kalerkantho


খেয়ালি সব চরিত্র

লেডি কর্কের চুরির রোগ

পৃথিবীতে বাতিকগ্রস্ত মানুষের অভাব নেই। এদের একেকজনের কাজ-কারবারের বর্ণনা শুনলে চোখ কপালে উঠবে। খেয়ালি এই মানুষগুলোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন নাবীল আল জাহান

৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



লেডি কর্কের চুরির রোগ

ষোড়শ শতকের শুরুতে, বিবাহসূত্রে আয়ারল্যান্ডের কর্ক অ্যান্ড ওরেরিতে বাস করতে আরম্ভ করেন রিচার্ড বয়েল। সেখানে তিনি অভিজাত আর্ল উপাধিও পান। ১৭৮৬ সালে এই কর্ক অ্যান্ড ওরেরি আর্লদের এক উত্তরসূরিকে বিয়ে করেন মেরি মংকটন। বিয়ের পর থেকে তিনি লেডি কর্ক নামেই পরিচিত হন। তবে এর আগে থেকেই বেশ বিখ্যাত হয়ে উঠেছিলেন। কারণ তাঁর সাহিত্যরুচি ও পড়াশোনা। বিয়ের আগে তিনি থাকতেন বার্কলে স্কয়ারের চার্লস স্ট্রিটে, তাঁর মায়ের বাড়িতে। সেখানে প্রায়ই আসতেন বিখ্যাত ব্রিটিশ সাহিত্যিক স্যামুয়েল জনসন।

৪০ বছর বয়সে লর্ড কর্ককে বিয়ে করার পরও তাঁর সাহিত্যপ্রীতি অক্ষুণ্ন রাখেন মেরি মংকটন। বাসায় নিয়মিত সাহিত্যের আড্ডা বসত। সেখানে লর্ড বায়রন, ওয়াল্টার স্কট, শেরিডান থেকে শুরু করে প্রিন্স রিজেন্ট পর্যন্ত আসতেন।

লেডি কর্ক বেঁচেছিলেনও অনেক দিন, ৯৪ বছর। আর বাসায় সাহিত্য আড্ডা চালু রেখেছিলেন ৯০ বছর বয়স পর্যন্ত। আড্ডা দেওয়ার জন্য ড্রইংরুমটি বেশ অদ্ভুতভাবেই সাজানো ছিল। ঘরের মধ্যে কয়েক ডজন বড় বড় আরামদায়ক আর্মচেয়ার বসানো ছিল। সবগুলোই মেঝের সঙ্গে আটকানো। কোনোভাবেই ওগুলো সরানো সম্ভব ছিল না। সাহিত্যকর্ম সংরক্ষণের জন্যও বেশ বিখ্যাত ছিলেন লেডি কর্ক। তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহশালায় ছিল বিখ্যাত সব সাহিত্যকর্ম।

লেডি কর্কের অদ্ভুত একটা সমস্যা ছিল। আসলে একটা রোগই বলা চলে একে। নাম ক্লেপ্টোমেনিয়া—মানে নিজের অজ্ঞাতসারে অন্যের জিনিস নিয়ে নেওয়া। বেড়াতে গিয়ে প্রায়ই সেসব বাড়ির জিনিসপত্র নিয়ে চলে আসতেন। তাঁর খাস পরিচারিকার অন্যতম কাজই ছিল এগুলো ফেরত দিয়ে আসা। সেই সঙ্গে ক্ষমা চেয়ে আসতেন মালকিনের হয়ে।

লেডি কর্কের এই স্বভাব ঠিক কবে শুরু হয়েছিল, তা কেউই লক্ষ করেনি। তবে একসময় সবাই খেয়াল করল বিষয়টা। আবিষ্কার করল, বিশেষ করে রুপার জিনিসপত্রের প্রতি তাঁর ক্লেপ্টোমেনিয়াক আগ্রহ সবচেয়ে বেশি। তাই তিনি যে বাড়িতে বেড়াতে যেতেন, তারা এমনকি রুপার চামচগুলোও লুকিয়ে ফেলত। তখনকার ব্রিটেনে একটি চল ছিল, বনেদি ঘরের স্ত্রীরা বাজারে গিয়ে প্রায়ই দোকান পর্যন্ত যেতেন না। দোকানের সামনে জুড়িগাড়িতে বসে বসে আদেশ দিতেন, দোকানদাররা জিনিস তাঁদের কাছে পাঠাতেন, তাঁরা সেখানে বসে বসে জিনিস পছন্দ করতেন। কিন্তু লেডি কর্কের ক্ষেত্রে নিয়ম ছিল, তিনি দোকানে ঘুরে ঘুরে জিনিস পছন্দ করবেন, আর দোকানের একজন কর্মচারী পুরোটা সময় তাঁর সঙ্গে সঙ্গে থাকবেন।

অজ্ঞাতসারে কেবল রুপার জিনিসই যে পকেটস্থ করতেন লেডি কর্ক তা না। একবার তো এক হোটেলে গিয়ে আরেকজনের পোষা প্রাণীও চুরি করেছিলেন—একটা হেজহগ। ওটার মালিক ছিলেন এক ব্যবসায়ী। একই হোটেলে উঠেছিলেন তিনিও। আদুরে হেজহগটা হোটেলের লবিতে চড়ে বেড়াচ্ছিল। পোষা যেহেতু, কেউ কিছু বলছিলও না। বের হওয়ার সময় লেডি কর্ক টুক করে ওটাকে ধরে তাঁর হাতব্যাগে ভরে নেন। কয়েক মাইল যাওয়ার পর অনুধাবন করেন, কাজটা ঠিক হয়নি। তখনো অবশ্য হেজহগটাকে মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেননি। বরং ওটাকে একটা বেকারিতে বেঁচে দেন। বেকারির মালিককে উল্টো বোঝান যে হেজহগ কালো গুবরেপোকাদের শায়েস্তা করতে ভীষণ কার্যকর। আরেকবার তো একটা পার্টি শেষে আরেকজনের জুড়িগাড়ি নিয়েই চলে আসেন। পরের দিন যখন মালিক গাড়িটা ফেরত নিতে এলেন, উল্টো তাঁর কাছে অভিযোগ করতে শুরু করলেন, গাড়ির পাদানিটা অনেক উঁচু। তিনি খাটো মানুষ, উঠতে ভীষণ সমস্যা হচ্ছিল।


মন্তব্য