kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

রহস্যজট

ক্রাইম সিন

ধ্রুব নীল

৯ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



ক্রাইম সিন

অঙ্কন : মানব

কণ্ঠনালি দিয়ে ঢুকে একেবারে ঘাড়ের ঠিক মাঝ বরাবর ফুটো করে বেরিয়ে গেছে বুলেটটা। নার্ভ ছিঁড়ে যাওয়ায় মুখে ব্যথার ছাপ নেই।

দেখে মনে হবে যেন আপাতত রাজধানীর একটি রক্তস্নাত গলিতে সটান হয়ে মধ্যরাতে হাঁ করে আকাশ দেখা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই সদ্য খুন হয়ে যাওয়া নাইটগার্ড মহসীন আলীর।

ঘটনাস্থলে পৌঁছেই হোঁচট খেল রুমি। বেঁটেমতো শুকনো টিঙটিঙে ছেলেটার বয়স চৌদ্দ কি পনেরো। ভ্যাবাচেকা খেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে হাতকড়া। বড় বড় করে শ্বাস নিচ্ছে। রুমি ইশারা করতেই হ্যান্ডকাফ খুলে দিল কনস্টেবল। লাশের দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে ছেলেটা। হাতে জিপলক ব্যাগের মতো একটি প্যাকেট নিয়ে এগিয়ে এলো এক পুলিশ অফিসার। তাতে পুরে রাখা অস্ত্রটা আসল।

‘একদম হাতেনাতে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার স্যার। বদমাইশের বদমাইশ একটা। সারা দিন গাঞ্জার উপরে থাকে। ছিনতাই করতে আসছিল। এইবার আর ছাড়াছাড়ি নাই, লটকাইয়া দিমু। ’

রুমির শীতল দৃষ্টি দেখে মুখ বাঁকিয়ে হাসি আনার চেষ্টা করল পুলিশ অফিসার। গোয়েন্দা বিভাগের বিশেষ একটি শাখার এজেন্ট রুমির ক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা আছে তার। তাই আর কথা বাড়াল না। রুমি কথা না বলে লাশের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। কেসটা পুলিশের হাতে থাকার কথা হলেও এখন এটা বড় ঘটনা। এই এক এলাকায় গত এক সপ্তায় পরপর পাঁচজন খুন হওয়ায় নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। তিনজন নাইটগার্ড। দুজন পথচারী। লম্বা-চওড়া পেটা শরীরের সিকিউরিটি গার্ড মহসীন আলী পঞ্চম শিকার। কিন্তু কে বা কারা খুন করে বেড়াচ্ছে জানে না কেউ। ওপর মহল থেকে চাপ আসছে ঘন ঘন। এই প্যাটার্নের খুন চলতে থাকলে একটা বড় আতঙ্ক ভর করতে পারে জনগণের মনে—এমনটাই মনে করছে অনেকে। খুনিকে ধরার ভার তাই রুমির ঘাড়ে।

‘ওকে ছেড়ে দিন। ’

পুলিশ অফিসারের দিকে না তাকিয়েই বলল রুমি। আমতা আমতা করছে অফিসার।

‘কিন্তু স্যার, একেবারে অস্ত্র হাতে ধরেছি। ফিঙ্গার প্রিন্ট...। ’ লাশ থেকে চোখ সরিয়ে রুমি সরাসরি চোখ রাখল তার দিকে।

‘ঠিক আছে স্যার। ওকে। ’

‘নষ্ট করার মতো সময় আমাদের হাতে নেই। আর খুনিও ঠিক সেটাই চায়। ছেলেটাকে বাড়ি পৌঁছে দিন, যদি তার বাড়ি থাকে। না থাকলে ও কোথায় থাকে সেখানে পৌঁছে দিন। আর পারলে রাতের খাওয়াটা খাইয়ে দিন। ’

‘স্যার, আপনি কি...। ’

‘হ্যাঁ, আমি নিশ্চিত, ছেলেটা গুলি চালায়নি। এবার হলো তো!’

এখনো ধাতস্থ হতে পারেনি ছেলেটা। রুমির দিকে কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কিছু বলতে চায় যেন। এগিয়ে এসে হাসল রুমি। ছেলেটাও।

‘স্যার, আমি গুল্লির সাউন্ড হুনি আয়া পড়সিলাম। তারপর দেখি অ্যাই বন্দুক। আমি কই, সারসে কাম। ব্যাডা তো মইরা গেসে। ’

‘গুলির শব্দ শোনার কতক্ষণ পর এসেছ?’

