kalerkantho


রহস্যজট

তৃতীয় পাতায় দেখুন

ইশতিয়াক হাসান

১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



তৃতীয় পাতায় দেখুন

অঙ্কন : মানব

বরিশালে লঞ্চ এসে পৌঁছল ভোর ৫টার আগে। একটু পরই ভোর হলো। গোয়েন্দা রবিন হাসান বারান্দায় দাঁড়িয়ে কীর্তনখোলা নদীর দিকে তাকাল। কুয়াশার কারণে বেশি দূর দৃষ্টি যায় না। এই প্রথম বরিশালে এলো সে। রাতটা লঞ্চে ভালোই কেটেছে। নদীতে পানি কম থাকায় তেমন দুলুনিও ছিল না। তবে একবার একটা বালুর চরে প্রায় আটকে গিয়েছিল লঞ্চ। বরিশালে আসা একটা তদন্তেই। একটু পরই দেখল, এক তরুণ এসে পাশে দাঁড়িয়েছে। বিনয়ের সঙ্গে জানতে চাইল, ‘আপনিই রবিন হাসান?’ মাথা নেড়ে সম্মতি জানাতেই হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘আমিই আবীর আহমেদ।

’ হাতটা ধরে ঝাঁকাল একবার রবিন। ভালোভাবে দেখল আগন্তুককে। উচ্চতা মাঝারি। বয়স তার মতোই। ৩০-৩২। ফর্সা চেহারা। চোখে চশমা। বেশ পুরু মোচ আছে। তবে দাড়ি কামানো। এই আবীর সাহেবের আমন্ত্রণেই তার বরিশালে আসা। একটা ধাঁধার সমাধান করতে হবে। তবে এর চেয়ে বেশি কিছু জানে না। একই সঙ্গে রথ দেখা আর কলা বেচা—অর্থাৎ বরিশাল দেখা আর রহস্যের সমাধান দুটিই হয়ে যাবে, তাই কেসটা নিতে দেরি করেনি ও।

ঘাট থেকে বের হয়ে আবীর আহমেদের পিছু পিছু একটা গাড়িতে এসে উঠল। পুরনো মডেলের টয়োটা করোলা। আবীর সাহেব নিজেই চালকের আসনে বসল। পাশের সিটটায় উঠে পড়ল রবিন। গাড়িটা যাওয়ার পথে দুই পাশের দৃশ্য দেখতে দেখতে টুকটাক কথা হলো। জানা গেল, আবীর আহমেদের বাবা ছিলেন তাঁর মা-বাবার একমাত্র সন্তান। আবীবের দাদা মারা গেছেন বেশ কয়েক বছর আগে। তবে দাদি মারা গেছেন বছর দুয়েক আগে। আর দাদির একটা ডায়েরি ঘিরেই রহস্যের সূত্রপাত। বিস্তারিত কিছু বলার আগেই একটা দোতলা বাড়ির সামনে এসে থামল গাড়ি। একটু পুরনো নকশার বেশ সুন্দর চেহারার সাদা চুনকাম করা বাড়ি।

‘এই জায়গাটা নথুল্লাবাদ। আর এটাই আমাদের বাড়ি। দাদা তৈরি করেছিলেন। এখনো বেশ ভালো অবস্থায় আছে। আমরা শুধু চুনকাম আর টুকটাক মেরামত করিয়েছি মাঝেমধ্যে। ’ জানাল আবীর।

রবিনকে বাড়ির ভেতরে নিয়ে এলো। বিশাল ড্রয়িংরুম। এর পাশ থেকেই ঘোরানো সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলায়। আবীরের পিছু পিছু দোতলার একটি কামরায় চলে এলো রবিন। ‘আপনি হাত-মুখ ধুয়ে নিন। নাশতা করে বিস্তারিত কথা বলব। ’ বলে বিদায় নিল আবীর। কামরাটা দেখল ঘুরেফিরে। জানালা দিয়ে হাত বাড়ালেই পাশের পেয়ারাগাছটা ছোঁয়া যায়। ওটায় বসে কিচিরমিচির করছে কয়েকটি পাখি। পরিবেশটা পছন্দ হয়ে গেল রবিনের। হাত-মুখ ধুয়ে নাশতা সেরে বাড়ির অন্য সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল আবীর। তারপর ওকে নিয়ে এলো দোতলার অপর পাশের একটি কামরায়। ভালোভাবে চারপাশে তাকাল রবিন। বিশাল পুরনো আমলের খাট। দেয়ালের পাশ ঘেঁষে দুটি কাঠের পুরনো আলমারি। একটার রং আবার লাল। পুরনো একটা ওক কাঠের টেবিল। বিশাল দুটি জানালা। ওকে বিছানায় বসতে বলে আবীর কথা শুরু করল, ‘এটা আমার দাদির কামরা। দাদি মারা গেছেন তা বছর দুয়েক হলো। আমাকে খুবই ভালোবাসতেন। বলা যায়, তাঁর জান ছিলাম আমি। এর একটা বড় কারণ, দাদা-দাদির মতো আমি বই পড়তে ভীষণ ভালোবাসি। মারা যাওয়ার আগে একদিন আমাকে বললেন, দাদির মৃত্যুর পর তাঁর ডায়েরিটা যেন একটু ভালোভাবে খেয়াল করি। তখন এটাকে অসুস্থ অবস্থায় নিছক খেয়ালের বশে বলা কথা বলে উড়িয়ে দিই। অবশ্য ডায়েরিটা যে একবার উল্টেপাল্টে দেখিনি তা নয়। কিন্তু তখন তেমন কিছু চোখে পড়েনি। গত সপ্তাহে কী মনে করে আরেকবার উল্টেপাল্টে দেখছিলাম। হঠাৎ ২২ আগস্টের এন্ট্রিতে এসে চোখ আটকে গেল। প্রথম কয়েক লাইনে তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু নেই। তার পরই এক জায়গায় লেখা—‘আজ তোমার জন্মদিন আবীর। এই জন্মদিনে তোমার জন্য ছোট্ট একটা উপহার রাখছি। তবে এটা পেতে একটু বুদ্ধি খাটাতে হবে। মনে রাখবে, এটা খুঁজে বের করার চাবিকাঠি আছে তোমার কাছেই। আর বই কিন্তু আমার প্রিয়। তোমার প্রিয় জিনিস আমারও প্রিয়। ’

