kalerkantho


সত্যিই

ভারসাম্য মানব

নাবীল অনুসূর্য

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ভারসাম্য মানব

দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞানের যে অনুষঙ্গটি সবচেয়ে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত, সেটি মাধ্যাকর্ষণ শক্তি। পৃথিবী সব কিছুকে তার কেন্দ্রের দিকে টানছে।

আর তাই সব কিছু মাটি আঁকড়ে থাকতে চায়। কোনো কিছু হাত থেকে একটু ফসকালেই সোজা মাটিতে গিয়ে আছড়ে পড়ছে। শুধু ফসকালেই না, কোনো কিছু ঠিকঠাকমতো না রাখলেও ফলাফল একই। ব্যাপারটা এভাবে বলা যেতে পারে—আমাদের চারপাশের সব কিছু এই মাধ্যাকর্ষণ শক্তির অনুগত। কিন্তু ব্যতিক্রম ‘নাম সিউক বিওন’-এর বেলায়। তাঁর হাতে পড়লেই জিনিসপত্র আর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির অনুগত থাকে না। উল্টো তাঁর দাস হয়ে পড়ে। তিনি যেভাবে বলেন, সব কিছু একদম সেভাবেই দাঁড়িয়ে-বসে থাকে। অনেক সময় তো মনে হয় তিনি ওগুলো ভাসিয়েই রেখেছেন। মনে হয়, তাঁর হাতে যেন জাদু আছে।

ব্যাপারটা আসলে ঠিক জাদু নয়। বরং এটাও বিজ্ঞানেরই বিষয়। সব কিছুরই একটা ভরকেন্দ্র থাকে। যে বিন্দুকে কেন্দ্র করে জিনিসটার ওপর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি কাজ করে। সেই ভরকেন্দ্রটিকে যদি ঠিকঠাক রাখা যায়, তারপরে জিনিসটাকে যেভাবেই উল্টা-সিধা করা হোক, কোনো সমস্যা নেই। সিউক বিওনও সেটাই করেন। ভরকেন্দ্রটিকে ঠিকঠাক রাখেন। তাই জিনিসটাকে যেভাবে ইচ্ছা সাজাতে পারেন। আর সেই সাজানোটা এমন অদ্ভুত হয়, চোখে দেখেও বিশ্বাস হতে চায় না।

ব্যাপারটা শুনতে যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে ঠিক তার উল্টো। ভরকেন্দ্রটি খুঁজে বের করাটা রীতিমতো জটিল গাণিতিক হিসাব-নিকাশের বিষয়। আর জিনিসটা দেখে বা নাড়াচাড়া করে সেই ভরকেন্দ্র খুঁজে বের করা, তারপর সেই ভরকেন্দ্রটিকে ঠিকঠাক রেখে জিনিসটাকে উল্টা-সিধা করা—খুবই জটিল একটি প্রক্রিয়া। প্রক্রিয়াটি রপ্ত করতে দীর্ঘদিনের অধ্যবসায় প্রয়োজন। যেমনটি করেছেন সিউক বিওন। দক্ষিণ কোরিয়ার অধিবাসী এই ভদ্রলোক প্রায় এক যুগ ধরে এই শিল্পের চর্চা করছেন। শিখতে গিয়ে কত ডিম, কত বোতল, কাপ-পিরিচ যে ভেঙেছেন, তার ইয়ত্তা নেই।

এখন তাঁকে এই শিল্পের মাস্টার বললেও অত্যুক্তি করা হয় না। নানা আকৃতির পাথর একটার ওপর আরেকটা বিভিন্ন ঢংয়ে সাজানোতে তিনি এতটাই দক্ষ হয়ে উঠেছেন যে তাঁর ডাকনামই হয়ে গেছে ‘রকি’। ডিম, ফলমূল, মোবাইল, ফুলদানি, চায়ের কেটলি, বোতল, ল্যাপটপ—এসব সাজানো তো তার কাছে কোনো ব্যাপারই না। এমনকি এগুলো তিনি রোলার স্কেটিংয়ের জুতা পরেও সাজাতে পারেন। ওয়াশিং মেশিন, সাইকেল, মোটরসাইকেলও উল্টা-সিধা ও আঁকাবাঁকা করে বিভিন্নভাবে সাজাতে পারেন। একবার তো এক লোককে একটা চেয়ারে বসিয়ে, সেই চেয়ারটাকে এক পায়ার ওপর দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন। চেয়ারটা এক পায়ার ওপর দাঁড়িয়েছিল প্রায় ১২ সেকেন্ড (১১.৮৮ সেকেন্ড)।

তাঁর এই কীর্তিটা ওঠে সিঙ্গাপুরের রেকর্ড বুকে। কারণ কীর্তিটা তিনি গড়েছিলেন সিঙ্গাপুরে। ৫৫ বছর বয়সী সিউক বিওন এখন এই ভারসাম্যের খেলা দেখানোকে নিজের পেশাই বানিয়ে ফেলেছেন। বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে জিনিসপত্র সাজানোর এই শিল্পের প্রদর্শনী করেন। মানুষও টাকা দিয়ে টিকিট কেটে দেখে। বেশির ভাগ সময় দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলেই তাঁর প্রদর্শনী হয় বটে; কিন্তু অন্যান্য শহরে, এমনকি বিদেশেও মাঝেমধ্যে প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। সিঙ্গাপুরে গিয়ে তো আস্ত একটা ওয়ার্কশপও করিয়ে এসেছিলেন। সেখানে বাচ্চাদের শিখিয়ে এসেছিলেন, কিভাবে জিনিসপত্রকে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির আনুগত্য ভুলিয়ে নিজের অনুগত করে তুলতে হয়। যেমনটা তিনি করতে পারেন এক তুড়িতে।


মন্তব্য