kalerkantho


দরজার ওপাশে

পরিপাটি ভুতুড়ে শহর

কানাডার এক শহরে ১৯৮২ সালের পর আর কোনো পরিবার স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেনি। কিন্তু এখানকার পরিচ্ছন্ন ও চমত্কার অবস্থায় থাকা বাড়িঘর, রেস্তোরাঁ, হাসপাতাল, ব্যাংক, থিয়েটার দেখলে আপনার কখনোই একে ভুতুড়ে শহর বলে মনে হবে না। জানাচ্ছেন নাবীল অনুসূর্য

৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



পরিপাটি ভুতুড়ে শহর

কিটসল্ট শহরের প্রবেশমুখে কয়েকজন পর্যটক

ভুতুড়ে শহর শুনলেই মনে হয় একটা শহরের ধ্বংসস্তূপ। ভাঙাচোরা বাড়িঘর, রাস্তাঘাটে, উঠানে—সর্বত্র পুরু ধুলার আস্তরণ।

তেমন না হলে যেন ভূতেদের কিত্তন জমেই না। কিন্তু ঠিক এর উল্টো একটা ভুতুড়ে শহর আছে কানাডায়। একদম পরিপাটি করে সাজানো, নিখুঁত একটা শহর। কোথাও একটু ধুলা জমে নেই। রাস্তার পাশের গাছগুলো পর্যন্ত নিখুঁতভাবে ছাঁটা। প্রতিটি বাড়ি একদম ঠিকঠাক। উঠান সুন্দর করে সাজানো। আছে শহরে যা যা থাকা দরকার তার সব—শপিং সেন্টার, রেস্তোঁরা, ব্যাংক, পাব, থিয়েটার। এমনকি প্রতিদিন সন্ধ্যায় পুরো শহরের সব বাতিও জ্বলে ওঠে। কেবল ওখানে কোনো মানুষ থাকে না।

শহরটির নাম কিটসল্ট। অবস্থান কানাডার দক্ষিণে, আলাস্কার সীমান্তের কাছে, প্রশান্ত মহাসাগরের ব্রিটিশ কলম্বিয়া উপকূলে। এই উপকূলে প্রশান্ত মহাসাগর থেকে একটা খাঁড়ি ঢুকে গেছে ভেতরের দিকে, নাম অবজারভেটরি খাঁড়ি। সেটা থেকে পূর্ব দিকে চলে গেছে আরেকটি শাখা, নাম অ্যালিস আর্ম। এই শাখার শেষ মাথায়, কিটসল্ট নদীর মুখে একই নামের শহরটি অবস্থিত। এখান থেকে নিকটবর্তী শহর টেরেসের দূরত্ব প্রায় ১১৫ কিলোমিটার।

শহরটির গোড়াপত্তন হয় গত শতাব্দীর সত্তরের দশকে, মলিবডিনামের একটা খনিকে কেন্দ্র করে। বহু আগেই এই অঞ্চলে খনির খোঁজ শুরু হয়েছিল। বিশেষ করে অবজারভেটরি খাঁড়ির আশপাশের অঞ্চলে। সে সময় এখানে অনেকগুলো খনির খোঁজও পাওয়া গিয়েছিল—রুপা, সিসা, দস্তা আর তামার খনি। সেই খনিগুলোকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলে অনেকগুলো শহরও রাতারাতি গজিয়ে ওঠে। এগুলোর মধ্যে অন্যতম অ্যালিস আর্ম এবং অ্যানিয়ক্স। পরে গত শতকের ষাটের দশকের শেষ দিকে এসে এই অঞ্চলে মলিবডিনামের খনি আবিষ্কৃত হয়। ইস্পাত মজবুত করতে ও ক্ষয় রোধ করতে মলিবডিনাম ব্যবহার করা হতো।

আর এই সুযোগের সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে মার্কিন খনি কম্পানি ফেল্পস ডজ। কিটসল্ট নদীর মুখে, মলিবডিনামের খনিকে কেন্দ্র করে তারা গড়ে তুলল নতুন একটা শহর—কিটসল্ট।

