kalerkantho


দরজার ওপাশে

সেন্ট মিশেল দ্বীপ

ফ্রান্সের নরম্যান্ডি উপকূলে অবস্থিত খুদে এক দ্বীপ সব সময়ই পর্যটকদের টানে। কেন? জানাচ্ছেন অমর্ত্য গালিব চৌধুরী

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



সেন্ট মিশেল দ্বীপ

২০১৫ সালের মার্চে মানুষের উপচে পড়া ভিড় ছিল মন্ট সেন্ট মিশেল দ্বীপে। সবাই অপেক্ষায় ছিল জোয়ারের।

তবে যেনতেন জোয়ার এ নয়, সূর্যগ্রহণের ফলে ওই দিন রাতে ও পরের দিন সকালে দেখা গিয়েছিল বিশাল উচ্চতার সামুদ্রিক জোয়ার। প্রতি ১৮ বছর পর পর দেখা মেলে সুপারটাইড নামে পরিচিত এমন বড় ধরনের জোয়ারের। সূর্যগ্রহণের  কারণে এই জোয়ারের সময় পানির উচ্চতা দাঁড়ায় প্রায় ৪৬ ফুট (স্বাভাবিক জোয়ারের সময় পানির উচ্চতা থাকে বড়জোর ১৮ ফুট), অন্যভাবে বললে চারতলা দালানের উচ্চতার সমান। প্রকৃতির এমন বিস্ময় দেখতে পর্যটকরা তো ভিড় জমাবেই!

নরম্যান্ডির উত্তর উপকূলের ছোট্ট এই পাহাড়ি দ্বীপের মূল আকর্ষণ পাহাড়ের ওপর তৈরি করা আশ্রমটি। অবশ্য নামে আশ্রম হলেও চেহারা আর নিরাপত্তাব্যবস্থার দিক থেকে দুর্গের বাড়া। এখানে প্রথম ছোট একটি আশ্রম তৈরি করা হয় অষ্টম শতকের গোড়ার দিকে। অবশ্য পরবর্তী সময়ে এটা নতুনভাবে তৈরি করা হয়। পাহাড়ের ওপরের দিকের যে দালানগুলো আছে, সেগুলোর বেশির ভাগই ১৩ শতকে গথিক নির্মাণরীতিতে বানানো। নিচের দিকে ছোট ছোট বাড়ি-ঘর আর দোকানপাট আছে।

সাকল্যে ৪০ কি ৫০ জন মানুষের বাস মন্ট সেন্ট মিশেলে।

একসময় এলাকাটি মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিল। কিন্তু শত শত বছর ধরে সাগরের পানির ধাক্কায় ক্ষয়ে যেতে থাকে এর আশপাশের ভূমি। একসময় বিলীন হয়ে যায় দুই ভূখণ্ডের মাঝের সংযোগসূত্র। আর সেন্ট মিশেল সমুদ্রের মাঝে একটা দ্বীপ হিসেবে টিকে থাকে। ১৮৭৯ সালে প্রথম কাঠের একটা সেতু নির্মাণ করা হয় মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জন্য।

সুপারটাইডের সময় উঁচু ঢেউয়ের দুর্লভ দর্শন পেতে এখানে পড়িমরি করে ছুটে আসেন পর্যটকরা। তবে শুধু জোয়ারের ঢেউই মূল আকর্ষণ নয়। প্রাকৃতিক নিয়মেই জোয়ারের পরে আসে ভাটার টান এবং সূর্যগ্রহণের ফলে এই ভাটাও হয় বেশ জোরদার। অন্যান্য সময় ভাটার টানে বড়জোর সেন্ট মিশেলের চারপাশের সাগরের পানির উচ্চতা কয়েক ফুট কমে যায়। কিন্তু ১৮ বছর পর পর এই নির্দিষ্ট তারিখে সূর্য, চন্দ্র আর পৃথিবীর মিলিত মাধ্যাকর্ষণ শক্তির ফলে সেন্ট মিশেলের চারপাশের সাগর রীতিমতো পিছু হটে আর রেখে যায় বিস্তীর্ণ ধু ধু বালুকাবেলা। হঠাৎ জেগে ওঠা এই সাময়িক সাগরসৈকতে দুই পাক হেঁটে আসার লোভ সামলাতে না পেরেও অনেক পর্যটক হাজির হন এখানে।

জোয়ার-ভাটার এই খেলা ছাড়াও সেন্ট মিশেলের ঐতিহাসিক মূল্যও কম নয়। প্রাচীন এই দ্বীপ ও আশ্রম বহু ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী। শতবর্ষের যুদ্ধের সময় ইংরেজরা বহু চেষ্টা করেও এটি দখল করতে ব্যর্থ হয়।

সেন্ট মিশেল দ্বীপের গুরুত্ব বিবেচনা করে ইউনেসকো একে ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট’-এর মর্যাদা দিয়েছে। সুপারটাইড ছাড়া সাধারণত জোয়ার-ভাটার সময়ও মন্ট সেন্ট মিশেলের আকর্ষণ কম না। এমনিতে জোয়ারের সময় দ্বীপটির সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের কোনো সংযোগ থাকে না। তবে ২০১৪ সালে যে নতুন হালকা-পাতলা সেতুটি তৈরি হয়েছে, তাতে হেঁটে হেঁটে সহজেই পর্যটকরা জোয়ারের সময়ও পৌঁছে যেতে পারেন দ্বীপে। তবে সুপারটাইডের সময় কিন্তু এ সেতুও তলিয়ে যায়। প্রতিবছর এখানে ঘুরতে আসেন প্রায় ৩০ লাখ পর্যটক।


মন্তব্য