ব্যস, এই কয়েক লাইনই! আর কিছু লেখা নেই। ভ্রু কুঁচকে আবীরের দিকে তাকাল রবিন। এক মুহূর্ত ভেবে আবীর বলল, ‘আমার প্রিয় জিনিস বলতে দাদি কী বোঝাতে চেয়েছেন অনেক ভেবেছি। বারবার বইয়ের কথাই মনে পড়ছে। ’

‘আপনাদের সবার বই খুব প্রিয়। কিন্তু বাড়িতে এখন পর্যন্ত এখানে-সেখানে দু-চারটি বই দেখলাম শুধু। ’

‘স্বাভাবিক। আসলে দাদা আর দাদি বই এতই ভালোবাসতেন যে তাঁদের বইয়ের জন্য আলাদা একটা বাড়িই ছিল। চলুন আপনাকে বরং সেখানে নিয়ে যাই। ’

আবীরদের বাড়ির পেছনেই একটা বাঁশঝাড়। ওটার গোড়া থেকেই বড় গাছের একটা বাগান। আম, জাম, কাঁঠালসহ হরেক জাতের গাছগাছালিতে ঠাসা। ওগুলোর ভেতর দিয়ে মিনিট দুয়েক হাঁটতেই ওটা চোখে পড়ল। একটা কাঠের বাংলো মতো বাড়ি। তিনটি সিঁড়ি পেরিয়ে বাড়ির বারান্দায় উঠে চাবি দিয়ে দরজা খুলল আবীর। আর ভেতরে ঢুকতেই রবিন যেন অন্য এক জগতে চলে গেল। দুই পাশে ছাদ পর্যন্ত কাঠের আলমারি। আর ওগুলোর মধ্যে শুধু বই আর বই। আলমারির সামনে কাচ নেই। কিন্তু তার পরও বইগুলোতে ধুলাবালি চোখে পড়ল না। ‘এই লাইব্রেরি বাড়িটা ঝেড়েমুছে পরিষ্কার রাখেন করিম ভাই। দাদার আমল থেকেই এ বাড়িতে আছেন। কখনো আমিও হাত লাগাই। নিজে বই পছন্দ করি। তার চেয়ে বড় কারণ, বইগুলোর মধ্যে দাদা আর দাদির স্মৃতি আছে সবচেয়ে বেশি। ’

ভালোভাবে চারপাশ ঘুরে দেখতে লাগল। বাংলা-ইংরেজি সব ধরনের বই আছে। উপন্যাস, রহস্য উপন্যাস, আত্মজীবনী, রূপকথা, ভ্রমণ, শিকার কাহিনি, অনুবাদ—কী নেই! এমনকি অনেক পুরনো দুষ্প্রাপ্য বইও আছে। রবিন হঠাৎ প্রশ্ন করল, ‘আচ্ছা, ধরে নেওয়া যাক, দাদি আপনার প্রিয় জিনিস বলতে বই বুঝিয়েছেন। আচ্ছা, তাঁর প্রিয় আর আপনার দুজনের প্রিয়—এ ধরনের বই কী হতে পারে?’

