kalerkantho

রহস্যজট

রহস্যময় ছাপ

শেখ আবদুল হাকিম

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



 রহস্যময় ছাপ

অঙ্কন : মানব

সেদিন শুক্রবার বিকেলে শিশু গোয়েন্দা লব্ধ সৈকতের ভাগ্য একেবারে ঝলমল করে উঠল। কী ব্যাপার? না, ওর বাবা, কক্সবাজারের পুলিশ চিফ বিপুল অর্জন, আজ ওকে সঙ্গে নিয়ে একটা তদন্ত করতে যাচ্ছেন।

শাহিন সন্তোষ একটা চুরির ঘটনা রিপোর্ট করেছেন, খুব দামি এক জোড়া বুকএন্ড চুরি হয়ে গেছে তাঁর বাড়ি থেকে। বুকএন্ড হলো টেবিলে বা শেলফে এক সারি বইকে খাড়া করে রাখার জন্য সারির দুই প্রান্তে ব্যবহারযোগ্য সাপোর্ট বা অবলম্বন। শাহিন সন্তোষ ব্যক্তিগতভাবে পুলিশ চিফকে এই চুরির ঘটনাটা তদন্ত করে দেখতে অনুরোধ করেছেন। এমন সাধারণ চুরির ঘটনায় পুলিশ চিফের তদন্ত করতে যাওয়ার কথা নয়। কিন্তু তাঁর সঙ্গে শাহিন সন্তোষের বন্ধুত্ব অনেক দিনের।

শহরের সব ছেলে-মেয়ে শাহিন সন্তোষকে চেনে। পঞ্চাশ বছর আগে একটা সার্কাসে চকোলেট বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন ভদ্রলোক। তারপর তিনি যখন কর্মজীবন থেকে অবসর নেন, তখন বাংলাদেশ ছাড়া ভারত, নেপাল আর ভুটানে তিনটি সার্কাস কম্পানির মালিক ছিলেন।

শাহিন সন্তোষ চিরকুমার, অর্থাত্ তিনি কখনো বিয়ে করেননি।

বড়সড় পুরনো একটা বাড়িতে তিনজন পুরনো চাকর নিয়ে থাকেন তিনি। তাঁর পুরো বাড়ি তারের বেড়া দিয়ে ঘেরা। বাড়িটার পেছনে একটা খাল আছে।

বাড়ির সামনের বারান্দায় অপেক্ষা করছিলেন তিনি, এই সময় চিফ বিপুল অর্জন আর সৈকত গাড়ি করে পৌঁছলেন ওখানে।

‘শুক্রবার, ছুটির দিন, তার পরও আসতে পেরেছেন বলে ধন্যবাদ। ’ পুলিশ চিফকে বললেন তিনি। ‘ও নিশ্চয়ই আপনার ছেলে, সৈকত। ’

ভদ্রলোককে সঙ্গে সঙ্গে ভালো লেগে গেল সৈকতের। খুদে গোয়েন্দার গাল টিপে দেওয়ার বদলে, ওর সঙ্গে করমর্দন করলেন তিনি।

‘বুকএন্ড আমার কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। ’ বললেন শাহিন সন্তোষ। ‘ওগুলো আইভরি দিয়ে তৈরি, খুবই সুন্দর দেখতে। আমার কাছে ওগুলো অমূল্য। আমি যখন অবসর নিই, আমার অফিস স্টাফ ওটা আমাকে উপহার দিয়েছিল। ’

‘আপনি কখন লক্ষ করলেন যে ওগুলো নেই?’ জানতে চাইলেন পুলিশ চিফ।

‘আজ সকাল ৭টার দিকে। ’ শাহিন সন্তোষ বললেন। ‘আমি আমার পড়ার ঘরের ডেস্কে রেখে ছিলাম ওটা। তার মানে অবশ্যই রাতে চুরি হয়েছে। ’

গত রাতে বজ্রসহ তুমুল ঝড়-বৃষ্টি হয়ে গেছে। বছরের এ সময় যেটা রীতিমতো অস্বাভাবিক। দুর্যোগটা শুরু হয়েছিল মাঝরাতে, থেমেছে প্রায় ভোরের দিকে।

‘আপনি কাউকে সন্দেহ করেন?’ জানতে চাইলেন সৈকতের বাবা। ‘আপনার চাকরবাকরদের কেউ, সম্ভবত?’

