kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

রহস্যজট

মাছ শিকার

শেখ আবদুল হাকিম   

১৬ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



মাছ শিকার

অঙ্কন : মাসুম

লব্ধ সৈকত আর নিষ্ঠা নিরবধি একটি হ্রদে কিশোর-কিশোরীদের জন্য আয়োজিত বার্ষিক মত্স্য শিকার প্রতিযোগিতায় নাম লিখিয়েছে বিজয়ী মারুফের কারণে।

বিজয়ী মারুফের একটি যন্ত্রচালিত নৌকা আছে।

এই প্রতিযোগিতায় যে কেউ অংশ নিতে পারে, তবে শর্ত হলো—তার বয়স ১৫  বছরের বেশি হওয়া চলবে না।

গরমকালে মারুফের সঙ্গে বেশ কয়েকবার মাছ ধরতে গেছে সৈকত এবং দুঃখের বিষয়, প্রতিবার ওকে তিক্ত অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়েছে। দু-একটা খুদে পাঙ্গাশ বা তেলাপিয়া ছাড়া ওদের ভাগ্যে কখনো কিছু জোটেনি। সৈকত একবার একটা বড় বাইন মাছ ধরলেও, নৌকায় সেটি তোলা সম্ভব হয়নি।

বিজয়ী মারুফ এমনিতে খুব নরম মনের ছেলে, ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র, তবে বড় বড় মাছ ধরার চেয়ে বড় বড় কথা বলতে বেশি দক্ষ। যদিও তার এই বড় বড় কথা বলার অভ্যাসটাকে সৈকত খুব বড় করে দেখে না। এত অল্প বয়সেই তার অভিজ্ঞতা হলো, অনেক কিছু দেখেও না দেখার ভান করতে হয়, তা না হলে বন্ধুত্ব টেকে না।

প্রতিযোগিতা আরম্ভ হলো বৃহস্পতিবার ভোরবেলা দিগন্তে সূর্য উঁকি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। শুরুর বাঁশি বাজতে না বাজতে ২৩টি মোটর লাগানো নৌকা ছুটল, মাছ শিকারি কিশোররা সবাই চেষ্টা করছে—কে কার আগে পছন্দের মাছের আস্তানায় পৌঁছতে পারবে। বিজয়ী মারুফ তার ছোট্ট নৌকা মাছরাঙা নিয়ে টাওয়ার পয়েন্টের দিকে যাচ্ছে।

‘গত সপ্তায় ওখানে আমি ঘাসের একটা বিছানা আবিষ্কার করেছি। ’ বলল সে। ‘আমার ধরা বোয়াল মাছটা যদি দেখতে! আমি ওটার ছবি তুলেছি, শুধু নেগেটিভের ওজনই এক কেজির কম হবে না। টাওয়ার পয়েন্ট আমার গোপন ফিশিং স্পট। ’

দেখা গেল, মারুফের গোপন স্পটটি আরো অনেকেরই গোপন স্পট। ওদের মাছরাঙা যখন পৌঁছল, তার আগেই পাঁচ কি ছয়টি নৌকা ওখানকার ঘাসের বিছানার বেশির ভাগ দখল করে নিয়েছে। ইঞ্জিন বন্ধ করে নৌকাকে স্রোতের সঙ্গে ভেসে যেতে দিল মারুফ।

‘মত্স্যকুল’, ঘোষণার সুরে বলল সে—‘তোমাদের যদি লড়াই করার দুঃসাহস থাকে, আমি তোমাদের দোরগোড়ায় চলে এসেছি। ’

হি হি করে হেসে উঠে মুখে হাতচাপা দিল নিষ্ঠা।

আধঘণ্টা চেষ্টা করার পর একটি টাকি মাছ ধরল সে, নিষ্ঠা ধরল একটি তেলাপিয়া। দুটির একটিও রাখার মতো বড় নয়, কাজেই লেকের জিনিস লেককেই ফিরিয়ে দিতে হলো।

‘মাছধরা একটি চোখ জুড়ানো স্পোর্টস হতে পারে। ’ মন্তব্য করল সৈকত। টোপে প্রথম কখন ঠোকর দেবে মাছ, তার অপেক্ষায় ধৈর্যের পরীক্ষা দিচ্ছে।

