kalerkantho

রহস্যজট

অঙ্কে গরমিল

প্রিন্স আশরাফ

৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



অঙ্কে গরমিল

অঙ্কন : মানব

দু-দুটি ঘরোয়া কেসে সাফল্যের পর মহিলা মহলে তমাপ্পি শখের গোয়েন্দাগিরির খবর বেশ ছড়িয়ে পড়েছে এখন। সহকারী পূর্ণতাও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। পূর্ণতার স্কুলেও খাতির বেড়ে গেছে। ক্লাসের মিসরা মাঝেমধ্যেই তাকে ‘মিস সত্যান্বেষী’ বলে ডাকেন। আর বান্ধবীরা ডাকে ‘টিকটিকির লেজ’ বলে। অর্থাৎ তমাপ্পি টিকটিকি, আর পূর্ণতা টিকটিকির লেজ।

পূর্ণতাও মাঝেমধ্যেই স্কুল ছুটির পর বা অবসরে তমাপ্পির বাসায় একটা চক্কর দিয়ে যায়। মেয়ে অসৎ সঙ্গে পড়ে বখে যাচ্ছে না বা পড়াশোনার তেমন ক্ষতি হচ্ছে না দেখে পূর্ণতার মা-বাবাও ওকে তমাপ্পির সঙ্গে গোয়েন্দাগিরি করার স্বাধীনতা দিয়েছেন।

পূর্ণতা তমাপ্পির বাসায় থাকা অবস্থায় এক ভদ্রমহিলা এলেন সেখানে। পূর্ণতাকে দিয়ে ভদ্রমহিলাকে ড্রয়িংরুমে বসিয়ে রেখে তমাপ্পি একটু সময় নিয়েই ড্রয়িংরুমে এলো। একটু গোয়েন্দা গোয়েন্দা ভাব আনার জন্য অনেক পকেটওয়ালা একটা কটিও কামিজের ওপর চড়িয়ে এসেছে।

বেশ অভিজাত বেশভূষার পাংশুটে ফ্যাকাশে মুখের ভদ্রমহিলা তমাপ্পিকে নিজের পরিচয় মিস শায়লা জানিয়ে বললেন, ‘আমার ভাগ্নি রীমাকে অপহরণকারীরা তুলে নিয়ে গেছে। বোনের মৃত্যুর পর সে আমার কাছেই মানুষ হয়েছে। আমি ওর একমাত্র বৈধ অভিভাবক। ’

‘অপহরণ হয়েছে কখন জানলেন?’

‘আজ দুপুরেই। ও সকালে ক্লাসে গিয়েছিল। সাধারণত দুপুরের দিকে ফেরে। ক্লাসে যাওয়ার পর থেকে ওর ফোন বন্ধ পাচ্ছিলাম। ভাবলাম, ক্লাসে আছে বলেই। ঠিক সেই সময়ই একটা অপরিচিত নম্বর থেকে আমার মোবাইলে কল আসে। জানায়, রীমাকে অপহরণ করা হয়েছে। ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে ওকে উদ্ধার করতে হবে। যথাসময়ে, যথাস্থানে টাকা না দিলে বা পুলিশকে জানালে রীমাকে চিরদিনের মতো হারাতে হবে। ’

‘ফোন পাওয়ার পর আপনি সরাসরি আমার কাছে এসেছেন?’

‘হ্যাঁ। আপনার মুন্নি খালা আমার পরিচিত। তিনিই আপনার কথা জানিয়ে ঠিকানা দিয়ে দিলেন। এখন যদি ত্বরিত কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেন, তাহলে পুলিশি ঝামেলায় জড়াতে হবে না। ’

‘ত্বরিত ব্যবস্থা বলতে আপনি কী বোঝাতে চাইছেন?’

‘শুনুন, আমি রীমার অভিভাবক। ওর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে ওই পরিমাণ টাকা তুলে আপনার হাতে দিতে চাই। টাকাটা যথাস্থানে অপহরণকারীদের দিয়ে ওকে মুক্ত করে নিয়ে আসবেন। আপনার পারিশ্রমিক আমি দেব। ’

‘যে ফোন নম্বর থেকে কল এসেছিল, সেটা কি দেখতে পারি?’

‘ওটা দেখা যাচ্ছে না। প্রাইভেট নম্বর হিসেবেই কল এসেছে। ’

‘তাহলে গোয়েন্দা হিসেবে আমি কিছু করতে পারব না!’

