীরের কাছে হার মানতে বাধ্য হলো। সুজনকে ইশারা করতেই সে দৌড় লাগাল কোলে বাচ্চা হাতে দৌড়াতে থাকা ওই মহিলার দিকে। হারু মাঝির বুঝতে এক সেকেন্ডও লাগল না যে কেন পাচারকারী লোকটাকে বাঁচাতে চেয়েছে দুই কিশোরী।

সুজন কী করে নিশ্চিত হলো? আর দুই কিশোরী কেন মিথ্যা বলেছে?


মন্তব্য