এক মুহূর্ত ভেবে আবীর বলল, ‘আমার এখন একটা কথা মনে পড়ছে। কিশোর বয়সে গোয়েন্দা কাহিনির পোকা ছিলাম। আর দাদি বেছে বেছে দারুণ সব বই দিতেন আমাকে। অনেক সময়ই দাদাকে দিয়ে ঢাকা থেকে বই আনাতেন আমার জন্য। কলকাতা থেকেও বই আনিয়ে নিতেন কখনো কখনো। ’

এই বলে ঘরের বড় কামরাটা থেকে পাশের ছোট একটা কামরায় চলে এলো রবিনকে নিয়ে। তারপর পাশাপাশি দুটি আলমারি দেখিয়ে বলল, ‘এই দুটিতেই আছে বইগুলো। এগুলোর মধ্যে কোনো সংকেত পেয়েও যেতে পারেন। ’ একটি-দুটি করে বই বের করে দেখতে লাগল রবিন। হঠাৎ একটা বইয়ের ভেতরে চোখ আটকে গেল। বইটির তৃতীয় পাতায় পেনসিলে একটা কথা লেখা। ভালোভাবে খুঁজতে শুরু করল সে। আবীরকে বলল কী খুঁজছে। এক ঘণ্টার মধ্যে ১৩টি বই আলাদা করে ফেলল। প্রতিটির তৃতীয় পাতায় পেনসিল দিয়ে কিছু না কিছু লেখা আছে। আবীর তখন উত্তেজনায় রীতিমতো কাঁপছে। পকেট থেকে একটা প্যাড আর কলম বের করে লিখতে শুরু করল রবিন। প্রথমে বইয়ের নাম। তারপর ভেতরে পাওয়া সূত্র।

নকল হীরা। তিন কুকুর।

ছবি রহস্য। এক।

আটলান্টিকে রোমাঞ্চ। একটি বিড়ালও নেই।

মেক্সিকোর গুহারাজ্য। পাঁচ তিতির। সাত চড়ুই।

পলাশবাড়ীর গুপ্তধন। আট হনুমান।

বাগানের অদ্ভুতুড়ে পাখি। তিন মদনটাক।

চিলেকোঠার আতঙ্ক। পাঁচ শিয়াল।

কায়রোয় রোমাঞ্চ। শূন্য টিয়া।

ভীমগড়ের মানুষখেকো। ছয় বাঘ। দুই চিতা বাঘ।

কামারপুরের নকশা। এক হাতি।

কালো আতঙ্ক। শূন্য খাটাশ।

অ্যামাজনের পিরানহা। ছয় জাগুয়ার।

গোয়েন্দা আলাল ও ছেলে ধরা। পাঁচ হাঁস। ছয় মুরগি।

বান্ধবগড়ের ভুতুড়ে রিকশা। দশ পিঁপড়া।

এরপর কাগজটা পকেটে চালান করে দিল রবিন। বলল, ‘এটা নিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় ভাবতে হবে। চলুন এবার যাওয়া যাক। ’

দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর একটু বিশ্রাম নিল রবিন। বিকেলের দিকে আবীর বলল, ‘চলুন একটা সুন্দর জায়গা থেকে ঘুরিয়ে আনি আপনাকে। হয়তো ওখানকার খোলামেলা বাতাসে রহস্যটা সমাধান করে ফেলতে পারবেন। ’

রাজি হয়ে গেল রবিন। ওকে নদীর ধারে একটা জায়গায় নিয়ে এলো আবীর। এলাকাটাকে নাকি ৩০ গোডাউন বলে। খুব পছন্দ হলো রবিনের। নদীটা খুব সুন্দর। আবার নদীর ওপাড়ের সবুজ গাছপালা যেন ওকে মন্ত্রমুগ্ধ করে ফেলছে। একটা জেটি মতো আছে। ওটায় বসে প্রকৃতি দেখতে দেখতে মাঝেমধ্যে হাতের কাগজটার দিকে চোখ বুলাচ্ছে। আবীর কী যেন বলছে। কিন্তু ওদিকে তার বিন্দুমাত্র মনোযোগ নেই। আর হঠাৎই যেন গোটা রহস্যটা পরিষ্কার হয়ে গেল। বুঝতে বাকি রইল না, প্যাডে লেখা সূত্রগুলোই আবীরকে দেওয়া দাদির জন্মদিনের উপহারের সন্ধান দিয়ে দেবে। কাগজে কিছু অক্ষর লিখল। তারপর ওগুলো সাজাল। ব্যস, সব জলের মতো পরিষ্কার।

‘রহস্যের সমাধান হয়ে গেছে। এখন বাড়িতে গিয়ে শুধু আপনার উপহার সংগ্রহ করা। আপনার দাদি কী রেখে গেছেন আপনার জন্য, তা তখনই বোঝা যাবে। দুষ্প্রাপ্য কোনো বই হতে পারে কিংবা অন্য কিছু হতে পারে। তবে রহস্য সমাধান হয়ে গেলেও এত তাড়াতাড়ি আমাক বিদায় করতে পারবেন না। কাল সকালে নদীর ওপারে যাব। তারপর একে একে বরিশালের সুন্দর সব নদী একটি একটি করে ঘুরে দেখব। ’

‘কোনো চিন্তা নেই। আপনি চাইলেও যেতে দিত কে? আমিই আপনাকে সব জায়গা ঘুরিয়ে দেখাব। এখন চলুন তো। আমার আর তর সইছে না। ’ খুশিতে ঝকঝকে দাঁত বেরিয়ে এসেছে আবীর আহমেদের।

পাঠক, বলুন তো উপহার কোথায় আছে? রবিন বইয়ে পাওয়া সূত্র থেকে কিভাবে এটা বের করল।


মন্তব্য