‘আজ এদিকের স্রোতে সমস্যা আছে। ’ অভিযোগ করল মারুফ। ‘চলো, আমার চেনা আরেক স্পটে যাই—কুমারজিৎ ল্যান্ডিংয়ে। ওখানে আমরা হরদম এত বেশি রুই-কাতলা ধরব যে আমাদের কনুই ব্যথা করবে। ’

কুমারজিৎ ল্যান্ডিং পুরো খালি পড়ে আছে, শুধু মাছ বাদে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে টোপ খেতে শুরু করল ক্ষুধার্ত মাছের ঝাঁক।

‘এটাই এই লেকের সেরা স্পট! আনন্দে আর উত্তেজনায় চেঁচিয়ে উঠল মারুফ। তারপর দ্রুত রিল ঘুরিয়ে বেশ বড় একটি কাতলা মাছ নৌকার কাছে নিয়ে আসার চেষ্টা করল।

১০ মিনিটের মধ্যে তিনটি রুই, দুটি কাতলা, একটি কালিবাউস পেল ওরা। কপাল বেশ ভালোই বলতে হবে। যদিও বরফের বাক্স এখনো খালি খালি লাগছে।

সৈকত তার দ্বিতীয় রুই বড়শিতে আটকেছে, এই সময় দৃশ্যটা পুরোপুরি বদলে গেল। ২৪ ফুট লম্বা লোহার তৈরি একটা ঝকঝকে নতুন বোটকে তীর বেগে সরাসরি মাছরাঙার দিকে ছুটে আসতে দেখল ওরা।

‘ওটা জোহা জসিমের বোট। ’ বলল নিষ্ঠা। ‘কী করছে ও?’

একেবারে শেষ সেকেন্ডে একটু ঘুরে গেল ঝকঝকে ফিশিং বোট, একটুর জন্য মাছরাঙার সঙ্গে সংঘর্ষ হলো না, গতি কমিয়ে থেমে গেল খানিক দূরে।

চোখে অবিশ্বাস নিয়ে জসিম আর টিনএজ দুই ছেলের দিকে তাকিয়ে আছে নিষ্ঠা। ‘ওদের মাথা কি সিমেন্টে ভরা? আরেকটু হলে আমরা ডুবে যেতাম!’

‘ওদের দেখেও না দেখার ভান করো। ’ পরামর্শ দিল সৈকত। ‘এসো, আমরা মাছ ধরি। ’

‘না, এখানে আর মাছ পাওয়া যাবে না। ’ বলল মারুফ। ‘জসিম ভয় পাইয়ে সব মাছ ভাগিয়ে দিয়েছে। ’

নোঙর তুলল সে। পরবর্তী তিন ঘণ্টা এক ফিশিং পয়েন্ট থেকে আরেক ফিশিং পয়েন্টে ঢুঁ মারল ওরা। সকাল ১১টার দিকে নৌকা নিয়ে ডকের দিকে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল মারুফ। দুপুরে শেষ হলো প্রতিযোগিতা।

যেসব নৌকা একেবারে শেষে ফিরল, সেগুলোর মধ্যে মাছরাঙাও রয়েছে। ডকে ভিড়িয়ে বাঁধা হলো নৌকা, তারপর তিন শিশু বিচারকদের টেবিলে গিয়ে রিপোর্ট করল।

শুদ্ধ ইমান, সৈকতের বন্ধু, মাছের মাপ নিতে সাহায্য করছিল। ‘কিছু পেলে?’ জানতে চাইল সে।

‘একদম কিছু পাইনি তা না, তবে জেতার জন্য তা যথেষ্ট নয়। ’ উত্তর দিল নিষ্ঠা। ‘তিন কি চারটি রুই, তিনটি কাতলা, বাকি সব চুনোপুঁটি বললেই হয়। ’

‘কে সবচেয়ে ভালো করল?’ জানতে চাইল মারুফ।

‘জোহা জসিম নিশ্চিত জিতবে বলে মনে হচ্ছে। ’ মন খারাপ করে বলল শুদ্ধ ইমান।

‘অসম্ভব। ’ বলল সৈকত। ‘যাদের বয়স ১৫ বা তার নিচে, এই প্রতিযোগিতা শুধু তাদের জন্য। আজ জসিমের ষোলোতম জন্মদিন। ’

‘না, সেটি পুরোপুরি সত্য নয়। ’ শুধরে দিল শুদ্ধ ইমান। ‘জসিম বিচারকদের বিশ্বাস করাতে পেরেছে যে তার জন্ম সন্ধ্যাবেলা। কাজেই তার ১৫ বছর বয়স হতে আরো কয়েক ঘণ্টা বাকি আছে। ’

‘কত বড় পাজি! কত বড় চতুর!’ চেঁচাতে লাগল মারুফ। ‘ওর মতো এমন নির্লজ্জ মিথ্যুক...’

