kalerkantho


অন্য রকম

শহরের নাম ডিমেনশাভিল

অমর্ত্য গালিব চৌধুরী

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



শহরের নাম ডিমেনশাভিল

ডিমেনশা, সোজা বাংলায় স্মৃতিভ্রংশ রোগ। অদ্ভুত এই রোগে রোগী ভুলে যান তাঁর অতীত, বদলে যায় ব্যক্তিত্ব, পাল্টে যায় আচরণ। ডিমেনশায় আক্রান্ত মানুষ ক্রমেই ভুলে যেতে থাকেন পরিচিত মুখগুলো, আক্রান্ত হতে পারেন জ্যাকব ডিজিজ বা অ্যালঝেইমারের মতো জটিল সব মানসিক রোগে।

স্বাভাবিকভাবেই ডিমেনশা রোগীরা সমাজে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন না। তাঁদের জন্য রয়েছে বিশেষ কেয়ার হোমের। তবে হগওয়ে নিরাময়কেন্দ্রটি মোটেই সাধারণ কোনো কেয়ার হোম নয়। নেদারল্যান্ডসের রাজধানী আমস্টারডাম থেকে মাত্র ২০ মিনিটের দূরত্বে অবস্থিত ‘হগওয়ে’তে ছোট একটা শহরই গড়ে উঠেছে ভুলোমনা মানুষদের জন্য। এবার বরং আজব এই শহরের যাত্রা শুরু হলো কিভাবে, তা জেনে নেওয়া যাক।

সালটা ছিল ১৯৯৩। হগওয়ের কর্তাব্যক্তি ও চিকিৎসকরা দেখলেন, প্রচলিত পদ্ধতিতে এসব ভুলোমনা রোগীর চিকিৎসা করে বিশেষ সুবিধা হচ্ছে না, রোগ ভালো হওয়ার লক্ষণও সীমিত। অনেক ভেবেচিন্তে তাঁরা ঠিক করলেন ডিমেনশা রোগীদের জন্য এমন একটি ছোট্ট শহর তৈরি করা হবে, যেখানে থাকবে তাঁদের নিজেদের বাসা, দোকানপাট এমনকি চুল কাটার সেলুনও।

রোগীরা সেখানে থাকবেন, কেনাকাটা করবেন, ঘুরবেন খেয়ালখুশিমতো। অর্থাৎ অল্প কথায় সাধারণ মানুষ যেভাবে জীবন যাপন করে, ঠিক সেভাবেই থাকবেন।

ছোট্ট এই শহরের নামকরণ হয় ডিমেনশাভিল, বাংলায় বলা চলে ভুলোমনা বা স্মৃতিভ্রংশ মানুষদের শহর। ডিমেনশাভিলের রোগীদের এই সমাজকে হরে দরে মোট সাতটি শ্রেণিতে ভাগ করা চলে। এখানকার মানুষরা কেউ অভিজাত, কেউ বা শ্রমজীবী, কেউ ইন্দোনেশিয়া (দেশটি একসময় নেদারল্যান্ডসের উপনিবেশ ছিল) থেকে আগত অভিবাসী, কেউ সংস্কৃতিমনা, আবার কেউ নেহাতই ছাপোষা সাধারণ মানুষ। এই সব শ্রেণির জন্য বানানো হয়েছে বিশেষ আবাসন, ব্যবস্থা করা হয়েছে বিশেষ কাজকর্মের। ফলে এখানকার রোগীরা আর দশটা মানসিক চিকিৎসাকেন্দ্রের মতো ডাক্তারদের কড়া নজরদারিতে নিজস্ব কেবিনে বন্দি থাকেন না; থাকেন মুক্ত, স্বাধীন, স্বাভাবিক মানুষের মতো। সুস্থ অবস্থায় যে জীবনে অভ্যস্ত ছিলেন, এর সব অনুষঙ্গই রয়েছে এই ডিমেনশাভিলে।

ধরা যাক, কেউ হয়তো অসুস্থ হয়ে পড়ার আগে বিলাসী জীবন যাপন করতেন। তাঁর জন্য এখানে রয়েছে বেশ কেতাদুরস্ত বাড়ি-ঘর, কাজকর্ম করে দেওয়ার জন্য রয়েছে কর্মচারী, যারা কিনা আসলে হগওয়ে চিকিৎসাকেন্দ্রের কর্মচারী। আবার ধরা যাক শ্রমজীবী কোনো ডিমেনশা রোগী, যিনি পরিবারের সবাইকে নিয়ে রাতের খাবার খেতে অভ্যস্ত, তাঁকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য রয়েছে লোকজন। যেহেতু ভুলোমনা এই মানুষগুলো পরিচিত লোকদের মনে রাখতে পারেন না, হগওয়ের কর্মচারীরা ভান করে, তারা আসলেই তাঁদের পরিবারের সদস্য। ফলে ডিমেনশায় আক্রান্ত মানুষটির মনে এ ধারণা জন্ম নেয়, তিনি কোনো হাসপাতালে নয়; বরং নিজের পরিবারের সঙ্গেই রয়েছেন। এভাবে প্রতিটি রোগীর অতীত জীবনের সঙ্গে মিল রেখে এখানে গড়ে তোলা হয়েছে এক কৃত্রিম পরিবেশ।

কিন্তু এত শ্রেণির মানুষ রাখার কিঞ্চিৎ সমস্যাও রয়েছে, সবাই যদি একে অপরের সঙ্গে মেশার সুযোগ পান, তাহলে এই কৃত্রিম ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। সে কথা ভেবেই প্রত্যেক শ্রেণির মানুষকে এখানে আলাদা করে রাখা হয়। অর্থাৎ ইন্দোনেশীয় অভিবাসীরা কেবল নিজেদের মধ্যেই মেলামেশা করতে পারেন।

অবশ্য এসবের মানে এই নয় যে রোগীদের একেবারে ছেড়ে দেওয়া হয়। প্রত্যেক রোগীর দেখাশোনা করার জন্য বিশেষ কর্মচারী আছে, প্রস্তুত থাকেন চিকিৎসকরাও। তবে খুব প্রয়োজন না পড়লে তাঁরা দেখা দেন না। ফলে এই কৃত্রিম জীবনব্যবস্থার মূল পরিচয়টা সাধারণত রোগীদের কাছে অজ্ঞাতই থেকে যায়।

২০ বছর ধরে হগওয়ে এই পদ্ধতিতেই চিকিৎসা চালিয়ে আসছে তাদের ‘ডিমেনশাভিল’-এ। বর্তমানে সেখানে মোট ১৫২ জন রোগী আছেন। গোটা বিশ্বে এই ব্যতিক্রমী চিকিৎসাপদ্ধতি এরই মধ্যে দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সুইজারল্যান্ড, জাপান আর জার্মানিতেও এ রকম ডিমেনশাভিল তথা ভুলোমনাদের শহর গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

 


মন্তব্য