kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


দরজার ওপাশে

আলেপ্পোর বিড়াল-দরদি

যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার আলেপ্পো শহর ছেড়ে চলে গেছেন অনেকেই। কিন্তু এক তরুণ রয়ে গেছেন শুধু এখানকার বিড়ালদের টানে। তাঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন নাবীল আল জাহান

১৬ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



আলেপ্পোর বিড়াল-দরদি

সিরিয়ার সবচেয়ে বড় শহর আলেপ্পো। পুরনো এই শহর শুধু সিরিয়ারই না, এখনো টিকে থাকা পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন শহরগুলোর একটি।

আরেকটু খোলসা করে বললে পত্তনের পর থেকে এখনো পর্যন্ত যে শহরগুলো টিকে আছে, ধারাবাহিকভাবে মানুষ বসবাস করে যাচ্ছে, আলেপ্পো সে ধরনের সবচেয়ে পুরনো শহরগুলোর একটি। সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলের কেন্দ্র ছিল এটি এই কয়েক বছর আগেও। মানুষে গিজগিজ করত। পর্যটকের ভিড় লেগে থাকত সারা বছর।

 

এখন কিন্তু একেবারে উল্টো অবস্থা। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের বলি হয়ে শহরটি রীতিমতো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ২০১২ সালে শুরু হওয়া এই যুদ্ধের শুরু থেকেই শহরটিতে নিয়মিত গোলাগুলি আর বোমাবর্ষণের ঘটনা ঘটছে। লোকজনও এক এক করে শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছে। এই চার বছরে আলেপ্পো ছেড়েছে না হলেও ৪০ হাজার মানুষ। এখন এই যে এত মানুষ শহর ছেড়ে পালাচ্ছে, তাদের অনেকেই তো পশুপাখি পালত। অনেকেরই ছিল পোষা বিড়াল। এই হতভাগ্য পোষা বিড়ালগুলোর ভাগ্যে কী ঘটল?

না, এরা অসহায় হয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত শহরের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে না। অতর্কিত কোনো বোমার আঘাতে এদের ছিন্নভিন্ন হতে হচ্ছে না। কারণ মা-বাবার মতো ভালোবাসায় ওদের আগলে রেখেছেন একজন মানুষ। তাঁর নাম মোহাম্মদ আলা জলিল। অনেকে অবশ্য তাঁকে এখন চেনেন ‘ক্যাটম্যান অব আলেপ্পো’ নামে। আগে আলেপ্পোতে বিদ্যুৎ মিস্ত্রির কাজ করতেন। এখন অবশ্য আর শহরটিতে ওই কাজ করার জো নেই। মানুষ সবাই যে যেভাবে পারছে পালাচ্ছে, এর মধ্যে বিদ্যুতের কাজ করানোর গরজ থাকবে কার! এখন আলা জলিল মূলত অ্যাম্বুল্যান্স চালান। সেটাও অনেকটা ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মতো। সারা দিন অ্যাম্বুল্যান্সে করে আলেপ্পো চষে বেড়ান। কোথাও কোনো হামলায়-বোমাবর্ষণে সাধারণ মানুষ আহত হলে, ভবন ধসে তার নিচে চাপা পড়লে তাদের উদ্ধার করেন। তারপর আহত মানুষগুলোর সেবা-যত্নও করেন। বাকিটা সময় দেখাশোনা করেন বিড়ালদের।

আলা জলিলের পরিচিতরা সবাই যখন আলেপ্পো ছেড়ে যাচ্ছিল, তাদের পোষা বিড়ালগুলো দেখাশোনা করার আর কেউ ছিল না। আলা জলিল নিজেও বিড়াল পালতেন। বিড়ালদের খুব পছন্দও করেন তিনি। কাজেই ওই অভিভাবক ছাড়া বিড়ালগুলো নিজের কাছে রেখে একসঙ্গে পালতে শুরু করলেন। তখন তাঁর কাছে ছিল ২০-৩০টি বিড়াল। দ্রুতই আলা জলিলের এই বিড়ালদের অভয়াশ্রমের খবর শহরময় ছড়িয়ে পড়ে। যারাই বিড়াল পালত, সবাই শহর ছাড়ার আগে পোষা বিড়ালটি তাঁর কাছেই রেখে যেতে লাগল। অনেক বিড়াল আবার মালিকদের দিয়েও যেতে হয়নি। মালিক হারিয়ে ওরা নিজেরাই আলা জলিলের ডেরা খুঁজে বের করে নিয়েছে। আলা জলিলও পরম মমতায় সব বিড়ালকেই গ্রহণ করেছেন। আর বছরখানেকের মধ্যেই আলা জলিলের আশ্রমে আশ্রিত বিড়ালের সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে যায়।

তাঁর কাছে আশ্রিত এই বিড়ালগুলোর ভালোই যত্ন-আত্তি নেন আলা জলিল। এগুলোই যে এখন তাঁর সব। আলেপ্পোতে এখন আর তাঁর পরিচিত মানুষ—বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন নেই বললেই চলে। সবাই জান বাঁচাতে শহর ছেড়ে চলে গেছে। থেকে গেছেন কেবল তিনি। শুধু এই বিড়ালগুলোর টানে। ওদের ফেলে আলেপ্পো ছাড়ার কথা চিন্তাও করেন না আলা জলিল। ওরা তো আর কেবল একেকটা বিড়াল নয়, প্রতিটি বিড়ালের সঙ্গেই আছে একেকটা করে গল্প। যেমন একবার এক বাচ্চা মেয়েকে তাঁর কাছে নিয়ে এলো মেয়েটির মা-বাবা। মেয়েটির একটি আদরের বিড়াল ছিল। কিন্তু পরিবারটি আর আলেপ্পোতে থাকার সাহস করছে না। পাড়ি জমাবে তুরস্কে। এত দূরের পথে তো আর বিড়ালটি নিয়ে যাওয়া যাবে না। কাজেই বিড়ালটি দিয়ে দিতে হলো আলা জলিলের আশ্রমে। বিড়ালটি আলা জলিলের হাতে তুলে দিয়ে মেয়েটির সেকি কান্না! অবশেষে আলা জলিল কথা দিয়েছিলেন, কয়েক দিন পর পর বিড়ালটির ছবি তুলে তার কাছে পাঠাবেন। তিনি এখনো নিয়মিত বিড়ালটির ছবি তুলে মেয়েটির কাছে পাঠান।

আয়না হ্রদ


মন্তব্য