‘এই ধরেন স্যার পাঁচ সেকেন্ডও হইব না। গরমের চোটে বিষ্টিত ভিজতে বাইর অইছিলাম। এরপর বিষ্টি দেহি থাইমা গেল। তারপর ওই মোড়েত্থন আসতেসিলাম। গুলির সাউন্ড হুইনা দৌড় দিলাম। আইসা দেখি লাশ। এরপর বন্দুক উডাইয়া লই। ’

‘কাউকে দেখেছ?’

‘না, স্যার। নাইটগার্ডেরা নাই। দুইজন নাকি মরছিল। এরপর বাকিরা চাকরি ছাইড়া পলাইছে। ডরে কেউ এই এলাকায় রাইতে আহে না। আমার আবার ডর নাই। ডর থাকলে লেগুনার হেলপারি করন যায় না। ’

পুলিশ অফিসারের দিকে ফিরল রুমি।

‘আর আপনারা?’

‘আমরা গোটা দশেক ফোন পেয়েছি। অবশ্য টহল পুলিশও শব্দ শুনেছে। এরপর আসতে যতক্ষণ। ’

ঝট করে উঠে দাঁড়াল রুমি। গলির মোড়ের একটু পর হয়েছে খুন। একজন নাইটগার্ডকে গুলি করে রিভলবার ফেলে গেল কেন আততায়ী বুঝতে পারছে না। দামি অস্ত্র। লাখ টাকা দাম। এমনি এমনি ফেলে যাওয়ার কথা নয়। আর বাচ্চাটা যে খুন করেনি, সেটা স্রেফ আন্দাজ নয়। নিশ্চিত এক শ ভাগ।

গলি যেখানে বাঁক কেটেছে, সেখানে এসে দাঁড়াল রুমি। খুনটা হয়েছে মোড় পেরিয়ে একটু সামনে। এরপর লম্বা রাস্তা। প্রায় ১০০ মিটার। দুই পাশে ফ্ল্যাট আর অ্যাপার্টমেন্টের সারি। প্রতিটি বারান্দায় উত্সুক লোকজনের মাথা দেখা যাচ্ছে। তবে কেউ নিচে নামছে না। রাস্তার এই ছেলেটাই সাহসী। গুলির শব্দ শুনে তাত্ক্ষণিক যদি কেউ বারান্দায় এসে তাকাত, তাহলে একটা ক্লু পাওয়া যেত।

‘আমার ধারণা স্যার, এটা ডাকাতের কাজ। ওরা গার্ডদের টার্গেট করছে, কারণ এতে গার্ডরা সব ভয় পাবে। কেউ আর চাকরি করবে না। ’

রুমি আবারও কঠিন দৃষ্টিতে তাকাল। কথায় যুক্তি থাকলেও সে তা মানতে নারাজ। ডাকাত হলে আর যা-ই হোক, এত দামি অস্ত্র ফেলে যাবে না। খুন করেছে ভাড়াটে কেউ, টাকার বিনিময়ে এবং সে সম্ভবত এর আগে কাউকে খুন করেনি। আর বড় কথা, খুনি এই রাস্তার কোনো এক ফ্ল্যাটেই থাকে। সম্ভবত সে-ও কোনো বাসার সিকিউরিটিতে আছে। কিন্তু মোটিভ? আগের খুনের প্যাটার্ন দেখে রুমি একটা ব্যাপারে নিশ্চিত যে বড় কোনো গডফাদার আড়ালে কাঠি নাড়ছে। বড় মাপের আতঙ্ক আর পত্রিকার হেডলাইন দখল করাই তার আপাতত উদ্দেশ্য। বাকিটা জানা যাবে খুনি ধরা পড়ার পর।

রুমির নির্দেশ অনুযায়ী খুন হওয়ার রাস্তার আশপাশের সব গার্ডকে হ্যান্ডমাইকে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিল পুলিশ। যে ভবনগুলো থেকে প্রথম দফায় কেউ আসতে চায়নি, জেরাটা তাদের দিয়েই শুরু করল রুমি। দেরি করে এলেও ভড়কে যায়নি প্রথমজন। রুমির দিকে হাত বাড়িয়ে দিল হ্যান্ডশেকের জন্য। করমর্দন শেষে কিছু জিজ্ঞেস করতে হলো না। তার আগেই বলল,

‘আমি কিছু হুনি নাই স্যার। কানে হেডফুন আছিল। তার ওপর ঠাডা পড়তেছিল। আমি ভাবছিলাম, ঠাডার সাউন্ড বুঝি। ’

‘কী শুনছিলে হেডফোনে?’