শহরটি গড়ে তোলা হয় কয়েক শ একর জমির ওপর। একে ঘিরে বিশাল পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। জাহাজ ভরে ভরে নির্মাণের কাঁচামাল আসতে লাগল। তাড়াহুড়ো করে টেরেস থেকে আসার জন্য একটি কাঁকর বিছানো রাস্তা বানানো হয়। সে পথ দিয়ে পাহাড়-পর্বতের ফাঁক গলে কিটসল্টে আসতে সময় লাগে মাত্র সাড়ে তিন ঘণ্টা। আশপাশের সব শহর থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ইঞ্জিনিয়ার আর নির্মাণশ্রমিক এসে জড়ো হতে লাগল কিটসল্টে। বানানো হলো শখানেক ছোট বাসা আর ডুপ্লেক্স। অ্যাপার্টমেন্ট ভবন হলো সাতটি। পাশাপাশি স্থাপন করা হলো আধুনিক হাসপাতাল, শপিং সেন্টার, পোস্ট অফিস, পাব, সুইমিংপুল আর লাইব্রেরি। আলাদা করে দুটি বিনোদনকেন্দ্র তৈরি হলো। বানানো হলো রেস্তোরাঁ আর ব্যাংক। মাটির নিচ দিয়ে টানা হলো কেবল টিভি আর টেলিফোনের তার। বসানো হলো পুরো প্রদেশের মধ্যে সবচেয়ে অত্যাধুনিক পানির লাইন আর স্যুয়ারেজ সিস্টেম।

শহরের কাজ শেষ হওয়ার পর একটার পর একটা পরিবার এসে বসতি গাড়তে লাগল। মানুষের আনাগোনা বাড়তেই লাগল। জনসংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে গেল দ্রুতই। আর শহরটার যখন রমরমা অবস্থা, তখনই মলিবডিনামের দর পতন ঘটল। এদিকে তামার খনিতে উপজাত হিসেবে মলিবডিনামের উত্পাদন শুরু হয়েছে। খরচ পোষাতে না পেরে কিটসল্টের মলিবডিনামের খনিটাই বন্ধ হয়ে গেল। ফলে শহরটারও কপাল পুড়ল। ১৯৮২ সালের মধ্যেই একদম জনশূন্য হয়ে গেল।

তার পর থেকে ওভাবেই ছিল। পরিপাটি করে সাজানো বটে, কিন্তু জনশূন্য, ভুতুড়ে। খনি কম্পানি শহরটিকে যাকে বলে একেবারে তালাবদ্ধ করে রেখেছিল। অবশেষে ২০০৫ সালে তারা এটি বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়। শহরটি বানাতে কত খরচ হয়েছিল, তা তারা কখনোই প্রকাশ করেনি। তবে এখনকার হিসাবে তা কম করে হলেও ২৫ কোটি ডলারের কম হবে না। সেই শহরটাই শেষ পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে মাত্র ৭০ লাখ ডলারে। কিনে নিয়েছেন ভারতে জন্মানো কানাডিয়ান এক ব্যবসায়ী। নাম কৃষ্ণান সুদানথিরান।

এরই মধ্যে শহরটির পেছনে তিনি আরো আড়াই কোটি ডলারের মতো খরচও করেছেন। দেখাশোনার জন্য কয়েকজন লোক নিয়োগ দিয়েছেন। তারাই নিয়মিত একে সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখছে। শহরের বাড়িঘর সারাই করছে। উঠানগুলো পরিষ্কার করছে। রাস্তার পাশের গাছগুলো কেটে-ছেঁটে রাখছে। সন্ধ্যা নামলেই শহরের বাতিগুলো জ্বালানোর ব্যবস্থা করছে। শহরটি ঘিরে সুদানথিরানের বিশাল পরিকল্পনাও আছে। তিনি একে কেন্দ্র করে লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাসশিল্প গড়ে তোলার কথা ভাবছেন। আর দ্রুতই শুরু করতে যাচ্ছেন একটা রিসোর্টের কাজও। সে জন্য কিটসল্ট রিসোর্টস লিমিটেড নামে একটি কম্পানিও গঠন করেছেন। সেখানে কেবল ব্যবসা দেখাশোনার জন্য মানুষই নিয়োগ করেননি, কম্পানির কর্মপদ্ধতি নির্ধারণের জন্য পরিবেশবিদের সঙ্গে আলোচনারও বন্দোবস্ত করেছেন। যাতে শহরটি নতুন করে গড়ে তুলতে গিয়ে পরিবেশ-প্রকৃতি এবং সেখানকার স্থানীয় ঐতিহ্যের বড় ধরনের কোনো ক্ষতি না হয়। এদিকে এখনো শহরটিতে সাধারণ পর্যটক প্রবেশে বিধিনিষেধ আছে। তবে বিশেষ অনুমতি নিয়ে গোটা এলাকা ঘুরে দেখা যায়।


মন্তব্য