kalerkantho


খেয়ালি সব চরিত্র

স্বঘোষিত রাজার রাজত্ব

পৃথিবীর বাতিকগ্রস্ত মানুষের অভাব নেই। এদের একেকজনের কাজ-কারবারের বর্ণনা শুনলে চোখ কপালে উঠবে। খেয়ালি এই মানুষগুলোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন নাবীল আল জাহান

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



স্বঘোষিত রাজার রাজত্ব

১৯৭৭ সালের ১ এপ্রিল। হে শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ওয়ে নদীর বুকে একটা ছোট্ট নৌকা ভাসছিল। সে নৌকার বুকে দাঁড়িয়ে এক পাগলাটে লোক একবার বন্দুক ছুড়লেন। ব্যস, সেদিন থেকেই হে শহরে এক নতুন যুগের সূচনা হলো। তার আগ পর্যন্ত লোকটির নাম ছিল রিচার্ড বুথ। সেদিন থেকে তিনি হয়ে গেলেন হে অন ওয়ের প্রথম রাজা—প্রথম রিচার্ড।

হে শহরটি নিতান্তই ছোট্ট। শহর না বলে ওটাকে শহরতলিও বলা যায়। ওয়েলসের মানে, গ্রেট ব্রিটেনের শহরটিতে ব্রিটেন প্রশাসনের অধীনে পৌরসভা আছে, আছেন মেয়রও। কিন্তু সেসব রিচার্ডের পছন্দ হয়নি। বিভিন্ন আমলাতান্ত্রিক নিয়মনীতির ওপর তিনি রীতিমতো বিরক্ত হয়ে উঠেছিলেন।

তাঁর মনে হয়েছিল, এসব নিয়মনীতি শহরটিকে দিন দিন আরো গরিব করে তুলছে। সে চিন্তা থেকেই একদিন আচমকা তাঁর মাথায় আসে স্বাধীনতা ঘোষণার এই যুগান্তকারী ভাবনা।

স্বভাবতই প্রশ্ন উঠল, হে অন ওয়ে না হয় স্বাধীন রাজ্য হলো। কিন্তু সে রাজ্যের রাজা রিচার্ড হলেন কী যোগ্যতায়? বিশেষত তাঁকে দেখলে রাজা তো দূরে থাক, কোনোভাবেই রাজপরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলেই মনে হয় না। মাথাভর্তি এলোমেলো চুল, চোখে পুরু ফ্রেমের চশমা। পরনের পোশাক-আশাক আরো অদ্ভুত। তবে এটা সত্যি, শহরটির সবচেয়ে বড়লোক ছিলেন আসলে তিনিই। পারিবারিকভাবেই শহরের বনেদি বংশের ছিলেন তাঁরা। বাবা তাঁকে অক্সফোর্ডে পড়তে পাঠিয়েছিলেন। তিনি সেখানে খুব একটা স্বস্তি পাননি। তখন তাঁদের আর্থিক অবস্থাও খুব একটা ভালো যাচ্ছিল না। তাই বাবার জোরাজুরিতে এক বড় শহরে গিয়ে একটা ফার্মে অ্যাকাউন্ট্যান্টের চাকরিতে যোগ দেন। কিন্তু সপ্তাহ তিনেক পার না হতেই তাঁর চাচা মেজর উইলি বুথ মারা যান। আর সে চাচার সব সম্পত্তি চলে আসে তাঁদের অধিকারে। ব্যস, ওখানেই চাকরিবাকরির ইতি। তিনি যে প্রাসাদটিকে হে অন ওয়ের রাজপ্রাসাদ বানান, নাম দেন হে ক্যাসল, সেটিও ওই চাচার ছিল।