‘জসিম বলছিল, সবচেয়ে বড় বোয়াল মাছটা কুমারজিৎ ল্যান্ডিংয়ের ওদিক থেকে ধরেছে সে। ’ বলল ইমান। ‘তার দাবি, তোমরা নাকি ওটা তাকে ধরতে দেখেছ। ’

কাছাকাছি টেবিলে গুছিয়ে রাখা কাগজপত্র খুঁজে দেখছে ইমান। রঙিন একটা ছবি পেয়ে সৈকতের হাতে ধরিয়ে দিল।

‘এই হলো জসিমের বোয়াল মাছ ধরার রঙিন ছবি। ’ বলল ইমান। ‘ছবিটা তোলা হয়েছে তার হাইস্পিড পোলারয়েড ক্যামেরা দিয়ে, ওই ক্যামেরা নিজের ছবি নিজেই ডেভেলপ করে। ’

সৈকত, নিষ্ঠা আর মারুফ ছবিটির দিকে তাকিয়ে আছে। ছবিতে ঝকঝকে ফিশিং বোটের পেছন দিকে ধনুকের মতো বাঁকা একটি মাছ ধরার রড (ছিপ) দেখা যাচ্ছে। পানির এক ফুট ওপরে, শূন্যে দেখা যাচ্ছে বড়সড় একটি বোয়াল মাছ। বড়শিতে আটকানো মাছ লাইনের (সুতো) বিরুদ্ধে লড়াই করার ভঙ্গিতে ঝুলে রয়েছে, ওটার লেজ ভাঁজ খাওয়ার পরিচিত ঢংয়ে ওপর দিকে বাঁকা হয়ে আছে। ছবির প্রতিটি খুঁটিনাটি এত পরিষ্কারভাবে ফুটেছে যে সৈকত লাইনটি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। দেখতে পাচ্ছে, মাছের লেজ থেকে পানির ফোঁটাগুলো সরাসরি নিচের দিকে ঝরে পড়ছে।

‘এখানে কিন্তু বলা সম্ভব নয়, কে মাছটি ধরছিল। ’ প্রতিবাদের সুরে বলল নিষ্ঠা। ‘জসিমকে ছবিতে দেখা যাচ্ছে না। ’

‘না, তা দেখা যাচ্ছে না। ’ বলল ইমান। ‘কিন্তু একটু ভালো করে লক্ষ করো। পেছন দিকে একটা নৌকা রয়েছে। ’

ফটোয় আরেকটি নৌকো দেখা যাচ্ছে। যদিও সেটি বেশ খানিক দূরে হওয়ায় অস্পষ্ট দেখাচ্ছে, নৌকাটি দেখে মাছরাঙা বলেই মনে হচ্ছে। তিনটি আবছা মূূর্তিরও সৈকত, নিষ্ঠা আর মারুফের মতো একই রঙের কাপড় পরা।

‘জসিম ছবিটি বিচারকদের কাছে রেখে গেছে এটা প্রমাণ করার জন্য যে মাছটি ধরার সময় তোমরা ওখানে উপস্থিত ছিলে। ’ বলল ইমান। ‘তোমরা তার সাক্ষী। ’

‘সৈকত!’ অস্থির হয়ে বলল নিষ্ঠা, ‘তোমাকে প্রমাণ করতে হবে ছবিটি নকল!’

ছবিটি এবার আরো খুঁটিয়ে দেখল সৈকত।

‘একমাত্র মাছটিই কঠিন অংশ। ’ বলল সে। ‘কেসের বাকিটুকু একদম সহজ। ’

কী বলতে চাইছে সৈকত?

 


মন্তব্য