kalerkantho


দরজার ওপাশে

অদ্ভুত যত লাইব্রেরি

লাইব্রেরি বা গ্রন্থাগারের সাধারণ যে চেহারা আমাদের পরিচিত, কিছু কিছু তার চেয়ে একেবারেই আলাদা। এদের কোনো কোনোটি দেখে বোঝা মুশকিল যে ওগুলো আসলেই লাইব্রেরি, ওখানে বই পড়ার বন্দোবস্ত থাকতে পারে। লিখেছেন নাবীল অনুসূর্য

১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



অদ্ভুত যত লাইব্রেরি

সৈকতে গ্রন্থাগার

সমুদ্রসৈকত। বালুকাবেলা। সাগরে সার্ফিংয়ের ব্যবস্থা। সঙ্গে একটি লাইব্রেরি। মানে সাগরপাড়ে আয়েশ করে শুয়ে শুয়ে বই পড়ার বন্দোবস্ত। এমন স্বর্গীয় ব্যবস্থা আছে বুলগেরিয়ার অ্যালবেনায়, কৃষ্ণ সাগরপাড়ের একটা রিসোর্টে। লাইব্রেরিটি প্রতিষ্ঠা করেন হারমেন কমপেনাস। তাতে বইয়ের সংগ্রহও নিতান্ত কম নয়। ১০ ভাষার আড়াই হাজার বই আছে। আর সেগুলো পড়ার শর্তও খুব সোজা। কষ্ট করে গিয়ে বই নিয়ে নিলেই হলো।

কোনো টাকা-পয়সা দেওয়ার ব্যাপারস্যাপারও নেই। স্রেফ পড়া শেষ করে রেখে দিতে হবে, যাতে অন্যরাও পড়তে পারে। সৈকত লাইব্রেরি আছে অস্ট্রেলিয়ায়ও।

 

খচ্চর টানা লাইব্রেরি

লুইস সোরিয়ানো কলম্বিয়ার একজন প্রাইমারি স্কুল শিক্ষক। ছাত্রদের পড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে অবশ্য আরেকটি কাজও করেন। সেটা তাঁর শখের কাজ হলেও, সেই কাজই তাঁকে বিখ্যাত করে তুলেছে। তিনি কলম্বিয়ার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের শিশুদের জন্য ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি বানিয়েছেন। নাম দিয়েছেন বিবলিওবুরো। শুধু ভ্রাম্যমাণ বলেই না, যে বাহনে চড়ে লাইব্রেরিটা ঘুরে বেড়ায়, তার জন্যও একে অদ্ভুত বলতে হবে। দুটি খচ্চরে চাপিয়ে তিনি তাঁর লাইব্রেরির বইগুলো নিয়ে চলে যান প্রত্যন্ত সব গ্রামে। আর তাঁকে দেখলেই সেসব গ্রামের ছেলে-মেয়েদের মুখে যে নিষ্পাপ নির্মল হাসি ফুটে ওঠে, এক জীবন সার্থক করতে তার চেয়ে বড় আর কিছু দরকার হয় না।

 

ডাকবাক্সে গ্রন্থাগার

লাইব্রেরি যেমন বই পড়ার জন্য আদর্শ জায়গা, তেমনি লাইব্রেরির আবার নিয়ম-নীতির কড়াকড়িও আছে। আছে খরচাপাতির ব্যাপারও। বই পড়ার জন্য নিয়মিত টাকা দিতে হয়, ফেরত দিতে দেরি হলে জরিমানা গুনতে হয়, লাইব্রেরি কার্ড বানাতে হয়, আবার একটু জোরে কথা বললেই সবাই কটমট করে তাকায়। শুধু তা-ই না, লাইব্রেরিতে প্রায়ই কিছু উদ্ভট লোকও আসে, যারা আর সবাইকেই অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। এসব থেকেই মুক্তি পাওয়া যায় এই ডাকবাক্স লাইব্রেরির ব্যবস্থায়। এ ব্যবস্থায় কোনো এলাকার সবাই, বাসার সামনে যেমন ডাকবাক্স থাকে, তেমনি একটা বাক্স বসিয়ে নেয়। সেখানে বই রাখেন এলাকাবাসী। যার ইচ্ছা নিয়ে বই পড়তে পারেন এই লাইব্রেরি থেকে। বর্তমানে প্রায় আট দেশের ২৪টি প্রদেশে এমন প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ খুদে লাইব্রেরি আছে।

 