আর এই হে অন ওয়েই বিখ্যাত হে ফেস্টিভালের আয়োজক শহর। নিজেকে রাজা ঘোষণা করার আগেই রিচার্ড বুথ হে অন ওয়ের প্রথম পুরনো বইয়ের দোকান খোলেন। তাঁর দেখাদেখি এমন পুরনো বইয়ের আরো অনেক দোকান গজিয়ে ওঠে। সত্তরের দশকের শেষ দিকে—অর্থাৎ রিচার্ড নিজেকে রাজা ঘোষণা করার পর হে হয়ে ওঠে বইয়ের নগরী। তারপর রিচার্ড বুথ বিভিন্ন বড় কম্পানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ছোট দোকানগুলো যেন টিকতে পারে, সে জন্য নানা উদ্যোগ নিলেন। স্থানীয় দোকানের বানানো রুটিকে হে অন ওয়ের জাতীয় রুটি হিসেবে ঘোষণা করলেন। এমনকি ব্রিটেনের জাতীয় বিদ্যুৎ বোর্ডকে পাত্তা না দেওয়ার বন্দোবস্তও করলেন। শহরের ডজন ডজন মানুষের বাসায় বায়ু ও পানিচালিত জেনারেটর বসানোর ব্যবস্থা করা হলো। তিনি কিছু পাসপোর্টও ছাপিয়েছিলেন। ওয়ে নদী পার হওয়ার জন্য সেই পাসপোর্ট নিতে হতো। একেকজনের খরচ পড়ত ২৫ পয়সা করে। আবার রাজপরিবারের পক্ষ থেকে কিছু উপাধি বিক্রিরও ব্যবস্থা করেছিলেন। নাইটহুড পেতে খরচ দেড় ইউরো, আর্লডম পেতে ১৫ ইউরো আর ডিউকডোম পেতে খরচ পড়ে ২৫ ইউরো। রিচার্ড অবশ্য শুধু কোষাগার ভরারই ব্যবস্থা করেননি, রাজ্য চালানোর জন্য কিছু লোকজনও নিয়োগ দিয়েছিলেন। তাঁর বাগানের মালি চার্লিকে করেছিলেন কৃষিমন্ত্রী। তাঁর এক প্রতিবেশী, যিনি নিয়মিত হেয়ারফোর্ড যেতেন, তাঁকে করেছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তবে সবচেয়ে অদ্ভুত ছিল প্রধানমন্ত্রী। সে পদ দিয়েছিলেন তাঁর ঘোড়া ওয়াটার্টনকে। অবশ্য তাঁর নিজের আর অন্যদের এসব পদ ছিল অনেকটাই প্রতীকী। তাই এসব খেয়ালি কাজ-কারবারে সরকারিভাবে বড় ধরনের কোনো বাধা আসেনি। রিচার্ড যেদিন হে রাজ্যের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন, ১৯৭৮ সাল থেকে সেদিনটিকে হে ডে হিসেবে পালন করা শুরু করেন। এমনকি তাঁর রাজ্যের একটা জাতীয় সংগীতও আছে। হে ডে-তে কেবল ওই গানই না, হে শহরে রীতিমতো উৎসবের আয়োজন করা হয়।

অবশ্য এখন আর হে শহরের এই রাজা শহরটিতে থাকেন না। ২০০৫ সালের আগস্টে তিনি বেশ কিছু সম্পত্তি বিক্রি করে জার্মানিতে গিয়ে থাকার ঘোষণাও দেন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য রিচার্ড জার্মানিতে বসতি গাড়েননি। তিনি এখন থাকেন ব্রিনমেলিনে। তবে হে শহরে এখনো তাঁর বইয়ের দোকান আছে। ওটার নাম—দ্য কিং অব হে। ২০১৪ সাল থেকে হে রাইটার্স সার্কেল তাঁর নামে পুরস্কার দেওয়াও শুরু করেছে। শহরের মেয়রসহ কর্তাব্যক্তিরাও তাঁকে যথেষ্ট মান্যগণ্য করেন। রাজা বলে কথা!


মন্তব্য