kalerkantho


খেয়ালি সব চরিত্র

ছবির মতো বাগান

পৃথিবীতে বাতিকগ্রস্ত মানুষের অভাব নেই। এঁদের একেকজনের কাজ-কারবারের বর্ণনা শুনলে চোখ কপালে উঠবে। খেয়ালি এই মানুষগুলোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন নাবীল আল জাহান

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ছবির মতো বাগান

চার্লস হ্যামিল্টন ছিলেন ইংল্যান্ডের ষষ্ঠ আর্ল অব অ্যাবারকর্নের সবচেয়ে ছোট ছেলে। রোমান্টিক ঘরানার ইতালিয়ান চিত্রশিল্পের প্রতি তাঁর ছিল দুর্নিবার আকর্ষণ।

সে ধরনের ছবিতে সচরাচর যেমন প্রাকৃতিক দৃশ্যের দেখা মেলে, তিনি তেমন একটা প্রাকৃতিক দৃশ্য কৃত্রিমভাবে বানিয়েও ফেলেন। শুধু বানিয়েই থামেননি, সেখানে একটা আশ্রম বানিয়ে, সে আশ্রমে থাকার জন্য এক সাধুকে নিয়োগ দিতে রীতিমতো বিজ্ঞাপনও দেন। আর সেই অদ্ভুতুড়ে বিজ্ঞাপনে সাড়াও মিলেছিল!

চার্লসের এই অদ্ভুতুড়ে কাজের শুরু ১৭৩৮ সালে। সে বছর ইংল্যান্ডের সারে প্রদেশের কোবহ্যামের কাছে ৪০০ একর জমি কিনে নেন তিনি। নাম দেন পেইনস হিল। ওটা তখন নিতান্তই অনুর্বর এক পতিত জমি। প্রথমে তিনি পুরো জমিতে শালগম চাষ করলেন। তারপর সেখানে ঝাঁকে ঝাঁকে ভেড়া নামিয়ে দিলেন। এই ভেড়াদের মল এত ভালো জৈব সারের কাজ করল, পুরো এলাকা ভরে গেল সবুজ ঘাসে।

এরপর আনালেন টন টন মাটি। সেগুলো দিয়ে জলাভূমিটাকে উপত্যকায় রূপ দিলেন। তৈরি করা হলো কৃত্রিম টিলা। একটা কৃত্রিম লেকও বানানো হলো। পাম্প বসিয়ে মোল নদী থেকে তাতে পানি টানা হলো।

তারপর পুরো পার্কটা তিনি গাছে গাছে ভরে তুললেন। যাতে যেদিকে দুচোখ যায়, কেবলই সবুজ গাছের সারি চোখে পড়ে। লাগানো হলো সিডার, এলম, ওক আর বিচগাছ। সেই সঙ্গে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে নিয়ে আসা হলো নানা জাতের ফুলগাছ। তারপর শুরু হলো পার্কের স্থাপনাগুলো নির্মাণ। যাতে তাঁর এই পার্কে রোমান্টিক ইতালিয়ান চিত্রশিল্পের শতভাগ ছোঁয়া থাকে। কাঠ আর প্লাস্টার দিয়ে বানানো হলো একটা গথিক মন্দির। বানানো হলো একটা চাইনিজ ব্রিজ, একটা আটকোনা তুর্কি তাঁবু, গ্রিক দেবতা ডায়োনিসিসের একটা মন্দির, একটা মধ্যযুগীয় চারদিক খোলা স্থাপনা, একটা মঠের ধ্বংসাবশেষ, একটা দুর্গ আর একটা বিশাল রোমান দরজা। আর সব শেষে বানালেন একটা আশ্রম।

আশ্রম বানানোর মধ্য দিয়ে তাঁর ইতালিয়ান রোমান্টিক ঘরানার চিত্রশিল্পের বাস্তব প্রতিরূপ বানানোর খ্যাপামি প্রায় পূর্ণতাই পেয়ে গেল। বাকি রইল কেবল একটি উপাদান—একজন আশ্রমবাসী, মানে সন্ন্যাসী। এবার তিনি সেই সন্ন্যাসীর জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞাপন ছাপালেন। সেই বিজ্ঞাপনটিও কম খ্যাপাটে নয়। সন্ন্যাসীকে ন্যূনতম সাত বছর পেইনস হিলে থাকতে হবে। তার ঘুমানোর জন্য একটা মাদুর দেওয়া হবে, আর হাঁটু মুড়ে বসার জন্য একটা গদি। আর দেওয়া হবে একখানা বাইবেল, এক জোড়া চশমা ও একটি বালুঘড়ি। খাবার ও পানি নিয়ম করে দিয়ে আসা হবে। কিন্তু যারা খাবার-পানি দিতে  যাবে, তাদের সঙ্গে কোনো কথা বলা যাবে না। সন্ন্যাসীকে এমনকি সত্যিকারের সন্ন্যাসীদের মতো উটের পশমের পোশাক পরে থাকতে হবে। চুল-দাড়ি-নখ কোনো কিছুই কাটা যাবে না। আর পেইনস হিলের বাইরে ভুল করেও যাওয়া যাবে না। তবে চাইলে পেইনস হিলের মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে পায়চারি করা যাবে।

এত সব শর্ত পূরণ করে কেউ যদি পুরো সাতটা বছর পেইনস হিলে কাটিয়ে দিতে পারে, তাতে মিলবে পুরো ৭০০ পাউন্ড। তবে কোনো একটা শর্তে একটু ব্যত্যয় ঘটলেই শূন্য হাতে বিদায়। এমন বিজ্ঞাপনে অবশ্য সাড়া মিলেছিল। একজন সন্ন্যাসী এসে হাজির হলেন। তাঁকে সসম্মানে পেইনস হিলের আশ্রমে রেখেও আসা হলো। কিন্তু অমন কঠোর আর আজগুবি সব শর্ত তিনি সইতে পারলেন না। সপ্তাহ তিনেকের মাথায় এক রাতে চম্পট দিলেন।

এর পর থেকে আশ্রমটা খালি থাকলেও, স্রেফ বাগানটাই খ্যাপামির উদাহরণ হিসেবে কোনো অংশে কম ছিল না। তা দেখতেই রাজ্যের মানুষ সেখানে যেত। তাদের জন্য চার্লস আরেক আকর্ষণেরও বন্দোবস্ত করে রেখেছিলেন। কাছেই ছিল তাঁর একটি আঙুরক্ষেত। সেখানে বানানো হতো দুর্দান্ত হোয়াইট ওয়াইন। একেকটা বোতল বিক্রি হতো সাত শিলিং ছয় পেনস করে। কিন্তু তা দিয়ে চার্লসের এমন কিছু আয় হতো না, যা দিয়ে অমন বিলাসী একটা বাগানের খরচ উঠে আসে। তিনি নিজেও তেমন বড়লোক ছিলেন না। তার ওপর উত্তরাধিকার সূত্রে যা পেয়েছিলেন, মোটামুটি সবই গিয়েছিল বাগানটা বানাতে। কাজেই শেষ পর্যন্ত ১৭৭৫ সালে তাঁকে পেইনস হিল বিক্রি করে দিতে হলো। বাকিটা জীবন তিনি বিভিন্ন বিখ্যাত বাগানের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেই কাটিয়ে দেন। তাঁর সেই বিখ্যাত পেইনস হিল এখনো আছে। কিন্তু অবহেলিত ও পরিত্যক্ত অবস্থায়। ওই বাগান ঘিরে তাঁর একসময়ের বিখ্যাত সেই খ্যাপামির কথাও এখন সবাই ভুলে গেছে।


মন্তব্য