ফোন বুথে লাইব্রেরি

ওয়েস্টবারি-সাব-মেনডেপ অবস্থিত ইংল্যান্ডের দক্ষিণে, সমারসেটে। এই শহরতলি থেকে যখন ব্রিটিশ টেলিকম কম্পানি ঐতিহ্যবাহী লাল ফোন বুথ উঠিয়ে দিতে চেয়েছিল, ওখানকার লোকজন রীতিমতো মাঠে নেমে পড়েছিল। তাদের দাবির মুখে কম্পানি ফোন বুথগুলো রেখে দেয়। এলাকাবাসী সেগুলোর প্রতিটিকে পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম একেকটা লাইব্রেরিতে রূপান্তরিত করে। লাইব্রেরিগুলো ২৪ ঘণ্টাই খোলা থাকে। প্রতিটিতে থাকে ১০০টা করে বই। সঙ্গে কিছু সিডি-ডিভিডি। আর এর সবই আসে স্থানীয় কারো ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে। যে যার মতো বই নিয়ে যায়, পড়ে শেষ করে, সেটা রেখে আরেকটা নিয়ে যায়। এসবের দেখাশোনা করতে কাজ করে ভলান্টিয়ারের একটি দল। কোনো বই বেশিবার পড়া হলে সে বইটি চলে যায় স্থানীয় চ্যারিটি শপে। তার বদলে আসে নতুন আরেকটি বই।

 

উটের পিঠে আস্ত লাইব্রেরি

আফ্রিকার দেশ কেনিয়ার একটা বড় অংশজুড়ে আছে মরুভূমি। সে মরুভূমির গভীরে বেশ কিছু যাযাবর জাতির বাস। একে তো তাদের বসবাস মরুভূমিতে, তার ওপর জায়গা বদল করে করে বাস করতে হয়। সব মিলিয়ে তাদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করাটা ভীষণই মুশকিলের ব্যাপার। আর সে জন্যই ১৯৮৫ সাল থেকে কেনিয়ার জাতীয় গ্রন্থাগার এক বিশেষ সেবা চালু করেছে। মরুভূমির জন্য বিশেষ ভ্রাম্যমাণ গ্রন্থাগার। এ ব্যবস্থায় আস্ত লাইব্রেরি চাপিয়ে দেওয়া হয় উটের পিঠে। উটের পিঠে শুধু লাইব্রেরিয়ান আর লাইব্রেরির বই-ই থাকে না, থাকে ক্যাম্প করার যাবতীয় সরঞ্জামও। তারপর তারা মরুভূমির বুকে পাড়ি জমায় যাযাবর জাতিগুলোর উদ্দেশে।

 

যুদ্ধবিরোধী লাইব্রেরি

রাউল লেমেসফ একজন আর্জেন্টাইন শিল্পী। তাঁর একটা বিখ্যাত শিল্পকর্মের নাম ‘আর্মা দে ইনস্ট্রাকশন মাসিভা’। ইংরেজিতে ‘উইপন অব ম্যাস ইনস্ট্রাকশন’। এটি আসলে ট্যাংকের মতো করে সাজানো একটি গাড়ি। যা মূলত একটি চলমান বইভাণ্ডার। এতে প্রায় ৯০০টির মতো বই ধরে। তিনি সেই বইগুলো নিয়ে ঘুরে বেড়ান আর্জেন্টিনার শহরে-বন্দরে-গ্রামে। যে কেউ চাইলে তাঁর গাড়ি থেকে বই নিয়ে পড়তে পারেন। আর এভাবেই তিনি বইয়ের মাধ্যমে শান্তির বার্তা পৌঁছে দিচ্ছেন গোটা দেশে।

 

বিশাল সব বই

আমেরিকার ক্যানসাস সিটির রাস্তার দানবাকৃতির সব বই সারবেঁধে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে চমকে উঠবেন। বিশাল আকৃতির বইগুলোর গায়ে আবার বিখ্যাত সব বইয়ের নাম লেখা। আরো অবাক হবেন, যখন শুনবেন, এগুলো আসলে ছদ্মবেশী গ্যারেজ। বিশাল বইগুলো ক্যানসাস সিটির সেন্ট্রাল লাইব্রেরির গ্যারেজ হিসেবে কাজ করছে। ২০০৬ সালে তৈরি করা হয় ২৫ ফুট লম্বা কাঠামোগুলো। একেকটা চওড়ায়ও কম নয়, ৯ ফুট করে।  

 

এক কামরায় দুই লাখ বই

ট্রিনিটি বিশ্ববিদ্যালয় অবস্থিত আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিনে। এটাই দেশটির সবচেয়ে পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়। ট্রিনিটি কেবল দেশটির সবচেয়ে পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়ই না, দেশটির সবচেয়ে বড় লাইব্রেরিও অবস্থিত এখানেই। আর সেই লাইব্রেরির সংগ্রহের সবচেয়ে পুরনো আর দুর্লভ বইগুলো আছে লাইব্রেরিটির লংরুমে। যদি কেবল এক কামরার লাইব্রেরি হিসাব করা হয়, তাহলে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় লাইব্রেরি হবে এই লংরুমটিই। এই একটি কামরায় আছে প্রায় দুই লাখ বই।


মন্তব্য