‘না না। ’ খুব জোর দিয়ে বললেন শাহিন সন্তোষ। ‘ওরা বহু বছর হলো আমার সঙ্গে আছে। ওই বুকএন্ড ওরা যদি নিতে চাইত, তাহলে অনেক বছর আগেই চুরি করতে পারত। আরো অনেক দামি দামি জিনিস পাহারা দিয়ে রাখে ওরা। কই, কখনো তো কিছু খোয়া যায়নি। ’

‘কাল রাতে তাহলে কে ঢুকল ওই পড়ার ঘরে?’ জিজ্ঞেস করলেন চিফ। ‘একটা জিনিস চুরি হতে হলে চোর তো একজন থাকতে হবে, নাকি? চাকররা আর আপনি বাদে কাল রাতে আর কে ছিল বাড়িতে?’

‘আমার বাড়িতে আরো দুজন আছেন, তাঁরা আমার অতিথি হিসেবে থাকেন এখানে। ’ সার্কাস কম্পানির মালিক অনিচ্ছা সত্ত্বেও বললেন। ‘চোর তাঁদের দুজনের একজন হতে পারেন, তবে এটা হলে খুব দুঃখ পাব আমি। ’

‘আপনার ওই অতিথিদের সম্পর্কে আরো কিছু বলুন, প্লিজ!’

মাথা ঝাঁকিয়ে রাজি হলেন শাহিন সন্তোষ। তারপর ব্যাখ্যা দিলেন : দুই অতিথি, দোলা নাহিদ আর কমল গাজী, তাঁর সার্কাস ব্যবসার প্রথম দিকের বন্ধু। দোলা নাহিদ ঘোড়ায় চড়ে শারীরিক কসরত্ দেখাতেন, পরে অবশ্য সার্কাসের কাপড়চোপড় সেলাইয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। আর কমল গাজী ছিলেন অ্যাক্রোব্যাট। কিন্তু রোড অ্যাকসিডেন্টে পা দুটি জখম হওয়ায় অবসর নিয়েছেন।

‘ওঁদের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দেবেন না?’

‘হ্যাঁ, অবশ্যই—আসুন, ভেতরে আসুন। ’ শাহিন সন্তোষ ব্যস্ত হয়ে উঠলেন।

বৈঠকখানায় বসে দোলা নাহিদ আর কমল গাজী দাবা খেলছেন। দোলা রোগা-পাতলা, হাত দুটি ছোট আর ক্ষিপ্র। কমল গাজী প্রকাণ্ডদেহী, একটা হুইলচেয়ারে বসে আছেন।

পুলিশ চিফ বিপুল অর্জন জেরা শুরু করলেন। দুজনের কাউকেই কিন্তু ভীতসন্ত্রস্ত বা এমনকি নার্ভাস বলেও মনে হলো না। দুজনই জোর দিয়ে বলতে লাগলেন, বুকএন্ড চুরির বিষয়ে তাঁরা কেউ কিছু জানেন না।

 বৈঠকখানা থেকে পুলিশ চিফ আর সৈকতকে বাড়ির পেছন দিকে নিয়ে গেলেন শাহিন সন্তোষ, কিচেনটা ওখানেই। কিচেনের জানালা দিয়ে অতিথিদের থাকার জন্য একটা চারচালা দেখতে পেলেন বিপুল অর্জন। সেটির দুটি দরজা সামনের বারান্দার দিকে খোলা। ওই সামনের বারান্দা মূল দালানের পেছনের বারান্দার মুখোমুখি।

‘ওই চারচালার কাজ গত সপ্তাহে শেষ হয়েছে। ’ বললেন শাহিন সন্তোষ। ‘দুটি ইউনিট, প্রতিটিতে সংলগ্ন বাথরুমসহ একটা করে বেড। দোলা থাকছেন ডান দিকের ইউনিটে, গাজী থাকছেন বাঁ দিকে। দেখতেই পাচ্ছেন উঠানে নতুন মাটি ফেলেছি, এখনো ঘাস জন্মায়নি। ’

অতিথিদের চারচালা আর মূল বাড়ির মাঝখানে, প্রায় ৫০ গজ জায়গা ফাঁকা পড়ে আছে। কাল রাতের তুমুল ঝড়-বৃষ্টি নিরাবরণ মাটিকে কাদা বানিয়ে রেখে গেছে।

শাহিন সন্তোষ কিচেনের দরজা খুলে বারান্দায় পা রাখলেন।

‘আমি মাঝেমধ্যে এই দরজায় তালা লাগাতে ভুলে যাই। ’ স্বীকার করলেন তিনি। ‘সন্দেহ হচ্ছে, কাল রাতেও লাগাইনি। আমি আপনাকে অদ্ভুত একটা জিনিস দেখাব বলে এখানে নিয়ে এসেছি। ’

‘কী অদ্ভুত জিনিস?’

