kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

লেক

আয়না হ্রদ

নাবীল অনুসূর্য   

১৬ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



আয়না হ্রদ

অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া প্রদেশের রাজধানী শহর মেলবোর্ন। এ শহর থেকে আরো সাড়ে ৩০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে গেলে দেখা মেলে এক আশ্চর্য লেকের।

সেটি যেন লেক নয়, একটি বিশাল আয়না। আর তাতে ছায়া পড়ে পুরো আকাশের। তাই লেকটির ডাকনাম হয়ে গেছে ‘স্কাই মিরর’। লেকটি আবার তেমন একটি গভীরও না। বেশির ভাগ জায়গায়ই গোড়ালি, বড়জোর হাঁটু পর্যন্ত পানি। তাই সে লেকের বুকে অনায়াসে হেঁটে বেড়ানো যায়। তখন দূর থেকে দেখলে মনে হয়, কেউ বুঝি মেঘের রাজ্যে হেঁটে বেড়াচ্ছে!

অদ্ভুত এই লেকের নাম টাইরেল লেক। আয়তন প্রায় ২০ হাজার হেক্টর। আসলে ওটি ঠিক লেকও না। একটি বিশাল সমভূমি। সেই সমভূমিজুড়ে রয়েছে লবণের গভীর আস্তরণ। লেকটি যে একটি নিখুঁত দর্পণের মতো কাজ করে, তার কারণও এই লবণের আস্তরণ। অবশ্য ওখানে বেড়াতে গেলেই মেঘের রাজ্যে হাঁটা যায় না। তার জন্য খানিকটা হিসাব-নিকাশেরও দরকার আছে। বছরের বেশির ভাগ সময়ই এই লেকে পানি থাকে না। বর্ষা মৌসুমে অল্প একটু পানি হয়। সে পানিতে হেঁটে বেড়াতে মোটেই সমস্যা হয় না। তবে মেঘের রাজ্যে হাঁটার জন্য আবহাওয়া ভালো হতেই হবে। নইলে আকাশের ছায়া ঠিকমতো পড়ে না। অবশ্য এই লেকে আকাশের সৌন্দর্যের সবচেয়ে খোলতাই হয় রাতের বেলা। রাতের পরিষ্কার আকাশে যখন অগণিত তারা ওঠে, তখন লেকের পানিতে দেখা যাবে সে তারাদের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। মনে হয় যেন ভুল করে কেউ তারার রাজ্যে চলে এসেছে।

এই লেক প্রথম আলোচনায় আসে বছর কয়েক আগে। এর কিছু ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে টাইরেল লেকের ছবিগুলো রীতিমতো ঝড় তোলে। তার পর থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে চীনা পর্যটক আসতে শুরু করে এখানে। টাইরেল লেকটি পড়েছে ম্যালি শহরে। এটিকে বড়জোর মফস্বল শহর বলা যেতে পারে। পুরো ম্যালির জনসংখ্যাই মোটে ৬০০ জন। টাইরেল লেকের এই খ্যাতি অবশ্য ম্যালির সামনে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। আগে কেবল কৃষির ওপর নির্ভরশীল ছিল এই শহর। এখন শহরটির অন্যতম আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে পর্যটনশিল্প।

চীনারা যে এই লেক নিয়ে মাতামাতি শুরু করেছে, তারও অবশ্য একটি কারণ আছে। এমন একটি লেক যে আছে চীনেও। শিংহাই প্রদেশের উলান অঞ্চলের ওই লেকের নাম ছাকা। ডাকনাম ‘মিরর অব দ্য স্কাই’। তবে টাইরেলের চেয়ে ছাকা লেক খানিকটা ছোট। এটির আয়তন সাড়ে ১৩ হাজার হেক্টর। শুকনো মৌসুমে এই লেকেরও পানি কমে যায়। তারপর বর্ষা মৌসুমে যখন পানি বেড়ে যায়, লেকের পুরোটা পানিতে ঢেকে যায়, তখনই লেকটি আকাশের দর্পণ হয়ে ওঠে।

হাজার হাজার বছর আগে চীনের এই অঞ্চল আসলে সাগরের অংশ ছিল। তবে অগভীর অংশ। পরে এখানকার নিচের টেকটনিক প্লেটটা ওপরে উঠে আসে। ফলে এই অঞ্চলের উচ্চতা বেড়ে যায় প্রায় তিন হাজার মিটার। মাঝে এই ছাকা লেকের অংশটি নিচু থেকে যায়। সাগরের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও সাগরজলের অপরিশোধিত লবণ এই লেকেই থেকে যায়। সঙ্গে আরো যোগ হতে থাকে আশপাশের পাহাড়গুলোতে জমা হওয়া লবণও। বৃষ্টির পানি আর পাহাড়ি ঢলে ধুয়ে ধুয়ে সেসব লবণও প্রতিনিয়ত এই ছাকা লেকে জমা হচ্ছে। সব মিলিয়ে এই লেকও টাইরেল লেকের মতো আকাশের দর্পণ হয়ে ওঠে। পাশাপাশি লেকটিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে সমৃদ্ধ লবণশিল্প।

আকাশের দর্পণ হিসেবে পরিচিত লেক পৃথিবীতে কেবল এই দুটিই নয়, আছে আরো। এ যাবৎ সবচেয়ে বিখ্যাত লেকটির নাম সালার দে উউনি। ওটির ডাকনাম ‘মিরর অব গড’। নামটি একেবারে অপ্রাসঙ্গিকও নয়। সাড়ে ১০ লাখ হেক্টর আয়তনের সেই লেকের ভেতর ঢুকলে যে ভুলেই যেতে হয়, ওটা পৃথিবীর কোনো জায়গা! মনে হয়, আকাশের বুকে কোনো অপার্থিব জগতে বুঝি নিয়ে এসেছে কেউ!


মন্তব্য