‘মোবাইলে রেডু হুনতাছিলাম স্যার। ’

এবার আরেকজন। গলা কাঁপছে খুব। হাতও কাঁপছে। চট করে তার কাঁধ চেপে ধরল রুমি। কাঁপা একদম থেমে গেল।

‘তোমার নাম?’

‘মোহাম্মদ আলম। ’

‘কী করছিলে?’

‘আমি বাথরুমে গেছিলাম স্যার। পেটের অসুখ। বাইর হইতে দেরি হইসে। তার ওপর ঝড়-তুফানের রাইত। অত কিসু জানি না স্যার। বিষ্টি-বাদলার মইদ্যে কিছু টের পাই নাই। ’

এর পরের গার্ড বেশ কেতাদুরস্ত। রুমিকে দেখে পান চিবুতে চিবুতে হাসল।

‘আমার নাম হাসমত। এর আগের গার্ডরে যখন গুলি করে, তখনো আমি হুনসি স্যার। কিন্তুক যাওয়ার সাহস হয় নাই। কী করমু কন স্যার, আমরা নাকি গার্ড, সিকুরটি দিমু কী, আমগো নিজেরই সিকুরটি নাই। আমগোর কাছে নাই বন্দুক, নাই গোলাবারুদ। এই সব লাডিসোঁডা দিয়া কিসু অয়?’

‘তা বটে তা বটে। কিন্তু মাইকিং করার পরও আসতে দেরি করলা কেন শুনি?’

‘দেরি আর কই করলাম। খাওন শেষ কইরাই বাইর অইছি। ’

‘নাকি পালানোর পথ খুঁজছিলে?’

মুহূর্তে জিব কেটে হাসল গার্ডটা। কেমন যেন মেকি মেকি ঠেকল।

চতুর্থজন ভীত। ঠিকমতো কথা বলতে পারছে না। একটু পর পর ‘কসম কইতাসি’ আর ‘আমি কিছু জানি না’ বলছে। রুমির প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে না।

‘স্যার, কসম খোদার, আমি গুলি করি নাই। আমি জালাল গুলি করলে আমার মাথায় ঠাডা পড়ব। ’

‘তাহলে কে করেছে?’

‘মনে হইল কেডা জানি দৌড় দিল। ছায়ার মতোন দেখছি। মাতালের মতো টলতেছিল মনে হয়। ’

একজন সম্ভাব্য প্রত্যক্ষদর্শী পেয়ে গোয়েন্দা রুমি তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে নাক চুলকানো শুরু করল। সামনে দাঁড়ানো জালালের মুখ থেকে মৃদু মদের গন্ধ আসছে। তবে আচমকা সেটিও ছাপিয়ে গেছে বারুদের কড়া ঘ্রাণ। জালালের কথা আর কানে ঢুকছে না। সে বকেই যাচ্ছে—‘এই বিষ্টি-বাদলার মইদ্যে কিছু দেহা যায় না স্যার.. কিসসু না! সব আন্ধার। ’

‘অফিসার, উনাকে গ্রেপ্তার করুন! তারপর বের করুন, কে তাকে ভাড়া করেছে। ’

যাকে ইশারা করে কথাটা বলল রুমি, বিপদ বুঝতে পেরে ঝেড়ে দৌড় লাগাল। আর তা দেখে হাসি প্রশস্ত হলো পুলিশ অফিসারের। সামনের রাস্তা বন্ধ করা হয়েছে আগেই। খাঁচাবন্দি ইঁদুরের দৌড়াদৌড়ি দেখতে ভালোই লাগে তার।

এবার বলুন, রুমি প্রথমেই কী করে নিশ্চিত হলো যে ওই কিশোর খুন করেনি। আর পরে খুনিকে ধরলই বা কী করে?


মন্তব্য