‘তা করতে গেলে হয়তো হিতে বিপরীত হয়ে যেতে পারে। ওরা যা বলছে, তা-ই আমাদের করা দরকার। ’ ভদ্রমহিলা আরো কিছু ডিটেইলস জানালেন। বললেন, রীমার বয়স এখন ১৭ বছর ৯ মাস। আর তিন মাস পর আঠারোয় পড়বে। তখন আইনমতে তার সম্পত্তির মালিক সেই হবে। তিনিও ভারমুক্ত হবেন জানিয়ে ভদ্রমহিলা বেরিয়ে গেলেন।

পূর্ণতা বিরক্ত গলায় বলল, ‘তমাপ্পি ফালতু কেস। মুক্তিপণের টাকা দেওয়ার জন্য গোয়েন্দার কী দরকার, সেটাই তো বুঝতে পারছি না। বাসার ড্রাইভারও তো এ কাজ করতে পারে!’

‘হুঁ। তাই তো ভাবছি। ভদ্রমহিলা কি কোনো চাল চাললেন...’ তমাপ্পির কথা শেষ হওয়ার আগেই কলিং বেল বেজে উঠল। তমাপ্পি দরজা খুলে দিলেন। পঞ্চাশোর্ধ্ব মুখে বলিরেখা, মাথায় হিজাব পরা একজন সম্ভ্রান্ত ভদ্রমহিলা বেশ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, ‘এটা কি গোয়েন্দা তমা খন্দকারের...’

তমাপ্পি তাকে থামিয়ে বলল, ‘আমিই তমা। আসুন, ভেতরে আসুন। ’

ভদ্রমহিলা সোফায় বসে একটু ধাতস্থ হয়ে বললেন, ‘আমাকে একটু পানি খাওয়ান। ’

তমাপ্পি বলার আগেই পূর্ণতা ভেতরের ঘর থেকে পানির বোতল ও গ্লাস নিয়ে এলো। ভদ্রমহিলা ভদ্রতার ধার না ধারে পুরুষালি ভঙ্গিতে সরাসরি বোতল থেকে পানি গলাধঃকরণ করে বললেন, ‘কেউ আমার পিছু নিয়েছিল। আমার সে রকমই মনে হচ্ছে। আচ্ছা, আপনাদের বাসা থেকে একটু আগে কি শায়লা বেরিয়ে গেল? ঠিকমতো দেখতে পাইনি। কিন্তু ওরকমই মনে হলো। ’

‘জি, ভদ্রমহিলা তাঁর নাম শায়লাই জানিয়েছিলেন। ’ তমাপ্পি এখনো কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না।

‘বোঝো! ও কী জন্য এসেছিল? রীমার অপহরণের ব্যাপারে?’

‘জি। আপনি জানলেন কিভাবে? মানে আপনাদের কানেকশনটা কী?’

‘রীমার ব্যাপারেই এসেছি। আমি ওর বড় ফুফু। রীমার মা-বাবা গাড়ি এক্সিডেন্টে মারা যাওয়ার পর আমিই ওর অভিভাবক। যদিও রীমা ওর খালা শায়লার কাছে মানুষ হয়েছে। কিন্তু একজনের কাছে মানুষ হলেই বৈধ অভিভাবক হয়ে যায় না! নাকি বলেন!’

তমাপ্পি পূর্ণতা একে অন্যের দিকে তাকাল। তাদের চোখাচোখিতে বোঝা গেল, কেস জটিলতর হতে শুরু করেছে। তমাপ্পি শান্ত স্বরে বলল, ‘ব্যাপারটা কী একটু খুলে বলবেন?’

ভদ্রমহিলার কাছ থেকে জানা গেল, আজ দুপুরেও তার রীমার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে। দুপুরের দিকে অপহরণকারীরা প্রাইভেট নম্বর থেকে ফোন দিয়েছিল, তার কাছে ১৫ লাখ টাকা দাবি করেছে। কিন্তু ঘাপলা বেধেছে অন্য জায়গায়, তিনি খোঁজ নিয়ে জেনেছেন, রীমার অ্যাকাউন্টে ১০ লাখ টাকা আছে। কিন্তু  রীমার অ্যাকাউন্টে ২০ লাখ টাকার কাছাকাছি থাকার কথা। অন্তত তাঁর ভাই মারা যাওয়ার সময় তা-ই ছিল।

তখনই তাঁর মনের মধ্যে খটকা জাগে। সে জন্যই গোয়েন্দার শরণাপন্ন হয়েছেন। তাঁর এক রিলেটিভ তমাপ্পির কথা জানিয়েছেন।

‘এখন আমাকে কী করতে বলেন?’ তমাপ্পি ধন্ধে পড়ে গেছে।

‘আপনি শুধু অপহরণ নয়, ওর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ওলটপালটের ব্যাপারেও তদন্ত করুন। রীমা নিজে টাকা তুলতে পারে না। অন্য কেউ তুলেছে। আমার ধারণা, টাকা তোলার সঙ্গেই এই অপহরণের সম্পর্ক আছে। ’ ভদ্রমহিলাও উপযুক্ত পারিশ্রমিকের কথা বলে চলে গেলেন।

তমাপ্পি ভেতরের ঘর থেকে ল্যাপটপ নিয়ে এলো। পূর্ণতা অবাক হয়ে বলল, ‘তুমি এখন এটা নিয়ে বসলে কেন? ব্যাংক অ্যাকাউন্টের খোঁজখবর নিতে যাবে না?’