শাহিন সন্তোষ আঙুল খাড়া করে কাদার ওপর দুই সারি হাতের ছাপ দেখালেন। হাতের ওই ছাপ বাড়ির পেছনের বারান্দা থেকে চারচালার সামনের বারান্দার দিকে চলে গেছে, প্রতিটি দিকে এক প্রস্থ করে।

‘দেখে মনে হচ্ছে, কেউ তার হাত দিয়ে হেঁটেছে। ’ পুলিশ চিফ বিপুল অর্জন বললেন। ‘কিন্তু কেন? আর কিছু চুরি হয়েছে নাকি?’

‘পরশু সকালে। ’ শাহিন সন্তোষ বললেন, ‘আমার এক কাজের লোক এসে বলল এক সেট ওঅর্ক গ্লাভস আর রেডি-মিক্স সিমেন্টের একটা ব্যাগ খুঁজে পাচ্ছে না। এক ঘণ্টা পর দোলাও এলেন অভিযোগ করতে। বললেন, তিনি তাঁর লেদার দস্তানাটা পাচ্ছেন না। ’

‘আপনারা কটেজে তল্লাশি চালাননি?’ জিজ্ঞেস করলেন পুলিশ চিফ।

‘দোলা আর গাজী তল্লাশি চালানোর দাবি জানালেন। ’ বললেন শাহিন সন্তোষ। ‘কিন্তু ওদের ঘরে খোয়া যাওয়া একটা জিনিসও আমি পাইনি। ’

কাদার ওপর হাতের ছাপ ছাড়া আরো আছে কোনো মহিলার এক জোড়া পায়ের ছাপ এবং হুইলচেয়ারের চাকার দাগ। ‘ওগুলো সম্পর্কে কিছু বলুন। ’ বললেন চিফ।

‘ওগুলো আজ সকালের ছাপ। ’ শাহিন সন্তোষ জবাব দিলেন। ‘সকালের নাশতা খেতে আসছিলেন ওঁরা, কাদার কারণে গাজী সাহেবকে সাহায্য করতে হয়েছে দোলার—উনি গাইড করে নিয়ে এলেন হুইলচেয়ারটা। ’

সার্কাস কম্পানির মালিক এবং পুলিশপ্রধান নিচু গলায় আলোচনা করছেন। বিপুল অর্জন জানালেন, এখন পর্যন্ত কাউকে তিনি চোর বলে সন্দেহ করতে পারছেন না। তবে দোলা নাহিদ আর কমল গাজীর মধ্যে খুব বেশি সদ্ভাব লক্ষ করেছেন। তাঁর এই কথা শুনে শাহিন সন্তোষ ফিসফিস করে জানতে চাইলেন, ‘ওরা দুজন মিলে কাজটা করেছেন বলে সন্দেহ হচ্ছে নাকি?’

ওদিকে লব্ধ সৈকত ভাবছে, তার আর কিছু শোনার দরকার নেই, এতক্ষণ যা শুনেছে, এই চুরির রহস্য মীমাংসা করার জন্য সেটাই যথেষ্ট। তার বিশ্বাস, কে বুকএন্ড চুরি করেছে তা সে জানে, তবে আরো নিশ্চিত হতে হবে তাকে।

মাফ চেয়ে নিয়ে ওঁদের কাছ থেকে সরে এলো সৈকত, হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছল চারচালার পেছনে।

 পেছনের দরজা থেকে ছয় ফুট দূরে তারের একটা বেড়া দেখা যাচ্ছে, যেটা শাহিন সন্তোষের গোটা উঠান ঘিরে রেখেছে। বেড়া থেকে কয়েক ফুট দূরে বইছে খালটা।

‘ছুড়ে দেওয়ার দূরত্ব। ’ চিন্তা করছে সৈকত। ‘তাহলে চোর হবেন...’

কে?


মন্তব্য