‘আগে প্রাথমিক কাজটা ল্যাপটপে সেরে নিই। এখন ফেসবুকেই অনেক গোয়েন্দাগিরি করা যায়। চাকরিদাতারা পর্যন্ত প্রার্থীর ফেসবুক প্রোফাইল চেক করেন। ’

ফেসবুকে রীমার অ্যাকাউন্ট পেয়ে গেল তমাপ্পি। আর সেখান থেকেই বুঝতে পারল, ওই দুই ভদ্রমহিলা সত্যিই একজন খালা, আরেকজন ফুফু এবং রীমা খালার কাছেই মানুষ হয়েছে। তবে কে যে তার বৈধ অভিভাবক, মানে সহায়-সম্পত্তির অভিভাবক, তা ফেসবুক থেকে বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু রীমার একজন প্রেমিকের খোঁজ মিলল। রাজু আহমেদ। এখনো বেকার। চাকরিপ্রার্থী। তবে ফেসবুক স্ট্যাস্টাস পড়ে মনে হচ্ছে, রীমা সাবালিকা হয়ে সম্পত্তির মালিক হলে রাজুর আর চাকরির দরকার পড়বে না। এমনকি হয়তো ১৮ বছর হয়ে গেলেই ওরা বিয়ে করবে। সে রকমই ইঙ্গিত ফেসবুক স্ট্যাস্টাস দিচ্ছে।

তমাপ্পি উঠতে উঠতে বলল, ‘চলো, এবার বেরোনো যাক। প্রথমে প্রেমিকের খোঁজ। তারপর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট। তারপর আমাদের ক্লায়েন্ট। ’

রাজুকে তার মেসেই পাওয়া গেল। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার, সে রীমার অপহরণের কিছুই জানে না। দুপুরেও রীমার সঙ্গে তার  মোবাইলে কথা হয়েছে। শুধু দুপুরের পর থেকে মোবাইল বন্ধ পাচ্ছে। এমনকি ফেসবুক বা কোথাও নেই। হুটহাট মোবাইল বন্ধ করে রাখার বদ-অভ্যাস রীমার আছে, কাজেই সে বেশি একটা পাত্তা দেয়নি। রীমা অপহূত হয়েছে, গোয়েন্দা খোঁজ করছে শুনে বেশ হতভম্ব হয়ে পড়ল। কিন্তু রাজুর কাছ থেকেই একটা তথ্য পাওয়া গেল, খালার সঙ্গে রীমার সম্পর্ক ইদানীং ভালো যাচ্ছিল না। আর ব্যাপারটা তার সঙ্গে মেলামেশা নিয়েই। রীমার ব্যাংকের টাকার ব্যাপারেই সে শুনেছিল, লাখ বিশেক টাকা আছে বলেই জানত। ১৮ বছর হয়ে গেলেই তারা বিয়ে করবে—এ রকমটি জানার পর থেকে খালা অসহযোগিতা করছিলেন।

ব্যাংকে গিয়েই কেস অনেকটা পরিষ্কার হয়ে গেল। রীমার অ্যাকাউন্টে মাত্র ১০ লাখ টাকা আছে। সেই টাকাটা তোলার জন্য রীমার অ্যাকাউন্টের বৈধ অভিভাবক মিস শায়লা চেক জমা দিয়েছেন। ব্যাংকিং আওয়ারেই টাকাটা তোলা হবে। হ্যাঁ, রীমার ফুফু অ্যাকাউন্ট নম্বর নিয়ে কত টাকা আছে জানতে এসেছিল, কিন্তু টাকা তোলা তার পক্ষে সম্ভব নয়, কারণ তিনি এই অ্যাকাউন্ট হোল্ডারের অভিভাবক নন।

ব্যাংক থেকে বেরিয়ে তমাপ্পি পূর্ণতার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কেস এখন বেশ পরিষ্কার হয়ে গেছে। শুধু তা-ই নয়, একটু চাপ দিলে রীমা এখন কোথায় আছে তা-ও জানা যাবে। তবে অপহরণকারীদের একটা ভুলেই কেসটা পরিষ্কার হয়ে গেছে। ’

 

পাঠক, বলুন তো কে রীমাকে অপহরণ করেছে?  তমাপ্পি কিভাবে তা বুঝতে পারল?


মন্তব্য